kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

চট্টগ্রাম ওয়াসা

পছন্দের চেয়ারম্যান বানাতে ‘সবই’ করছেন এমডি

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পছন্দের চেয়ারম্যান বানাতে ‘সবই’ করছেন এমডি

চট্টগ্রাম ওয়াসার চেয়ারম্যান হিসেবে অধ্যাপক ড. এস এম নজরুল ইসলামের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ২৯ সেপ্টেম্বর। ঠিক সেদিনই মুরাদপুর পিলখানা রোডের রোকসানা মান্নানের ০৪৪৮৫৪ হিসাব নম্বরের পানির আবাসিক সংযোগটি তাঁর স্বামী অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমের নামে পরিবর্তনের আবেদন করেন। অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে সেদিনই প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তাসহ দুটি টেবিল ঘুরে দুই দিনের মধ্যে দাপ্তরিক কাজ সেরে গ্রাহক হয়ে যান প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর।

চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসটিসি) উপাচার্য প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীরকে তড়িঘড়ি করে গ্রাহক করার কারণ বুঝতে অবশ্য খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। গ্রাহক হওয়ার দুই সপ্তাহ পরেই গত ২১ অক্টোবর তাঁকে চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ডের গ্রাহক প্রতিনিধি হিসেবে মনোনয়নের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয়। এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ নভেম্বর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ সাঈদ-উর-রহমান স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে ড. জাহাঙ্গীর আলমকে পানি ব্যবহারকারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সদস্য হিসেবে ওয়াসা বোর্ডের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ডের সাবেক সদস্য সোলায়মান আলম শেঠের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন।

তবে বোর্ড সদস্য হিসেবে ড. জাহাঙ্গীরকে অন্তর্ভুক্ত করার আগেই তাঁকে ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিতে উঠে পড়ে লেগেছে একটি পক্ষ। এরই মধ্যে তাঁর জীবনবৃত্তান্ত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে চট্টগ্রাম ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে। আর পেছনে থেকে এসব কিছুই করছেন সংস্থার এমডি প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ। মূলত নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান হিসেবে পেতে বোর্ডের সবাইকে অন্ধকারে রেখে এমডি একক সিদ্ধান্তে সব কিছু করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

চট্টগ্রাম ওয়াসাসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আগামী বছরের অক্টোবরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ শেষ হচ্ছে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের। ২০০৯ সালের আগস্ট মাস থেকে দফায় দফায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া এমডির নিজের মেয়াদ বাড়াতে পছন্দের বোর্ড চেয়ারম্যান প্রয়োজন। যিনি একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় ওঠা একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন না।

পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ আইন-১৯৯৬ অনুযায়ী ১৩ সদস্যের চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ডে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মর্যাদার দুজন প্রতিনিধি এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদাধিকারবলে সদস্য হবেন। বাকি ১০ সদস্য হবেন সরবরাহকৃত পানি ব্যবহারকারী, সংশ্লিষ্ট এলাকার শিল্প ও বণিক সমিতি, ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্টস অব বাংলাদেশ, ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের একজন করে, সংশ্লিষ্ট সংস্থার এলাকাধীন পৌর কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী নারীসহ দুইজন, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী একজন করে।

চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ডের গ্রাহক প্রতিনিধি মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ জানিয়ে আসছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। গ্রাহক প্রতিনিধি হিসেবে অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলমকে বোর্ড সদস্য নিয়োগ বিষয়েও একই অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটির।

ক্যাব, চট্টগ্রাম বিভাগের সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ আইন-১৯৯৬-এ পানি ব্যবহারকারীদের প্রতিনিধির কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। পানি ব্যবহারকারী প্রতিনিধি বলেনি। কিন্তু ওয়াসা বোর্ডে গ্রাহক প্রতিনিধি হিসেবে যাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তিনি স্ত্রীর নামের মিটার হিসাব নম্বর পরিবর্তন করে গ্রাহকই হয়েছেন মাত্র দুই মাস আগে। তিনি গ্রাহক প্রতিনিধিত্ব করলেন কিভাবে? তিনি তো কোনো গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করেন না।’

মূলত চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসব অনিয়ম করছেন বলে অভিযোগ করেন ক্যাব সভাপতি। ড. জাহাঙ্গীরকে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় গ্রাহক করা হয়েছে মূলত চেয়ারম্যান বানানোর বাসনায়। গ্রাহক প্রতিনিধি নিয়োগে অনিয়ম ও এমডির চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে খুব শিগগির হাইকোর্টে রিটের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে ক্যাব সভাপতি জানান।

সাধারণত ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয় ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) মনোনীত সদস্যকে। বর্তমান চেয়ারম্যান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম, তেমনই আইইবি মনোনীত প্রতিনিধি ছিলেন। সেই রীতি অনুযায়ী ড. নজরুলের স্থলাভিষিক্ত হবেন ওয়াসা বোর্ডে আইইবি মনোনীত প্রতিনিধি। সেই হিসাবে চেয়ারম্যান হওয়ার কথা বর্তমান বোর্ডে আইইবি মনোনীত প্রতিনিধি প্রকৌশলী মো. হারুন।

এ প্রসঙ্গে প্রকৌশলী হারুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী ওয়াসার চেয়ারম্যান আইইবি মনোনীত সদস্য থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম ওয়াসায় এই নিয়ম চলে আসছিল। পরে চেয়ারম্যানের জন্য আইইবি থেকে এবারও সেভাবে প্রতিনিধি করা হয়েছিল। ২০১০ সালে আমাকে যখন আইইবির প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিল তখনও আমাকে ওয়াসার বোর্ড সদস্য হওয়ার জন্য বলা হয়েছিল, কিন্তু আমি হইনি। আর এবার আমি শুধু সদস্য হতে বোর্ডে আসিনি।’

আইইবি প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী মো. আব্দুস সবুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান কে মনোনীত হবেন সেটা সরকারি সিদ্ধান্ত। তবে সাধারণত আইইবি মনোনীত সদস্য ওয়াসা চেয়ারম্যান মনোনীত হন। আমরা যাঁকে প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করেছি তিনি ডায়নামিক, সিনিয়র ও পেশাদার মানুষ। আশা করছি সরকার চেয়ারম্যান নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভুল করবে না।’

হিসাব নম্বর পরিবর্তন করে গ্রাহক হওয়া, গ্রাহক থেকে গ্রাহক প্রতিনিধি এবং সব শেষ ওয়াসা বোর্ড চেয়ারম্যান হিসেবে নাম প্রস্তাবের বিষয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অভিযোগের অনেকগুলোই সত্য। ড. জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রাহকের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। এমন আবেদন হাজার হাজার হয় প্রতি বছর। গ্রাহক প্রতিনিধি নিয়োগের ক্ষেত্রেও সব ধরনের নিয়ম-কানুন মানা হয়েছে।’

প্রাতিষ্ঠানিক মনোনীত ব্যক্তিকে গ্রাহক সদস্য না করে ব্যক্তিবিশেষকে বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে এমডি বলেন, ‘ক্যাবকে আমি নিজেই বলেছি সরকার থেকে কিংবা মন্ত্রণালয় থেকে একটা অর্ডার নিয়ে আসতে। আমিও ভোক্তা প্রতিনিধি চাই।’

ড. জাহাঙ্গীর আলমকে বোর্ড চেয়ারম্যান হিসেবে সুপারিশের পক্ষে প্রকৌশলী ফজলুল্লাহ বলেন, ‘নেম এন্ড ফেমের বিবেচনা করলে চুয়েটের সাবেক উপাচার্য এবং ইউএসটিসির বর্তমান উপাচার্য ড. জাহাঙ্গীর আলম অনেকটা এগিয়ে। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদটা ভারী না হলে উপস্থাপন করা কঠিন।’

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা