kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

মিয়ানমার প্রসঙ্গে আইসিজেকে গাম্বিয়া

স্টপ জেনোসাইড

মেহেদী হাসান   

১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্টপ জেনোসাইড

মিয়ানমার বাহিনীর হত্যা-নির্যাতন-নিপীড়নের অভিযোগ শুনছে স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি ও তাঁর প্রতিনিধিদল। ছবি : আইসিজে

মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা জেনোসাইড বন্ধ করার নির্দেশনা দিতে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতের (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিজ, সংক্ষেপে আইসিজে) কাছে আবেদন জানিয়েছে গাম্বিয়া। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে নেদারল্যান্ডসের হেগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলায় গাম্বিয়ার আইনজীবীরা বারবার বলেন, ‘স্টপ জেনোসাইড।’ ওই সময় আদালতে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর ও বিবাদীপক্ষের এজেন্ট অং সান সু চিও উপস্থিত ছিলেন। গতকাল এ শুনানির মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা জেনোসাইডের অভিযোগে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক কোনো আদালতে কাঠগড়ায় দাঁড়াল মিয়ানমার।

মামলার বাদী গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী আবুবকর তামবাদোও আইসিজের বিচারকদের সামনে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জেনোসাইডের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন। এরপর তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারকে এসব কাণ্ডজ্ঞানহীন হত্যাযজ্ঞ, বর্বরতা বন্ধ করতে বলুন। মিয়ানমারের এসব হত্যাযজ্ঞ, বর্বরতা আমাদের সম্মিলিত বিবেককে স্তম্ভিত করছে। মিয়ানমারকে তার নিজেদের লোকদের (রোহিঙ্গাদের) ওপর জেনোসাইড বন্ধ (স্টপ জেনোসাইড) করতে বলুন।’ এর আগে গাম্বিয়ার মন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্ববিবেককে জাগিয়ে তুলতে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জেনোসাইডের বিষয়টি আইসিজেতে তুলেছে গাম্বিয়া। ৭৫ বছর আগে বিশ্ব বলেছিল, আর কোনো জেনোসাইড নয়; কিন্তু আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করিনি।’ তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে আশার সঞ্চার করতে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পক্ষ থেকে গাম্বিয়া মামলা করেছে। শুধু রোহিঙ্গাদের রক্ষাই নয়, মিয়ানমারকে জেনোসাইড প্রতিরোধ সনদ মানতে বাধ্য করানোও তাঁর লক্ষ্য।

গাম্বিয়ার মন্ত্রী আইসিজের বিচারকদের বলেন, ‘রোহিঙ্গারাও মানুষ। তারা আপনার-আমার মতো কারো বাবা, মা, ভাই, বোন। শুধু জাতি ও ধর্মগত কারণে তাদের প্রতিনিয়ত ধ্বংস করছে মিয়ানমার।’

স্রেব্রেনিচা, রুয়ান্ডা, দারফুরের জেনোসাইডের ধারাবাহিকতায় চলমান রোহিঙ্গা জেনোসাইডের বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন গাম্বিয়ার পক্ষে আইনজীবী অধ্যাপক পায়াম আকাভান। তিনি বলেন, কথিত রোহিঙ্গা জঙ্গিগোষ্ঠী আরসাকে দমনের নামে অভিযান চালানোর কথা বলা হলেও মিয়ানমার পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে কাজ করেছে। মিয়ানমার বাহিনী ও তার দোসররা রোহিঙ্গাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার বাহিনীর সদস্যরা রোহিঙ্গাদের বলেছে, আমরা তোমাদের মেরে ফেলব। এটি তোমাদের দেশ নয়।’

গাম্বিয়ার পক্ষের আরেক আইনজীবী অ্যান্ড্র লোয়েনস্টেইন মিয়ানমারের মিন গি গ্রামে রোহিঙ্গা জেনোসাইডের বিষয়ে জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সেখানে সাড়ে সাত শ রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে শতাধিক শিশুর বয়স ছয় বছর। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘এ বিষয়ে মিয়ানমার কী বলবে?’

গাম্বিয়ার আইনজীবীরা বলেন, অপরাধীরা যেমন বরাবরই তাদের অপরাধ, দায় ও সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে, মিয়ানমারও তা-ই করছে। মিয়ানমার হিটলারের মতো জেনোসাইড সংঘটিত করছে। রোহিঙ্গারা থাকলে মিয়ানমার মুসলমানে ভরে যাবে—এমন বিদ্বেষমূলক অপপ্রচার করে তারা রোহিঙ্গা নিধন করে যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের নীতি বরাবরই বৈরী ও নিপীড়নমূলক ছিল। ২০১৬ সাল থেকে এটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চিও বলেছেন, রোহিঙ্গা বলে মিয়ানমারে কিছু নেই। মিয়ানমারে ১৩৫টি স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠী আছে, তাদের মধ্যে রোহিঙ্গারা নেই। জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়াররা সাম্প্রতিক সময়েও বলেছেন, মিয়ানমারে অবশিষ্ট রোহিঙ্গারা জেনোসাইডের শিকার হওয়ার বড় ধরনের ঝুঁকিতে আছে।

গাম্বিয়ার আইনজীবী আরসালান সুলেমান বলেন, মিয়ানমারকে অনেকবার রোহিঙ্গা জেনোসাইডের ব্যাপারে নোটিশ পাঠানো হয়েছে; কিন্তু মিয়ানমার সব সময় তা অস্বীকার করেছে।

গাম্বিয়ার পক্ষে আরেক আইনজীবী পল রেইখলার বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের রক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছে। আদালতকে এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে হবে এবং শুধু অন্তর্বর্তী আদেশই নয়, রোহিঙ্গাদের রক্ষায় উপযুক্ত আদেশ দিতে হবে।

তিনি বলেন, আদালতে মনে রাখতে হবে যে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর জেনোসাইড চলছে। একেকটি দিন গড়াচ্ছে আর রোহিঙ্গাদের হত্যা, ধর্ষণসহ জেনোসাইডের শিকার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। তিনি আরো বলেন, আদালত রোহিঙ্গাদের রক্ষায় অন্তর্বর্তী আদেশ দেবেন কি না, সেটি বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়, বরং আদালতের বিবেচ্য হওয়া উচিত রোহিঙ্গাদের রক্ষায় তাঁরা কতটা দ্রুত ও কার্যকর আদেশ দেবেন।

গাম্বিয়ার আইনজীবীদলের সদস্য ফিলিপ স্যান্ডস রোহিঙ্গাদের রক্ষায় অন্তর্বর্তী আদেশের যৌক্তিকতা তুলে ধরার পাশাপাশি জাতিসংঘের তদন্তদলসহ সব সংস্থার মিয়ানমারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে আদালতের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তিনি বলেন, আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর রোহিঙ্গাদের জীবন-মরণ, ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন নির্ভর করছে।

আইসিজেতে আজ বুধবার বিকেলে দ্বিতীয় দিনের শুনানিতে মিয়ানমার তার যুক্তি উপস্থাপন করবে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে শুনানি শেষ হবে। এরপর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আদালতের রায় দেওয়ার সম্ভাবনা আছে।

জেনোসাইড প্রতিরোধ বিষয়ক সনদ লঙ্ঘন এবং রোহিঙ্গাদের ওপর জেনোসাইড চালানোর অভিযোগে গাম্বিয়া গত ১১ নভেম্বর আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। এই মামলা নিষ্পত্তি হতে কয়েক বছর লাগতে পারে। তবে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তির আগে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান জেনোসাইড বন্ধ করতে গাম্বিয়া আইসিজের কাছে অন্তর্বর্তী আদেশ চেয়েছে। সেই অন্তর্বর্তী আদেশ নিয়ে গতকাল তিন দিনের শুনানি শুরু হয়েছে। জেনোসাইডের অভিযোগে মিয়ানমারকে জবাবদিহি করার বিষয়ে মামলার শুনানি উভয় পক্ষের প্রস্তুতি ও সম্মতির ভিত্তিতে পরে অনুষ্ঠিত হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা