kalerkantho

সোমবার । ২০ জানুয়ারি ২০২০। ৬ মাঘ ১৪২৬। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

গ্রামের নারীরাও দা দিয়ে কুপিয়ে মারে পাকিদের

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল   

৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গ্রামের নারীরাও দা দিয়ে কুপিয়ে মারে পাকিদের

মুক্তিযোদ্ধা, মহিউদ্দিন মানিক

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর থেকে বরিশালের মুক্তিকামী মানুষ মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত হতে থাকে। প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যুদ্ধের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে।

সচিবালয় ঘিরে বরিশালের লাকুটিয়া জমিদারবাড়ি, নবগ্রাম মিশনারি, বেলস পার্ক (বঙ্গবন্ধু উদ্যান), বিএম স্কুল ও ইছাকাঠিতে ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ওই সব ক্যাম্পে খাদ্যদ্রব্যের পাশাপাশি জ্বালানি মজুদ রাখা হয়। বেশ কিছু ক্যাম্পে টেলিফোন সংযোগ স্থাপন করা হয়।

বঙ্গবন্ধু উদ্যান সংলগ্ন বিআইডাব্লিউটিএর চানবাংলোয় নবম সেক্টরের মেজর এম এ জলিল অবস্থান করে যুদ্ধের সামরিক কৌশল নিয়ে কাজ শুরু করেন। কে এস এ মহিউদ্দিন মানিক ছিলেন তাঁর সহযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে, বিশেষ করে চাচৈরের যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য মানিক বীরপ্রতীক খেতাব পান। তিনি বলেন, ‘বরিশালের তত্কালীন এডিসি আজিজুল ইসলাম তাঁর নিজের জিপটি মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে দেন। ওই জিপটি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার কাজে ব্যবহার করা হয়। পাক হানাদারদের হাতে পরে এডিসি আজিজুল নির্মমভাবে খুন হন।’

অস্ত্র লুটের ঘটনা

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তানি হানাদারদের গণহত্যা শুরুর খবর মধ্যরাতেই বরিশালে আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে পৌঁছে যায়। মহিউদ্দিন মানিক বলেন, “ওই রাতেই বরিশালে আত্মপ্রকাশ করে মুক্তিবাহিনী। মুক্তিযুদ্ধ ও প্রশাসন পরিচালনার জন্য গঠিত হয় বিপ্লবী সংগ্রাম পরিষদ। ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১১টায় জেলা আওয়ামী লীগের তত্কালীন সাংগঠনিক সম্পাদক মহিউদ্দিন আহম্মেদের (মরহুম) কলেজ রোডের বাসভবনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। সভা শেষে নুরুল ইসলাম মনজুর ও তাঁর কয়েকজন সহকর্মী সিদ্ধান্ত নেন, ২৫ মার্চ রাতেই পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগারের সব অস্ত্র লুট করা হবে। ওই অস্ত্র দিয়ে প্রশিক্ষণ শিবির স্থাপন করে ছাত্র ও যুবকদের সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এডিসির জিপে রাত সাড়ে ৩টায় আমরা পুলিশ লাইনে পৌঁছাই। ডিএসবির এসআই বাদশা মিয়া, হাবিলদার আকবর ও অন্য পুলিশ সদস্যদের সহায়তায় অস্ত্রাগারে রক্ষিত সব অস্ত্র নিয়ে পেশকার বাড়ির চেম্বারে চলে আসি। পরদিন ২৬ মার্চ বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করি। ওই সচিবালয়ের মাধ্যমে সংগ্রাম পরিষদের তত্ত্বাবধানে বৃহত্তর বরিশাল, পটুয়াখালী ও খুলনা জেলায় স্বাধীনতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়।

১৮ এপ্রিল সকালে পাক হানাদাররা বরিশাল শহরে বিমান থেকে বোমা হামলা চালায়। ওই ঘটনার পর বরিশাল শহর জনমানবশূন্য ভূতুড়ে নগরীতে পরিণত হয়। বোমাবর্ষণের দুই দিন পর নুরুল ইসলাম মনজুর ভারত থেকে বেশ কিছু অস্ত্র নিয়ে বরিশালে পৌঁছে পাক হানাদারদের আক্রমণ প্রতিহত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেন। সে অনুযায়ী বরিশালের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিই।

যেভাবে গুলিবিদ্ধ হই 

কয়েক দিন ধরে টানা পাক হানাদারদের বিভিন্ন ঘাঁটিতে সফল অভিযান চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা কিছুটা ক্লান্ত। ১৩ নভেম্বর, ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার চাচৈর গ্রামে একটি খালে আমরা অবস্থান নিই। কিছুটা ক্লান্ত থাকায় কয়েকজন ছাড়া সবাই নৌকায় ঘুমিয়ে পড়ে। সাবসেক্টর কমান্ডার শাহজাহান ওমরের নেতৃত্বে ছিলাম আমরা। ভোররাতে আমার কাছে দুজন লোক আসে। তারা আমাদের বলে, চাচৈরের পাশের গ্রামে এক দল পাকি অবস্থান করছে।

নৌকায় থাকা মুক্তিযোদ্ধারা কোনো চিন্তা না করেই ওই গ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করেন। গ্রামে ঢুকে বেশ কয়েকটি বাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখলাম। কী করব ভেবে উঠতে পারছিলাম না। ভোরের আলো তখনো ফোটেনি। হঠাৎ আমি দেখতে পেলাম কয়েকজন পাক হানাদার। তারা জঙ্গলের ভেতর শুয়ে আছে। মাথার হেলমেট চিকচিক করছে।

সহযোদ্ধা জিয়াউদ্দিনকে বিষয়টি বললে তিনি প্রথমে আমার কথা বিশ্বাস করেননি। পরমুহূর্তে অপরাপর সহযোদ্ধারা দেখলেন খালের ওপর সাঁকোর পাশে পাকিরা। খালের দুই পারে চারটি স্থানে তাদের মর্টারের অবস্থান। আমার সহযোদ্ধা জিয়াউদ্দিনের কাছে থাকা মর্টারে গোলা ভরে দিলাম। আমি মর্টার চার্জ করলে তা পাক হানাদারদের মর্টারের অবস্থানে পড়ে। এরপর শুরু হয় সম্মুখযুদ্ধ।

খবর পেয়ে আশপাশে থাকা অন্য মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের সঙ্গে যোগ দেন। আমরা পাকিদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলি। দিনব্যাপী যুদ্ধ চলে। অসংখ্য পাকি ও তাদের সহযোগী রাজাকার এই যুদ্ধে মারা যায়। তখন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ওই গ্রামের নারীরাও দা দিয়ে কুপিয়ে পাকিদের হত্যা করে। সেদিনকার যুদ্ধে আমার কপালের ডান দিকে গুলি লাগে। আমি গুরুতর আহত হই। ওই সম্মুখযুদ্ধে আমার সহযোদ্ধা আউয়াল শহীদ হন।”

মহিউদ্দিন মানিকের বাবার নাম কাজী মনোয়ার হোসেন। মা আনোয়ারা বেগম। তাঁর গ্রামের বাড়ি বানারীপাড়া উপজেলায়। বর্তমানে তিনি বরিশাল শহরের বগুড়া রোডে পৈতৃক বাড়িতে বসবাস করছেন। মহিউদ্দিন মানিক ১৯৭১ সালে মা-বাবার নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। বরিশাল পুলিশ লাইন  থেকে লুট করা অস্ত্র নিয়ে চলে যান বানারীপাড়ায়। সেখানে কয়েকজন মিলে মুক্তিবাহিনীর একটি দল গঠন করেন।

সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে তাঁরা সাবসেক্টর কমান্ডার শাহজাহান ওমরের দলে একীভূত হন। এরপর তাঁর নেতৃত্বেই যুদ্ধ করেন। ৮ ডিসেম্বর তাঁরা বাকেরগঞ্জ থানা মুক্ত করেন। সেদিন তিনি আবার আহত হন। মুক্তিযুদ্ধে, বিশেষ করে চাচৈরের যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য মহিউদ্দিন মানিক বীরপ্রতীক খেতাব পেয়েছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা