kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে

আশরাফ-উল-আলম   

১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠন এই উদ্বেগ প্রকাশ করছে। গত ৬ জুন যুক্তরাজ্য সরকারের ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি রিপোর্ট, ২০১৮’ তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ২০১৮ সালে বাংলাদেশের মানবাধিকারের সুরক্ষা ও গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, গত বছর বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বেড়ে যায়। এ ছাড়া মত প্রকাশের স্বাধীনতাও কমেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়েও উদ্বেগের কথা জানায় যুক্তরাজ্য।

বাংলাদেশের নাগরিকদের গোপনে আটকে রাখা, গুম করা ও বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগগুলো মোকাবেলায় বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা (এইচআরডাব্লিউ)। গত মার্চে প্রকাশিত সংস্থার ‘ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট, ২০১৮’-তে এ দাবি করা হয়। এইচআরডাব্লিউ তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, বাংলাদেশে এসব গুম, বেআইনি আটক ও বিচারবহির্ভূত হত্যার দায়ে দোষীদের বিচারের মুখোমুখি না করে উল্টো অভিযোগগুলো অস্বীকার করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশীয় অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস স্থানীয় মানবাধিকারের কয়েকটি বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এ বছরের প্রথম দিকে জানান, বাংলাদেশে অনেকটি গুমের ঘটনা ঘটেছে। বিরোধীদলীয় সমর্থক ও সন্দেহভাজন জঙ্গি—উভয়কেই টার্গেট করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের মানবাধিকার রেকর্ডে ভালো কিছু খুঁজে পাওয়া কঠিন।

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির কড়া সমালোচনা করেছে এশিয়ান লিগ্যাল রিসোর্স সেন্টার (এএলআরসি)। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ৪২তম নিয়মিত অধিবেশনে বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, এ দেশে ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জোরপূর্বক গুম করা হয়েছে ৫৩৬ জনকে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে দুই হাজার ১৮৮টি। নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতনে মারা গেছে ১২৮ জন। আর খেয়াল-খুশিমতো গ্রেপ্তারের শিকার হয়েছে কয়েক হাজার মানুষ। এ জন্য যারা জড়িত তাদের দেওয়া হয়েছে দায়মুক্তি। এ বিষয়ে মানবাধিকার পরিষদকে গুরুত্ব দিয়ে দৃষ্টি দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করা হয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে এএলআরসির পক্ষে গত ১৮ সেপ্টেম্বর এ বক্তব্য উত্থাপন করা হয়।

গত ৩০ জুলাই সুইজারল্যান্ডে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে নির্যাতন-নিপীড়ন নিয়ে পর্যালোচনা সভায় প্রশ্নবাণের মুখে পড়ে বাংলাদেশ। জেনেভায় অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ২৮ সদস্যের প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। ওই সভায় নির্যাতন-নিপীড়ন, গুম-খুন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে সংখ্যালঘু নির্যাতন, বিরোধী ও ভিন্নমত দমন, নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের হয়রানি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি, নির্যাতনের প্রতিকারসহ অসংখ্য প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হয়। ওই সভায় বাংলাদেশের কাছে জানতে চাওয়া হয়, নির্যাতনবিরোধী জাতিসংঘ সনদে সই করার পর ওই সনদ বাস্তবায়ন করতে ব্রিটিশ আমলে প্রণীত আইনগুলো সংশোধন করা হবে কি না? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে যৌন নিপীড়ন বিষয়েও ওই সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ৩১ জুলাইও জাতিসংঘ কমিটি বাংলাদেশের কারাগার পরিস্থিতি, নারী, নৃগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, আইনে শারীরিক শাস্তি ও শিশুদের শাস্তির ব্যাপারে উদ্বেগ জানিয়েছে। রোহিঙ্গাসহ মানবপাচার নিয়ে কমিটি উদ্বেগ জানিয়েছে। নির্যাতন ও গুরুতর অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘন ইস্যুতে কাজ করতে গিয়ে সুধীসমাজ ও মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী ও সাংবাদিকরা হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন বলেও কমিটি উল্লেখ করেছে।

জাতিসংঘ কমিটি সরকারকে পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তারের সুযোগ, আটক অবস্থায় রিমান্ডে নেওয়ার সুযোগসংবলিত আইন সংশোধন এবং কারা আইনে শারীরিক শাস্তি বিলোপ করার পরামর্শ দেয়। এ ছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, তথ্য-প্রযুক্তি আইন, বৈদেশিক অনুদান আইনের মতো নাগরিক সমাজের কাজের সুযোগ সংকুচিত করা আইনগুলো সংশোধনের সুপারিশ করেছে জাতিসংঘ কমিটি। কিন্তু ওই আইনগুলো সংশোধন হয়নি এখনো।

নির্যাতন, নিপীড়ন, দুর্ব্যবহার, আটক করেও স্বীকার না করা, গুম, নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যুর সব অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও কার্যকর ফৌজদারি তদন্ত নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানায় কমিটি। কমিটি একই সঙ্গে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) কর্মকাণ্ডের স্বাধীন তদন্ত এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের জন্য প্রস্তাবিত সব শান্তিরক্ষীর জন্য জাতিসংঘ নির্দেশিত স্বাধীন যাচাই পদ্ধতি চালু করতেও বাংলাদেশকে সুপারিশ করেছে।

জাতিসংঘ কমিটি বলেছে, স্বীকারোক্তি বা অর্থ আদায়ের জন্য লোকজনকে আইন প্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের যত্রতত্র নির্যাতন ও দুর্ব্যবহার, গুম করা; এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্যের ঘাটতি এবং আইন প্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থা, বিশেষ করে র‌্যাবের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ব্যর্থতায় কমিটি উদ্বিগ্ন। মানবাধিকার কমিশন এ বিষয়ে কাজ করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশন নখদন্তহীন বলে বারবার বলেছিলেন ওই কমিশনের একজন সাবেক চেয়ারম্যান।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার ১০ বছর পার হলেও এখনো কমিশনের আইনের বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়নি। সম্প্রতি হাইকোর্ট বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা দিয়েছেন। মানবাধিকার কমিশন আইনের সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি অস্পষ্টতা রয়েছে। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রেই কমিশন যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারছে না। জনবল সংকটও রয়েছে। বর্তমানে কমিশন মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে না, শুধু সুপারিশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে কার্যক্রম।

আবার কী সুপারিশ করা হয়, তা প্রকাশ করারও বাধ্যবাধকতা নেই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা তাদের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনসংক্রান্ত অভিযোগও সরাসরি তদন্ত করার ক্ষমতা কমিশনের নেই। কমিশনে অভিযোগ করতে বিড়ম্বনাও পোহাতে হয় বিচারপ্রার্থীকে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সনদ অনুযায়ী মানবাধিকার সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও যথাযথভাবে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গঠন করা হয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯-এর অধীনে এ কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়।

কমিশন আইনের ১৮ ধারায় উল্লেখ করা বিধানবলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা এর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনসংক্রান্ত অভিযোগ সরাসরি তদন্ত করার ক্ষমতা কমিশনের নেই। কমিশন বড়জোর সরকারের কাছে অন্য সংস্থার করা তদন্ত প্রতিবেদন চাইতে পারে। এসবের সমাধান চেয়ে সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

মানবাধিকার কমিশন আইনের ১৪(১) ধারায় বলা হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনসংক্রান্ত অভিযোগ পাওয়ার পর কমিশন তদন্ত করে তার সত্যতা পেলে তা মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে পারবে। ২(১)-এর ‘ক’ উপধারায় বলা হয়েছে, মধ্যস্থতা বা সমঝোতা না হলে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করতে পারবে কমিশন। কিন্তু এ সুপারিশ মানা না হলে কমিশন কী করবে, তা আইনে স্পষ্ট করে বলা হয়নি। ১৫(৭) ধারায় বলা হয়েছে, মীমাংসা কার্যকর করার জন্য কমিশন যথাযথ জরিমানা প্রদানের নির্দেশসহ অন্যান্য নির্দেশ দিতে পারে। কিন্তু জরিমানার সীমারেখা বা অন্যান্য আদেশ কী হবে, তা আইনে উল্লেখ নেই। এ বিষয়ে কোনো বিধিমালা হয়নি। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নিয়ে তদন্তকালীন কমিশন সংশ্লিষ্টদের বা সাক্ষীদের সমন পাঠাতে পারে কমিশনে বা অন্য যেকোনো স্থানে হাজির থাকার জন্য। আইনের ১৬ ধারায় সমনের এ বিধান থাকলেও সমন পেয়ে হাজির না হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আইনে কিছু উল্লেখ নেই।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, মানবাধিকার কমিশনের বিধিমালার খসড়া করে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। সেটা কী অবস্থায় আছে, তা জানা নেই।

কাজী রিয়াজুল হক বলেন, মানবাধিকার কমিশনের কাজ হলো মানবাধিকার সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়, সেখানে গিয়ে তদন্ত করা, শিশু, নারী, আদিবাসীদের মানবাধিকার বিষয়ে গবেষণা করে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে সরকারকে সুপারিশ করা।

কাজী রিয়াজুল হক আরো বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে হয়রানি বা নির্য়াতন মোটেই কাম্য নয়। এগুলো মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এ বিষয়ে মানবাধিকার কমিশন যথাযথ সুপারিশ সরকারের কাছে বা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে জানায়। মানবাধিকার কমিশনের অন্য কিছু করার নেই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা