kalerkantho

শনিবার । ২৫ জানুয়ারি ২০২০। ১১ মাঘ ১৪২৬। ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

শত্রুর বাংকারে আমিই প্রথম গুলি চালাই

লিমন বাসার, বগুড়া   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শত্রুর বাংকারে আমিই প্রথম গুলি চালাই

মুক্তিযোদ্ধা, মহসিন আলী

‘হাতে অস্ত্র বলতে একটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল। সঙ্গী আরো ৩১ জন মুক্তিযোদ্ধা। টার্গেট বগুড়ার সারিয়াকান্দি কলেজ মাঠে অবস্থান নেওয়া দুই শতাধিক পাকিস্তানি সেনা। ৩২ জনের দলে আমি সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। তবে সাহস আর ক্ষিপ্রতা বিবেচনায় প্রথম গুলি ছোড়ার দায়িত্ব পড়ে আমার ওপর। ক্রল করে পৌঁছে যাই টার্গেট পয়েন্টে। তখনো ভোরের আলো ফোটেনি। বাইরে পাহারায় থাকা সেনা সদস্যদের লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি ও গ্রেনেড ছুড়তে শুরু করি। সঙ্গে সঙ্গে অন্য মুক্তিযোদ্ধারাও চারদিক থেকে একযোগে আক্রমণ চালায়। শত্রুপক্ষও গুলি ছুড়তে থাকে। তবে অপ্রস্তুত থাকায় ২০-২২ জন সেনা ঘটনাস্থলেই ধরাশায়ী হয়। ঘণ্টাব্যাপী তুমুল যুদ্ধের পর ভোরের আলো ফোটে। দেখা যায় বাংকারে ঘুমিয়ে থাকা সেনারা অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সাঁজোয়া যান ফেলেই পালিয়ে গেছে। আহত অবস্থায় সারেন্ডার করে কয়েকজন।’

একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা মহসিন আলী বলছিলেন যুদ্ধদিনের স্মৃতিময় কথাগুলো। তিনি গাবতলী থানার বালাইহাটা গ্রামের কৃষক মোকবুল হোসেন-রসিদা খাতুন দম্পতির সন্তান। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। একাত্তরে তিনি গ্রামের স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়তেন।

কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপচারিতায় এ বীর মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধদিনের স্মৃতির খাতা খুলে বসেন। তিনি বলেন, ‘গ্রামে একটিমাত্র রেডিও ছিল আজিজ মণ্ডলের। একদিন গ্রামের মাঠে দেখলাম বন্ধুরা রেডিও শোনার জন্য জড়ো হয়েছে। আমিও শুনলাম বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ। মনের মধ্যে উত্তেজনার ঝড় বয়ে যায়। ২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধুর আহ্বান শুনে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। গাবতলীর কুটুমহিন, মালিয়াডাঙ্গা, কলাকাটা, তল্লাতল্লাসহ আরো কয়েকটি গ্রামের প্রায় ৩০ জন তরুণ-কিশোর মিলে পরামর্শ করি। এরপর মালিয়াডাঙ্গা গ্রামের হাই স্কুল মাঠে কমিউনিস্ট পার্টির সাইফুল ইসলাম প্রাথমিক ট্রেনিং শুরু করেন।’

মহসিন আলী বলতে থাকেন, ‘ছোট বলে প্রথমে আমাকে ওরা নিতে চায়নি। এ অবস্থায় বন্ধু সোলেমানকে নিয়ে সোনাতলার চরপাড়ায় গিয়ে গোফফার ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করি। এক রাতে মাকে কিছু না জানিয়েই ঘর ছাড়ি। সম্বল বলতে আমার পকেটে ১০ টাকা আর একটি ক্যামি ঘড়ি এবং বন্ধু সোলেমানের কাছে ছিল ১০০ টাকা। দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিয়ে হাজির হই হিলি সীমান্তে। সেখান থেকে পরদিন আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় ভারতের কামারপাড়া বালুঘাট হয়ে মালদহ স্কুলের ট্রেনিং সেন্টারে। সেখানে দেড় মাস ট্রেনিং নিই। এরপর ২৮ দিনের হায়ার ট্রেনিং শেষে আব্দুল আজিজ ও রঞ্জু গ্রুপের সঙ্গে দেশে ফিরি আমরা ৩০ জন। নৌকায় অস্ত্র নিয়ে আমরা সারিয়াকান্দিতে ঢুকি। আমার কাছে ছিল থ্রি নট থ্রি রাইফেল। আর সারিয়াকান্দি কলেজ মাঠের ওই আক্রমণ ছিল আমার প্রথম সম্মুখযুদ্ধ।’

বীর মুক্তিযোদ্ধা মহসিন যুদ্ধদিনের কথাগুলো বলতে গিয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। বলেন, ‘কলেজ মাঠের অপারেশন শেষে পরবর্তী অভিযানের জন্য কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হয়। আর এই সময়টা ছিল খুব কষ্টের। কারণ বাড়ির সবার জন্য দুশ্চিন্তা হতো। মায়ের মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠত। এ সময় বেতারে প্রচার হওয়া গানগুলো আমাকে উদ্দীপ্ত রাখত। এরপর অপেক্ষার পালা শেষ হয়। ডাক পড়ে পরবর্তী অপারেশনে অংশ নেওয়ার।’

মহসিন আলী বলেন, ‘পাকিস্তানি সেনারা ট্রেনে যাচ্ছে—এমন খবরের ভিত্তিতে সহযোদ্ধা শাজাহান ও আমাকে হিলি অংশে পাঠানো হয়। দিনটি ছিল বুধবার। সারা রাত একটি কবরের মধ্যে লুকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি। মাইন পোঁতা ও গ্রেনেড ছোড়ায় বিশেষ দক্ষতা ছিল আমার। পূর্ব নির্দেশমতো বৃহস্পতিবার ভোরে গিয়ে হিলি সীমান্তে ট্রেনলাইনের নিচে মাইন পুঁতে রাখি। পাকিস্তানি সেনাদের বহনকারী ট্রেনটি আসে সন্ধ্যায়। কবরের ভেতর থেকে প্রথমে মাইনের বিস্ফোরণ ঘটাই। এরপর গ্রেনেড ছুড়ে মারি ইঞ্জিন লক্ষ্য করে। ইঞ্জিনসহ তিনটি বগি উল্টে যায় সেনাদের নিয়ে। এতে বেশ কিছু সেনা নিহত হয়। আহত ও অন্যরা দিগ্বিদিক দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। এ অপারেশন শেষে সারিয়াকান্দিতে ফেরার পর পাঁচমাইল এলাকায় রাজাকার দলের সঙ্গেও আমাদের সম্মুখযুদ্ধ হয়। পরে রাজাকারের দলটি আত্মসমর্পণ করে।’

মুক্তিযোদ্ধা মহসিনের প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন আব্দুল আজিজ রঞ্জু। এ প্লাটুনের সদস্যরা এরপর মিত্রবাহিনীর ট্যাংক ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বগুড়ার মাদলা গ্রামে অবস্থান নেন। বগুড়া শহর তখন ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। মহসিন বলেন, ‘বগুড়া শহরকে শত্রুমুক্ত করতে আমরা পেছন থেকে হামলা চালাই। একই সঙ্গে সামনে এবং ডান-বাম থেকে অন্য টিমগুলো আক্রমণ করে। টানা এক সপ্তাহ যুদ্ধের পর আমরা শক্রমুক্ত করে ফেলি প্রাণের জেলা বগুড়াকে। আরো বেশ কিছু খণ্ডযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। শেষ পর্যন্ত দেশমাতৃকাকে হানাদারমুক্ত করে নিজ গ্রামে ফিরেছি বিজয়ীর বেশে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা