kalerkantho

সোমবার । ২০ জানুয়ারি ২০২০। ৬ মাঘ ১৪২৬। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

দুর্নীতির ৩৫০০ মামলা ঝুলে আছে বিচারে

আজ আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস

আশরাফ-উল-আলম ও এম বদি-উজ-জামান   

৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দুর্নীতির ৩৫০০ মামলা ঝুলে আছে বিচারে

ঢেলে সাজানো হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুর্নীতির মামলা পরিচালনার জন্য আলাদা স্থায়ী প্রসিকিউশন টিম গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এখনো নিজস্ব প্রসিকিউটর নিযুক্ত হয়নি। অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই প্রসিকিউশন টিম কাজ করে যাচ্ছে। তদারক করছে দুদকের লিগ্যাল ও প্রসিকিউশন অনুবিভাগ। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান ও তদন্ত করা হলেও দুদকের মামলায় আসামিদের শতভাগ শাস্তির আওতায় আনা যায়নি। তদন্ত, অনুসন্ধান ও বিচারে এখনো দীর্ঘসূত্রতা বিরাজমান।

সম্প্রতি দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছেন। অবৈধ সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য ফাঁকি, অর্থপাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে।

তদন্তাধীন ওই সব মামলা। কিন্তু রাঘব বোয়ালরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। দুদকের স্বাধীনতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন ছিল। সে অবস্থা কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করা হচ্ছে। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়েছে বিদেশ যাওয়ার ওপর। অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানেও অভিযান চালানো হচ্ছে। এসব সফল হলে দুদকের দুর্নাম ঘুচতে পারে বলে মনে করেন অনেকে। তাঁদের মতে, অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে না পারলে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে অভিযান।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, বিচারে ও তদন্তে দীর্ঘসূত্রতায় প্রকৃত ঘটনা অনেক সময় আড়াল হয়ে যায়। দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। দ্রুত বিচার করতে পারলে অপরাধীরা পার পেতে পারবে না। এই বিচার হতে হবে প্রভাবমুক্ত।

জানা যায়, দুদকে এখনো ঝুলে আছে সাড়ে তিন হাজার অভিযোগের তদন্ত ও অনুসন্ধান। জনবলের অভাবে অনুসন্ধান ও তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিচারাধীন মামলাও বাড়ছে। গত অক্টোবর পর্যন্ত হিসাবে দেখা যায়, তিন হাজার ৩৮৮টি মামলা বিচারাধীন। গত দুই মাসে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা আরো কিছু বেড়েছে।

সারা দেশে দুদকের মামলা বিচারাধীন আছে দুই হাজার ৮২৮টি, যার মধ্যে ঢাকায় ৮১৬টি। বিচার চলমান থাকা মামলার সংখ্যা দুই হাজার ৫৬৭টি। উচ্চতর আদালতে বিচার স্থগিত আছে ২৬১টি মামলার। দুদকের ওয়েবসাইটে দেওয়া ওই তথ্য থেকে দেখা যায়, গত অক্টোবরে আদালতে মোট ২২টি মামলার রায় হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি মামলায় আসামিদের সাজা দেওয়া হয়েছে। আটটি মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছেন। এ বছর মোট ২৩০টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। ১৪৪টি মামলায় আসামিদের সাজা হয়েছে। খালাস পেয়েছেন ৮৬টি মামলার আসামিরা। এ বছর ৬২ শতাংশ আসামির সাজা হয়েছে।

সুুপ্রিম কোর্টে মামলা পরিচালনাকারী দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, দুদকের মামলা নিম্ন আদালতে ও উচ্চ আদালতে দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে। যেকোনো সময়ের চেয়ে মামলা নিষ্পত্তির হার এখন বেশি। দুদকের আইনজীবী হিসেবে মামলা নিষ্পত্তির হারে তিনি সন্তুষ্ট বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, মামলা নিষ্পত্তির গতি আরো বাড়বে।

দুর্নীতি দমন ব্যুরোর করা মামলাও এখনো বিচারাধীন। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ২৫-৩০ বছর ধরে এসব মামলা ঝুলে আছে। বেশ কিছু মামলার তদন্তও এখনো ঝুলে আছে। দুদক সূত্রে জানা যায়, ব্যুরো আমলে করা মামলার ১৮৭টি ঢাকায় এবং ৩৭৩টি ঢাকার বাইরে বিচারাধীন। মোট ৫৬০টি বিচারাধীন মামলার মধ্যে ২৫৭টির বিচার কার্যক্রম স্থগিত আছে। এ বছর ব্যুরোর মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ৩০টি। ১২টি মামলায় আসামিদের সাজা দেওয়া হয়েছে। খালাস দেওয়া হয়েছে ১৮টি মামলার আসামিকে। ব্যুরো আমলে করা মামলার ৬০ শতাংশ আসামিই খালাস পেয়েছেন।

ব্যুরো আমলের মামলায় এত বেশিসংখ্যক আসামির খালাস পাওয়া সম্পর্কে দুদকের বিশেষ পিপি রেজাউল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ওই সব মামলার বিচার চলছে দীর্ঘদিন ধরে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে মামলাগুলো ঝুলে ছিল। বছরের পর বছর ঝুলে থাকা এসব মামলার অনেক সাক্ষী, আসামি, বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তা মারা গেছেন। অনেকে অবসরে গেছেন। তাঁদের পাওয়া যায় না। এসব কারণে আসামিরা খালাস পাচ্ছেন।

দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর। এর আগে ছিল দুর্নীতি দমন ব্যুরো। সে আমলে বিচারিক আদালত ও উচ্চ আদালতে মামলা পরিচালনা বা মামলাসংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতেন পরিচালক (আইন)। কিন্তু দুদক সারা দেশে মামলা পরিচালনার জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে বিশেষ কৌঁসুলি নিয়োগ দিয়েছে। দুদক আইন-২০০৪ এর ৩৩(৩) ধারা মতে, কমিশনের নিজস্ব প্রসিকিউটর নিযুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অস্থায়ী ভিত্তিতে কমিশনের নিযুক্ত বা অনুমোদিত শতাধিক আইনজীবী বিচারিক আদালত ও সুপ্রিম কোর্টে এই আইনের মামলা পরিচালনা করছেন।

এর পরও অনেক মামলার তদন্তে ও বিচারে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়। মেসার্স সোনালী সোডা ফ্যাক্টরি ২০০০ সালের ২৭ জুন থেকে ২০০৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাঁচামাল আমদানি করে মূসক রেজিস্টারে এন্ট্রি না করে সাবান উৎপাদন করে আবার মূসক পরিশোধ না করেই পণ্য খালাস করে ১৪ কোটি ২৬ লাখ ৯৯ হাজার ৩২৭ টাকা আত্মসাৎ করেছিল। প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী নুর উদ্দিন, কাস্টম এক্সসাইজ ও ভ্যাট, তেজগাঁও সার্কেলের তত্কালীন সুপারিনটেনডেন্ট মো. সিরাজুল হক ও আবুল খায়েরসহ ৯ কর্মকর্তা পরস্পর যোগসাজশে ওই টাকা আত্মসাৎ করেন। এই অভিযোগে তত্কালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরোর টাস্কফোর্স-৪ এর পরিদর্শক মোনায়েম হোসেন ২০০৪ সালের ১১ জুলাই তেজগাঁও থানায় মামলা করেছিলেন। ১৫ বছর ধরে ঝুলে আছে এই মামলার তদন্ত।

২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর শেরপুরের স্বর্ণ ব্যবসায়ী সুমন কর্মকার, তাঁর সহযোগী রাফিউল করিম ও রূপালী ব্যাংক শেরপুর শাখার ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে ৭৯ লাখ ৫৩ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেছিলেন একটি কম্পানির প্রতিনিধি। মামলাটির তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। ২০১৫ সালে বেসিক ব্যাংকের কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৫৬টি মামলা হয়েছিল। চার বছরেও এসব মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। দুদক সূত্রে জানা গেছে, এর মধ্যে একটি মামলার তদন্ত শেষ হওয়ার পর দুদক চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু এখনো আদালতে তা দাখিল হয়নি। সাবেক প্রতিমন্ত্রী আ. মান্নান খান ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে জানা আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০১৪ সালে মামলা করেছিল দুদক। ২০১৫ সালে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। চার বছরেও বিচার শুরু হয়নি। হলমার্কের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা ১১টি মামলার বিচার শেষ হয়নি চার বছরেও।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা