kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ জানুয়ারি ২০২০। ৭ মাঘ ১৪২৬। ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

ক্ষেত থেকে অস্ত্র তুলে নিয়ে হত্যা করি হানাদারকে

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ক্ষেত থেকে অস্ত্র তুলে নিয়ে হত্যা করি হানাদারকে

মুক্তিযোদ্ধা এম এ হালিম

বিজয়ের আভাস পাচ্ছিলাম। হানাদার বাহিনী আমাদের হাওর-ভাটি এলাকা থেকে পালাতে শুরু করেছে। বিজয়ের আগ মুহূর্তে সুনামগঞ্জের প্রবেশপথ গোবিন্দগঞ্জে জড়ো হয় হানাদার বাহিনী। তাদের সঙ্গে আমাদের তুমুল যুদ্ধ বাধে গোবিন্দগঞ্জসংলগ্ন বুরকিতে। সেদিন ছিল ১৪ ডিসেম্বর। পাকিস্তানিরা পালানোর কারণে তাদের সব শক্তি তখন জড়ো করেছিল। এই শক্তি নিয়েই আমাদের পাইওনিয়র কম্পানির মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ায়। আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ি। খুরশিদ কম্পানির সাত-আটজন শহীদ হয়। সম্মুখযুদ্ধ থেকে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফকে ধরে নিয়ে যায়। আমরা অনেকেই ধানক্ষেতে অস্ত্র ফেলে জনতার মধ্যে ঢুকে পড়ি। এ সময় একজন মিলিশিয়া আমার দলের এক যোদ্ধার দিকে অস্ত্র নিয়ে তেড়ে গেলে পেছন দিক থেকে ধানক্ষেতে ফেলে রাখা অস্ত্র তুলে ওই মিলিশিয়াকে আমি গুলি করে হত্যা করি। এ ছাড়া আমি নভেম্বরে ছাতক-সিলেটের ঝাউয়া রেল সেতু এবং সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের জাউয়া বাজার সেতু ওড়ানোর অপারেশনে ছিলাম। সেতু ওড়ানোর অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কারণেই বীরপ্রতীক খেতাব পাই। এভাবেই একাত্তরের উত্তাল যুদ্ধদিনের অম্লান স্মৃতি রোমন্থন করেছিলেন সুনামগঞ্জের ৫ নম্বর সেক্টরের সেলা সাবসেক্টরের সাহসী যোদ্ধা এম এ হালিম বীরপ্রতীক।

সুনামগঞ্জের সীমান্ত এলাকা দোয়ারাবাজার উপজেলার টেংরাটিলা গ্রামে ১৯৫২ সালের ৩০ জুন এম এ হালিমের জন্ম। সেলা সাবসেক্টরের এই যোদ্ধা ১৯৭১ সালে ছিলেন সিলেট টেকনিক্যাল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। থাকতেন কলেজ হোস্টেলে। টেকনিক্যাল কলেজে ছাত্রলীগের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন। ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক সক্রিয়তা ও বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ শুনেই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তিনি।

এম এ হালিম জানান, ২৫ মার্চ রাতে হানাদার বাহিনীর বাঙালি নিধনযজ্ঞের আঁচ এসে লেগেছিল সিলেটেও। ছাত্র আন্দোলনে সিলেট টেকনিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাসও তখন উত্তাল। রেলস্টেশন-সংলগ্ন ক্যাম্পাসের কারণে হোস্টেল থেকেই রাতে গুলির শব্দ শোনেন তিনি। সকালে বেরিয়ে দেখেন পরিস্থিতি থমথমে। দোকানপাট বন্ধ। যুবক দেখলেই পেটাচ্ছে পাকিস্তানি আর্মিরা। হিন্দুদেরও নির্যাতন করছে। এই অবস্থা দেখে হোস্টেল ছেড়ে পালিয়ে বেরিয়েছেন বিভিন্ন স্থানে। মাস খানেক পর বাড়ি ফিরেও দেখেন পাকিস্তানিরা টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ড দখলে নিয়েছে। এখানেও যুবক ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের টার্গেট করা হয়েছে। তাই বাড়িতে না থেকে এলাকার পাঁচ বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। সেলা সাবসেক্টরের পাইওনিয়র কম্পানির একজন দুঃসাহসিক যোদ্ধা হিসেবে তিনি সেতু, কালভার্ট ধ্বংসসহ একাধিক সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে বীরোচিত ভূমিকা রাখেন।

টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডসংলগ্ন পশ্চিমের প্রথম বাড়িটিই এম এ হালিমের। গ্রামের আব্দুল কদ্দুছ ও জোবেদা খাতুন দম্পতির ৯ সন্তানের মধ্যে সবার বড় তিনি। যুদ্ধে অংশ নেওয়ায় পাকিস্তানি হানাদার ও রাজাকাররা তাঁর বাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে।

বন্ধুদের নিয়ে যুদ্ধে : এপ্রিলের প্রথম দিকে বাড়িতে এসে দেখেন গ্যাসফিল্ডে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অবস্থান করছে। তারা এলাকার যুবকদের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের তথ্য নিচ্ছে। এর মধ্যে একদিন খবর আসে পাকিস্তানিরা আসছে। তিনি বন্ধু-বান্ধবসহ কয়েকজনের সঙ্গে লাঠিসোঁটা নিয়ে পাকিস্তানিদের প্রতিরোধ করতে সোনাপুর গ্রামে চলে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন বিপুল অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনী। এ অবস্থা দেখে শহীদ মাস্টারের বাড়িতে চলে আসেন। শহীদ মাস্টার তাঁকে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার পরামর্শ দেন। বাড়ি ফিরে দেখেন সাচনার মুক্তিযোদ্ধা ইসকন্দর তাঁর বাড়িতে। বিকেলেই গ্রামের কয়েকজন যুবক গ্রামের স্কুল মাঠে এসে যুদ্ধে যাওয়ার পরামর্শ করেন।

আকাশবাণীতে একদিন ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভূঁইয়া স্বাধীনতার পক্ষে খবর পড়ছিলেন। বাঙালি যুবকদের যুদ্ধে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছিলেন। ৮ এপ্রিল এম এ হালিম, আব্দুল মজিদ, জাকির, আউয়াল, আলীসহ চার-পাঁচজন মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার লক্ষ্যে রেঙ্গুয়া সীমান্তে চলে যান। সেলা শরণার্থী ক্যাম্পেই দেবদাস বাবু নামে জনৈক যুবক তাঁদের ট্রেনিং দেওয়া শুরু করেন। পরে মেঘালয়ের ইকোওয়ান ট্রেনিং সেন্টারে শুরু হয় প্রশিক্ষণ।

প্রশিক্ষণ শেষে পাথরঘাটা পাঠানো হয় তাঁদের। পাথরঘাটায় গিয়ে জনৈক ইপিআর কবীর আহমদকে দেখেন যুবকদের ট্রনিং দিচ্ছেন। এখানে সেতু ওড়ানোর জন্য এক্সপার্ট লোক খুঁজছিল ইনডিয়ান আর্মি। এম এ হালিম টেকনিক্যালের ছাত্র থাকায় তাঁকে ইনডিয়ান আর্মির কাছে এক্সপার্ট লোক হিসেবে নিয়ে যান ফখর চেয়ারম্যান। হালিম গ্রামের অনুজপ্রতিম বন্ধু ও দশম শ্রেণির ছাত্র আব্দুল মজিদসহ আরো কয়েকজনকে দলে যুক্ত করেন।

সম্মুখযুদ্ধ : আগস্টে নরসিংপুর যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এম এ হালিমসহ মুক্তিযোদ্ধারা। ছাতকের বাগবাড়ী ও দোয়ারাবাজার থেকে এসে পাকিস্তানি হানাদাররা মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল। এখানে অসীম সাহসে যুদ্ধ করেন এম এ হালিম। ছাতকের হাদাটিলায় বাংকার করে বাঙালি নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন করত হানাদার বাহিনী। সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন হেলালের নির্দেশে এখানে এসে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। উদ্ধার করেন কয়েকজন বীরাঙ্গনাকে।

ভয়াবহ বুরকি যুদ্ধ ও পাকিস্তানিকে হত্যা : ১৪ ডিসেম্বর গোবিন্দগঞ্জসংলগ্ন বুরকিতে ভয়াবহ যুদ্ধ বাধে। সম্মুখযুদ্ধ থেকে সহযোদ্ধা লতিফকে ধরে নিয়ে যায় হানদার বাহিনী। এই যুদ্ধে খুরশিদ কম্পানির সাত-আটজন শহীদ হন। আহত হন অনেকে। এ সময় পাকিস্তানিরা সারেন্ডারের জন্য চিঠি পাঠায়। লে. ক. রউফ পাকিস্তানিদের সারেন্ডারের জন্য উল্টো চিঠি পাঠান। চিঠির পর আরো ভয়াবহ গোলাগুলি শুরু হয়। এ সময় জয়ী হন মুক্তিযোদ্ধারা। ১৫ ডিসেম্বর পাকিস্তানিরা সারেন্ডার করে। এটাই ছিল এম এ হালিমের শেষ যুদ্ধ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা