kalerkantho

শনিবার । ২৫ জানুয়ারি ২০২০। ১১ মাঘ ১৪২৬। ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

তৃণমূল গোছাতে হিমশিম আ. লীগ

জেলা উপজেলায় ঘটছে সংঘর্ষ ► শীর্ষ পদ বাগাচ্ছেন এমপিরা

তৈমুর ফারুক তুষার   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



তৃণমূল গোছাতে হিমশিম আ. লীগ

মাঠে বিরোধী দলের আন্দোলন-সংগ্রাম সামাল দেওয়ার চাপ নেই। ফাঁকা মাঠে নিজেদের মধ্যে কলহ, বিবাদের মধ্য দিয়েই যেন নিজেদের শক্তির প্রকাশ ঘটাচ্ছেন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। ফলে ২১তম জাতীয় সম্মেলন সামনে রেখে তৃণমূলে সংগঠন গোছাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা।

জানা গেছে, এ পর্যন্ত বেশ কিছু জেলা-উপজেলায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে নিজেদের মধ্যে। কোন্দলের কারণে পেছাতে হয়েছে কয়েকটি জেলা ও উপজেলায় দলীয় সম্মেলন। কমিটি করতে গিয়েও বেগ পেতে হচ্ছে। বিতর্কিত ব্যক্তিদের কমিটিতে না রাখা এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক না করার বিষয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতির নির্দেশনা থাকলেও তার ব্যত্যয় ঘটছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য ও বিতর্কিত নেতাকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন, ত্যাগী নেতাদের সামনে আনার যে নীতি নিয়েছেন তার পুরোপুরি বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহ জেগেছে তৃণমূল আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীর মধ্যেই।

কমিটি গঠন নিয়ে কোন্দল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জেলায় একটু প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে, এটা কোনো অস্বাভাবিক না। তেমন কিছু ঠিক হয়নি। কিছু তো উত্তেজিত থাকেই লোকজন। কারণ পোস্ট-পদবি সবাই চায়। আমরা চেষ্টা করছি, যাতে দূরত্বটা কমিয়ে আনতে পারি। কাজটা এখন খুবই কঠিন। একেকটা পদে দেখা যায় চার-পাঁচজন প্রার্থী, সিরিয়াস প্রার্থী। বড় পদ দেওয়া যাবে মাত্র দুইটা। দেখা যায় ছয়জন সভাপতি ও পাঁচজন সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী। তাহলে বাকি ৯ জনকে কী করব? সে জন্য কিছু উত্তেজিত নেতাকর্মী থাকে...আমরা বোঝাই যে এখানে না পারলে অন্যখানে আপনাকে দেব। ইউনিয়নের নেতাকে থানায় আনব, থানার নেতাকে জেলায় নেব। এইভাবে সমন্বয় করার চেষ্টা করছি আমরা।’

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রে জানা যায়, একই ব্যক্তিকে দলীয় পদ এবং সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী না করার বিষয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে অনেকবার নিজের মনোভাব জানিয়েছেন। তিনি একাধিকবার বলেছেন, ‘আমার সংসার বড়। এখানে একজনকে সব ক্ষেত্রে মূল্যায়ন করলে বাকিরা বঞ্চিত হয়। তাই একেকজনকে একেক জায়গায় মূল্যায়ন করব।’ বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও সংসদ সদস্যদের দলীয় পদে না রাখার পক্ষে দলের অবস্থান তুলে ধরেন।

সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে অন্তত ৮ সংসদ সদস্য : বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় দলীয় সম্মেলনে অন্তত আটজন সংসদ সদস্যের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হওয়ার খবর জানা গেছে। গত ৩ ডিসেম্বর ভোলার লালমোহন উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন স্থানীয় সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন। যুবলীগের নানা অপকর্মে তাঁর নাম আসায় গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত যুবলীগের জাতীয় কংগ্রেসের কর্মকাণ্ড থেকে শাওনকে দূরে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন দলীয়প্রধান। তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক।

গত ২৬ অক্টোবর ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক হন এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী। ২০ নভেম্বর নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক পদ পান সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী। ২৫ নভেম্বর কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন স্থানীয় এমপি আফজাল হোসেন। ১৭ নভেম্বর ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন স্থানীয় এমপি আনোয়ারুল আজিম আনার। ১৬ নভেম্বর যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন স্থানীয় এমপি রণজিৎ কুমার রায়।

এ ছাড়া ঢাকা বিভাগের একটি এবং রংপুর বিভাগের একটি উপজেলায় সভাপতি পদ পেয়েছেন একজন করে এমপি। আরো কয়েকজন এমপির বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা আছে।

সম্মেলন স্থগিত, কমিটি বাতিল : তীব্র কোন্দলের কারণে অন্তত দুটি জেলা ও ছয় উপজেলায় দলীয় সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। একটি উপজেলায় কমিটি ঘোষণার পর তা বাতিল করা হয়েছে তীব্র সমালোচনার মুখে।

দলীয় কোন্দলের কারণে মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন স্থগিত করা হয় গত মঙ্গলবার। ধানমণ্ডিতে ওই তথ্য জানান আওয়ামী লীগের ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনি। একই সঙ্গে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনও স্থগিত করা হয়েছে। সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় আট ইউনিয়নের ওয়ার্ড কমিটি বাতিল করার দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা।

৩ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সংঘর্ষ হয়। পরে স্থগিত ঘোষণা করা হয় সেখানকার কাউন্সিল অধিবেশন। কমিটি নিয়ে সংঘর্ষে ফরিদপুরের নগরকান্দা ও সালথা উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন স্থগিত করা হয় ১৬ নভেম্বর।

২৪ বছর পর চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল এবার জাতীয় সম্মেলনের আগেই। স্থানীয় এমপি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমানের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে সম্মেলন স্থগিত হয়ে গেছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ও বোয়ালখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনও স্থগিত করা হয়েছে।

ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গি উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে মোহাম্মদ আলীকে সভাপতি ও সফিকুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। তাঁরা দুই ভাই। তাঁদের বড় ভাই হলেন জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সংসদ সদস্য দবিরুল ইসলাম। এ নিয়ে সমালোচনার মুখে কমিটি বাতিল ঘোষণা করে জেলা কমিটি।

সংঘর্ষ জেলা-উপজেলায় : গত বৃহস্পতিবার সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে খাবার নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। গত ১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সংঘর্ষ হয়। ২৯ নভেম্বর সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত হন ১২ জন। ২৮ নভেম্বর সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা আওয়ামী লীগের এক সভা ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ৩০ জন আহত হন। ২৫ নভেম্বর কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে দুই পক্ষের সংঘর্ষে অর্ধশত নেতাকর্মী আহত হন। ৩০ নভেম্বর আবারও দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে আহত হন অন্তত ১০ জন।

২৪ নভেম্বর ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলায় একটি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্মেলন ঘিরে দুই পক্ষের সংঘর্ষ বাধে। ২০ নভেম্বর নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়। ১৫ নভেম্বর সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ ইউনিয়নের কয়েকটি ওয়ার্ডে দলের কাউন্সিল অধিবেশনে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গত ২৬ অক্টোবর লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিতসভায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন আহত হন। একই দিন নড়াইলের নড়াগাতি উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত হন ১৩ জন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা