kalerkantho

সোমবার । ২০ জানুয়ারি ২০২০। ৬ মাঘ ১৪২৬। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

চুনারুঘাটের কালেঙ্গা বনের যুদ্ধে ৭২ জন পাকিকে হত্যা করি

শাহ ফখরুজ্জামান, হবিগঞ্জ   

১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চুনারুঘাটের কালেঙ্গা বনের যুদ্ধে ৭২ জন পাকিকে হত্যা করি

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস শহীদ

তাঁর বয়স এখন ৮০ বছর। হবিগঞ্জ শহরতলির সুলতান মাহমুদপুর গ্রামের আব্দুস শহীদ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে কম্পানি কমান্ডার ছিলেন। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ হবিগঞ্জ সদর উপজেলা ইউনিটের কমান্ডার। তাঁর নেতৃত্বে ৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর হবিগঞ্জ শহরকে হানাদারমুক্ত করেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা অফিসে তাঁর সঙ্গে কথা হলে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার স্মৃতির ঝাঁপি খুলে ধরেন।

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস শহীদ বলেন, ‘১৯৬৫ সালে সেনাবাহিনীর চাকরি ছাড়ি। আমার হাওলাদারের ট্রেনিং ছিল। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ ৭২ জন সহযোদ্ধাকে নিয়ে কম্পানি কমান্ডার হিসেবে সিলেটের উদ্দেশে রওনা করি। মেজর সি আর দত্ত ও এম এ রবের নির্দেশে আমার নেতৃত্বে একটি টিমের সঙ্গে সুবেদার সামছুল হুদার নেতৃত্বে একটি টিম, ইউনুছ চৌধুরীর নেতৃত্বে আরেকটি টিম একই সঙ্গে মার্চ করি। ওই দিনই আমরা মৌলভীবাজারে পৌঁছি। ২৮ মার্চ ভোরে সিলেটের সাদীপুরের মাঝামাঝি পৌঁছলে শুরু হয় পাকিদের সঙ্গে যুদ্ধ। পাকিদের গুলিতে কমান্ডার সামছুল হুদার হাত জখম হয়। পাকিরা তাঁকে ধরে গাড়িতে তুলতে চাইলে তিনি চিৎকার করেন। আমি রাইফেল দিয়ে ফায়ার করলে তারা তাঁকে ছেড়ে দেয়। এই লড়াইয়ে হবিগঞ্জের প্রথম দুই শহীদ মফিল উদ্দিন আর কলার বাপ মারা যায়। দিনভর যুদ্ধ শেষে রাত নামে। পরদিন ২৯ মার্চ ভোরবেলা স্থানীয় লোকজন জানায়, পাকিরা স্থানীয় কালাম উল্লার বাড়িতে প্রবেশ করেছে। আমরা ওই বাড়িতে অভিযান চালাই। সেখানে গিয়ে দেখি, ঘরের মধ্যে এক পাকি পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি পরে ছদ্মবেশ নিয়েছে। পরে সে আত্মসমর্পণ করলে অস্ত্র রেখে তাকে নিয়ে সাদীপুরে যাই। তুলে দিই শহীদ নুরুল ইসলামের হাতে। পরে তাকে কমান্ডার মানিক চৌধুরীর হাতে তুলে দিলে তিনি তাকে বন্দি করে হবিগঞ্জে নিয়ে যান।’

‘সাদীপুর অভিযান শেষ করে ২ এপ্রিল ২২ জনের টিম নিয়ে চলে যাই ভারতের খোয়াই থানায়। পরে বিএসএফের গাড়িতে করে চলে যাই আসারামবাড়ি। সেখানে ভারতীয় আর্মি এবং মাহবুবুর রব সাদীর একটি টিমের প্রশিক্ষণ চলছিল। সেখানে বলা হয়, আমার প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। পরে আমরা বাঘা স্কুলে এসে ক্যাম্প করি।’ 

উল্লেখযোগ্য অভিযানের মধ্যে রয়েছে চুনারুঘাটের কালেঙ্গা বনের যুদ্ধ। ওই যুদ্ধে আমরা ৭২ জন পাক হানাদারকে হত্যা করি। ওই যুদ্ধে আমার সহকর্মী বীরবিক্রম রমিজ শহীদ হন। আর ওই এলাকার কুখ্যাত রাজাকার তামাই মহালদারকে আমরা হত্যা করি।

আব্দুস শহীদ বলেন, ‘চুনারুঘাট উপজেলার অভিলাষপুর গ্রামের রাজাকার কমান্ডার তামাই মহালদার ছিল সবার কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। আমি তাকে হত্যা করি। যেদিন তামাই মহালদারকে হত্যা করি সেদিন ছিল প্রবল বৃষ্টি। ১২ জন সহযোদ্ধাকে নিয়ে তামাই রাজাকারের বাড়ির পাশে গোপনে অবস্থান নিই। আমার পিঠে গ্রেনেড আর গুলির ব্যাগ। রাত ১২টার দিকে বহুলা গ্রামের লতিফকে বলি লাথি দিয়ে দরজা ভাঙতে। পরে আমি নিজেই সজোরে লাথি মারলে দরজা খুলে যায়। লতিফ গ্রেনেড খুলে তামাই রাজাকারের বিছানায় নিক্ষেপ করে; কিন্তু সে বেঁচে যায়। এরপর আমি তাকে গুলি করে হত্যা করি। তামাইয়ের বিছানার নিচে পাওয়া যায় ২০ হাজার টাকা। আর সব শেষে ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর আমার নেতৃত্বে ৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধা হবিগঞ্জকে মুক্ত করেন। হবিগঞ্জ শহরে প্রবেশের আগে এম এ রবের গ্রামে অভিযান চালিয়ে ১২ জন রাজাকারকে বন্দি করি। হত্যা করা হয় দুজন রাজাকারকে। হবিগঞ্জকে মুক্ত করার গৌরব আমাকে ভীষণ আনন্দ দেয়।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা