kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

চার শতাধিক অভিযোগ ঝুলছে প্রতিকার নেই

এম বদি-উজ-জামান   

১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চার শতাধিক অভিযোগ ঝুলছে প্রতিকার নেই

ঢাকা কমার্স কলেজের এক নারী শিক্ষিকা একই বিভাগের এক পুরুষ সহকর্মীর যৌন হয়রানির শিকার। কলেজের অধ্যক্ষ ও পরিচালনা পর্ষদের কাছে অভিযোগ দিয়েও সাড়া না পেয়ে প্রতিকার চেয়ে আবেদন করেছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে। কিন্তু কমিশনও সাড়া দেয়নি।

গত ২ আগস্ট থেকে নিখোঁজ শাহবাগের ফাস্ট পার্সেল অ্যান্ড কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মচারী এনামুল (২৩)। তাঁর মোবাইল ফোন নম্বরটিও বন্ধ। কুরিয়ার সার্ভিসের কেউই এনামুলের সন্ধান দিতে পারেনি। এ অবস্থায় গত ৬ আগস্ট শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন এনামুলের বাবা রেজাউল করিম খান। পুলিশও এনামুলের সন্ধান দিতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ছেলের সন্ধানের জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে আবেদন করেন রেজাউল। কিন্তু কমিশন নির্বিকার।

এ রকম শত শত ভুক্তভোগী কোনো আইনি প্রতিকার পাচ্ছেন না জাতীয় মানবাধিকার কমিশন থেকে। আইন অনুযায়ী অভিযোগ পাওয়ার পর অথবা নিজ উদ্যোগে (সুয়োমোটো) মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেকোনো ঘটনা অনুসন্ধান করার এখতিয়ার কমিশনের আছে। কিন্তু আইনের ওই ক্ষমতার প্রয়োগ নেই। ফলে কমিশন গঠনের উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। নতুন করে কমিশন গঠিত হয়েছে গত ২২ সেপ্টেম্বর। নতুন চেয়ারম্যান হয়েছেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব নাছিমা বেগম। কিন্তু এখনো অনুসন্ধান শুরু না হওয়ায় কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা। এ ছাড়া কমিশনে পর্যাপ্ত জনবল ও পরিবহন সুবিধা না থাকার কারণেও অভিযোগের অনুসন্ধান বা তদন্তে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদ্য নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেসব অভিযোগ জমা পড়েছে তা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বেঞ্চ গঠন করা হবে। আমরা এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে অভিযোগগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি সফটওয়্যার তৈরি করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘সদ্যোবিদায়ি কমিশনের সঙ্গে আমরা বসেছি। তারা কিভাবে কাজ করত, কিভাবে অভিযোগ নিষ্পত্তি করত, তাদের কী সমস্যা ছিল, কোথায় দুর্বলতা ছিল—সেসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তাদের কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা এগিয়ে যাব।’

কমিশনের সদ্যোবিদায়ি চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, কমিশনে জনবলের সংকট রয়েছে। পর্যাপ্তসংখ্যক জনবল না থাকায় সব অভিযোগের বিষয়ে যথাযথ অনুসন্ধান করা যায় না।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, কমিশনের কাছে প্রত্যাশা থাকবে যাতে তারা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে।

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে দুটি, ২০১১ সালে ৯টি, ২০১২ সালে ৪১টি, ২০১৩ সালে ৩৪টি, ২০১৪ সালে ১০৫টি, ২০১৫ সালে ২৯১টি, ২০১৬ সালে ৪৬৭টি, ২০১৭ সালে ৬৪৪টি, ২০১৮ সালে ৭২৮টি এবং ২০১৯ সালে ৫৯২টি অভিযোগ জমা পড়ে কমিশনে। এসবের মধ্যে গত ৫ আগস্ট থেকে গত ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেড় মাসেই কমিশনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযোগ জমা পড়ে ১১২টি। অর্থাৎ ওই সময় পর্যন্ত জমা পড়া মোট অভিযোগ দুই হাজার ৯২৫টি। ওই সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে দুই হাজার ৫০৮টি অভিযোগ। ফলে নতুন-পুরনো মিলে চার শতাধিক অভিযোগ এখন কমিশনে বিচারাধীন। প্রতিদিনই এর সংখ্যা বাড়ছে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত ৩ আগস্ট কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে কাজী রিয়াজুল হকের মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু এর এক মাস আগে থেকেই তিনি কমিশনের কাজ থেকে বিরত থাকেন। ২০১৬ সালের ২ আগস্ট তাঁকে তিন বছরের জন্য কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কমিশনের অন্য সদস্যের মেয়াদও শেষ হওয়ায় গত ৩ আগস্ট থেকে কমিশনে কোনো সদস্য ছিলেন না। ওই অবস্থায় জাতীয় সংসদের স্পিকারের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি বাছাই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নতুন চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ দেন।

জানা যায়, কমিশনের জনবল কাঠামো অনুযায়ী ৪৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা। কিন্তু আছে ৪৫ জন। এরই মধ্যে কমিশন ছেড়ে অন্য সরকারি দপ্তরে চাকরি নিয়েছেন তিনজন। কমিশনে পদোন্নতি, পেনশন সুবিধা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কম থাকায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা চাকরি ছেড়ে যান বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় কমিশনে আরো ৪০ জন নিয়োগের উদ্যোগ থমকে আছে দীর্ঘদিন ধরে। যদিও এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, কমিশনে জনবলসংক্রান্ত বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় অনেক আগেই মতামত দিয়েছে।

জানা যায়, কমিশনে পর্যাপ্তসংখ্যক গাড়িও নেই। মাত্র একটি নিজস্ব গাড়ি নিয়েই অভিযোগের অনুসন্ধানে নামতে হয়। এ ছাড়া ভাড়া নেওয়া গাড়ি দিয়ে কমিশন তার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা