kalerkantho

সোমবার । ২০ জানুয়ারি ২০২০। ৬ মাঘ ১৪২৬। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

রোমানদের রাজত্বে জাহানারাও

শাহজাহান কবির, পোখারা থেকে   

৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রোমানদের রাজত্বে জাহানারাও

এসএ গেমস আর্চারিতে সোনালি এক দিনই কাটল বাংলাদেশের। গতকাল নেপালের পোখারায় ছয় ইভেন্টের ছয়টিতেই সোনা জিতেছেন বাংলাদেশি আর্চাররা। ছবি : মীর ফরিদ

পোখারাকে নয়নাভিরাম করেছে অন্নপূর্ণা। সাদা বরফের চাদর জড়িয়ে তার একেকটি শৃঙ্গ মৌন ঋষির মতো। সেই ঋষির আশীর্বাদ কাল সারা দিন যেন ঝরেছে বাংলাদেশের ওপর। পাশাপাশি আর্চারি ও ক্রিকেট মাঠে এদিন সাতটি সোনার লড়াই ছিল। সাতটিতেই যে উড়েছে লাল-সবুজ পতাকা। এমন দিন আর কবে এসেছে দক্ষিণ এশীয় গেমসের ইতিহাসে বাংলাদেশের জন্য। এই প্রথম এমন সোনায় সোহাগা হলো তা। শেষ বিকেলের সোনালি রশ্মি যেমন অপার্থিব রং ছড়ায়, কাল বাংলাদেশের দিনটিও গেল তেমন। আগের সাত দিনের সাতটি সোনা কাল এক দিনেই হয়ে গেল দ্বিগুণ। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা ডাবল ডিজিটের স্বপ্ন দেখছিলেন, তা ছাড়িয়ে এখন আরো বড় চূড়ায় পৌঁছতে চাইছে বাংলাদেশ।

কাল আর্চারির ছয়টি সোনার সব কটিই যেমন হয়েছে বাংলাদেশের, আজও এককের চারটি ইভেন্টে রোমান সানাদের আধিপত্য দেখার অপেক্ষায় পোখারা। মেয়েদের ফাইনালে ৯২ রান করে শ্রীলঙ্কাকে হারানোটা সহজ ছিল না, কিন্তু কাল দিনটাই যে ছিল বাংলাদেশের। ২ রানের জয় নিয়ে গেমসে প্রথমবারের মতো যোগ হওয়া মেয়েদের ক্রিকেটের চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। আর্চারদের দাপট সকাল থেকেই, আসলে তারও আগে থেকেই। এর আগের দুদিন যে কোয়ালিফিকেশন রাউন্ড হয়ে একের পর এক নক আউট ম্যাচ পেরিয়ে সোনার লড়াইয়ে পৌঁছাতে হয়েছে বাংলাদেশের আর্চারদের। সকালে রোমান সানাদের দলীয় প্রথম ফাইনালেই ভুটানকে হারিয়ে আর্চারির প্রথম সোনা।

আর্চারি বেশ কয়েক বছর ধরেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সফল ডিসিপ্লিন হিসেবে গণ্য হচ্ছিল। বাংলাদেশের মতো মাত্র দ্বিতীয় ক্রীড়াবিদ হিসেবে রোমানের অলিম্পিক যোগ্যতা অর্জন, কিংবা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ খেলাটিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে বাংলাদেশে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার অলিম্পিক এসএ গেমসে যে এত দিনেও মুকুট পরা হয়নি কারো। অবশেষে সেই অপেক্ষা ফুরাল। ভারত এবার অংশ না নেওয়ায় বাংলাদেশের সোনার সম্ভাবনা ছিলই। কিন্তু আর্চাররা কাল ছয়টি ইভেন্টেই যেমন নিরঙ্কুশ জয় তুলে নিলেন, তাতে তাদের আলাদা করে কৃতিত্ব দিতে হয়। রোমানদের সাম্প্রতিক ফর্ম এবং এমন দাপট করে প্রমাণ ওয়ার্ল্ড আর্চারির নিষেধাজ্ঞার মধ্যে না থাকলে ভারতীয়রা এসেও এবার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ত রোমানদের সামনে। মেয়েদের ব্যক্তিগত রিকার্ভ ইভেন্টে বাংলাদেশের ১৪ বছর বয়সী ইতি খাতুন ভুটানের যে আর্চারকে হারিয়েছেন, তিনি রোমানের মতোই অলিম্পিক কোটা জেতা। কিন্তু ইতির সামনে দাঁড়াতে পারেননি। আর্চারিতের ভারতের মতো অত সাফল্য না থাকলেও ভুটানের ঐতিহ্যও কম নয়। কাল বাংলাদেশের ছয়টি পদকের লড়াইয়ের দুটি জয় ভুটানের বিপক্ষে, শ্রীলঙ্কা উঠেছিল তিনটির ফাইনালে, তিনটিতেই তাদের হতাশ করেছে বাংলাদেশ, স্বাগতিক নেপালেরও জুটেছে শুধু রুপা। সোনার হাসি শুধু এদিন মার্টিন ফ্রেডরিক শিষ্যদের।

জার্মান এই কোচের অধীনেই অনেকটা বদলে গেছে বাংলাদেশের আর্চারি। তাঁর অধীনেই রোমানের পারফরম্যান্সের ঊর্ধ্বগতি, বিশ্বের অন্যতম সেরা আর্চার হিসেবে নিজেকে মেলে ধরা। এবার তাঁর হাত ধরেই এসএ গেমসে সোনাঝরা দিন বাংলাদেশের। রোমান, তামিমুল ইসলাম ও হাকিম আহমেদরা ৫-৩ সেটে হারান শ্রীলঙ্কাকে। ইতি খাতুন, মেহনাজ আক্তার ও বিউটি রায়রা শ্রীলঙ্কার মেয়েদের দলকে ততটাও সুযোগ দেননি, হারান ৬-০ ব্যবধানে। দুপুরের আগে শেষ ইভেন্ট রোমান-ইতির রিকার্ভ মিশ্রর ফাইনালেও অন্য রকম কিছু হওয়ার সুযোগ দেননি দেশের সেরা এই দুই আর্চার। ভুটানি দুই প্রতিপক্ষকে হারিয়েছে তারা ৬-২ সেটে।

দুপুরের পর কম্পাউন্ডের তিন ইভেন্ট। দুপুরের পর মেয়েদের ফাইনালে প্রবল উত্তেজনা। ম্যাচ এই বাংলাদেশের দিকে হেলে পড়ে তো আবার শ্রীলঙ্কার দিকে। কিন্তু সাফল্যের পথে হাঁটছিলেন ঋজু। যেমন করে প্রতিটা তীর লক্ষ্যে রাখছিলেন তারা, তেমনি বাংলাদেশেরও নিরঙ্কুশ আধিপত্য একচুল নড়তে দেননি কম্পাউন্ডের প্রথম ইভেন্ট পুরুষ দলগততে সোহেল রানা, অসীম কুমার, আশিকুজ্জমানরা সোনা জেতেন নেন ২২৫-২১৪ পয়েন্টে ভুটানকে হারিয়ে। সুস্মিতা বণিক, সুমা বিশ্বাস ও শ্যামলী রায় মেয়েদের দলীয় ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে হারান ২২৬-২১৫ ব্যবধানে। শেষ ইভেন্ট মিশ্রতে সোহেল রানা ও সুস্মিতা বণিক নেপালকে ১৪৮-১৪০ পয়েন্টে হারিয়ে দিলে পুরো আর্চারি কমপ্লেক্সে উড়তে থাকে লাল-সবুজ পতাকা। গর্বিত দেখায় আর্চারি ফেডারেশন সাধারণ সম্পাদক রাজিবউদ্দিন আহমেদ চপলকে।

ওদিকে অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন কর্মকর্তারা একবার ক্রিকেট মাঠে তো একবার আর্চারিতে ছোটাছুটিতে ব্যস্ত। আর্চারিতে ছয় সোনা যখন নিশ্চিত হলো তখনই ক্রিকেটে বেজে উঠেছে ‘আমার সোনার বাংলা’। একটু একটু করে সবার উঁচুতে উঠছে বাংলাদেশের পতাকা। সালমা খাতুন, জাহানারা আলম, ফাহিমা আক্তারদের সবার গলায় তখন সোনালি পদক ঝিলিক দিচ্ছে পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্যের আলোয়, ঠিক অন্নপূর্ণার মতো।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা