kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

সময় ও খরচ কমাতে সংস্কার দেশে দেশে

বিচারকের সংখ্যা বাড়িয়ে নয়, প্রক্রিয়া সংস্কার ও অটোমেশন করেই পরিবর্তন এনেছে সিঙ্গাপুর

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সময় ও খরচ কমাতে সংস্কার দেশে দেশে

বলা হয়ে থাকে, আইসবার্গের তিন-পঞ্চমাংশ তবু দেখা যায়, আর মামলার মূল খরচের খুব কম অংশই দৃশ্যমান হয়। অদৃশ্য খরচেই বেশি নাকাল হয় বিচারপ্রার্থীরা। নানা অনিয়ম, অদক্ষতা ও অপ্রতুল অবকাঠামোর কারণে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে এ সমস্যা প্রকট, তবে উন্নত দেশগুলোও এর থেকে মুক্ত নয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তাই সব দেশই কমবেশি সচেষ্ট। মামলার খরচ ও সময় কমানোর জন্য আইনি ও কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ আছে দেশে দেশে।

শুনানি কমাতে সিঙ্গাপুরে অর্থ আরোপ করার বিধান আছে। সুপ্রিম কোর্ট ও আপিল বিভাগে প্রথম দিনের শুনানিতে অর্থ লাগে না। তবে দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম দিনের জন্য দেড় হাজার ডলার করে, পরে দশম দিন পর্যন্ত দুই হাজার ডলার এবং এর পর থেকে প্রতিদিন তিন হাজার ডলার দিতে হয়। আইনজীবীর ফিসহ মামলার উভয় পক্ষের খরচ বেঁধে দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া আছে সিঙ্গাপুরের আদালতকেও। দেওয়ানি মামলায় পদ্ধতির অপব্যবহারের জন্য আইনজীবীকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা হয় সেখানে।

চীনের বিভিন্ন শহরের আদালতে আইনজীবীর খরচ নিয়ন্ত্রণের মানদণ্ড নির্দিষ্ট করে দিয়েছে সেখানকার কর্তৃপক্ষ। দেওয়ানি মামলা কত দিন চলতে পারে, সম্ভাব্য খরচ কত এসব বিষয়ে আগাম ধারণা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে সেখানকার ল ফার্মগুলোর। কোর্ট ফি ও নথিপত্রের খরচ মামলার পক্ষগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয় আদালত থেকে। কোন মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আইনজীবীর ফি কতটা যৌক্তিক সে বিষয়েও আদালত অনেক সময় ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন।

খরচ কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে পাকিস্তান ফৌজদারি ও দেওয়ানি আইন সংশোধন করে ২০১৭ সালে কস্টস অব লিটিগেশন অ্যাক্ট পাস করেছে। এই আইনের উদ্দেশ্য হচ্ছে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা কমানো, ভিত্তিহীন অজুহাতে মামলার সময় চাওয়ার প্রবণতা কমানো। মামলার কোনো পক্ষ সময়ের আবেদন করলে প্রতিবার প্রতিপক্ষকে পাঁচ হাজার রুপি বা তারও বেশি অর্থ দিতে হয়। ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে সময় চাওয়ার খরচ প্রতিবার কমপক্ষে ১০ হাজার রুপি। 

খরচ কমানোর উদ্যোগ আছে যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের দেশগুলোতেও। ওই সব দেশে মামলায় যে পক্ষ হেরে যায় তাকে বিজয়ী পক্ষকে খরচ দিতে হয়। এর পরিমাণ ঠিক করে দেন আদালত। আইনজীবীর খরচেরও একটা অংশ পরাজিত পক্ষের কাছ থেকে আদায় করে বিজয়ী পক্ষকে দেওয়ার বিধান আছে ডাচ আইনে। 

মামলার পাহাড় সরিয়ে বিচারপ্রক্রিয়ার সময় ও খরচ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক সাফল্য এনেছে সিঙ্গাপুর, যা দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হয় ইউরোপেও। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের আইনের মৌলিক উৎস যে যুক্তরাজ্যের আইন, সেখানেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এর সুফল পেতে শুরু করেছে সেই দেশের বিচারপ্রার্থীরা।

বিচারকের সংখ্যা না বাড়িয়েই পরিবর্তন সিঙ্গাপুরে : সিঙ্গাপুরে সংস্কারের সাফল্য এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ল স্কুল সিঙ্গাপুরসহ ১১টি দেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে এক গবেষণায় দেখিয়েছে, বিচারের সময় ও খরচ কমানোর জন্য বিচারক বা আদালতের সংখ্যা নয়, বরং আদালতের দক্ষতাই মুখ্য। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে সিঙ্গাপুর যখন মামলাজট কমানোর সর্বাত্মক কর্মসূচি হাতে নিল, তখন উচ্চ আদালতে বিচারকের সংখ্যা ছিল ৯। ২০১৭ সালে মামলাজট যখন শূন্যের কোঠায়, তখন বিচারক ১১ জন। অর্থাৎ বিচারকের সংখ্যা বাড়িয়ে নয়, বিচারপ্রক্রিয়ার আমূল সংস্কার করে, ব্যাপক ডিজিটাইজেশন ও অটোমেশন করে এই পরিবর্তন এনেছে সিঙ্গাপুর।  

মামলাজটকে উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির জন্য বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করে কোর্ট পারফরম্যানসেস অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড : আ কমপারেটিভ পারসপেকটিভ’ শীর্ষক ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যিক বিরোধ বেড়েছে দ্রুতগতিতে। ওই সব বিরোধ বা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে। দুর্বল বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে যেসব দেশ মুক্ত অর্থনীতির পথে গেছে, তাদের প্রবৃদ্ধির গতি ১৫ শতাংশ কম হয়েছে। অদক্ষ আদালতের কারণে সেসব দেশের বিনিয়োগ কমেছে ১০ শতাংশ, কর্মসংস্থান কমেছে ৯ শতাংশ, আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে অহরহ।

বছরে কত মামলা হয়, নিষ্পত্তির হার ও মামলার সময় কেমন, প্রতি লাখ মানুষের জন্য বিচারক কয়জন—এসবের নিরিখে ১১টি দেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে ২০১৪ সালে গবেষণাটি করা হয়। দেশগুলো হলো—ব্রাজিল, চিলি, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, ফ্রান্স, জার্মানি, হাঙ্গেরি, পানামা, পেরু, সিঙ্গাপুর ও ইউক্রেন। গবেষণায় দেখা গেছে, মামলা কত দিন চলবে, কবে নিষ্পত্তি হবে তার ধরাবাঁধা সর্বজনীন নিয়ম নেই। দেশগুলোর নিজস্ব সক্ষমতা বা মানদণ্ডের ওপর তা নির্ভর করে। ১৯৯৫-৯৬ সালের প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চিলির আদালতে বিচারকপ্রতি মামলার সংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি, সেখানে জার্মানিতে মাত্র ১৭৬। গড় হিসাবে প্রত্যেক বিচারক বছরে প্রায় এক হাজার ৪০০ মামলা নিয়ে কাজ করেন। বিচারকপ্রতি এক হাজারের কম মামলা আছে হাঙ্গেরি, ফ্রান্স, ইউক্রেনে; দুই হাজারের নিচে সিঙ্গাপুর, পেরু, ব্রাজিল, কলম্বিয়ায়; আর তিন হাজারের নিচে ইকুয়েডর ও চিলিতে।

মামলা বেশি দায়ের হলেও চিলিতে নিষ্পত্তির হার ভালো। আবার বিচারকপ্রতি মামলার হার কম থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগে। আদালতের ব্যবস্থাপনা ভালো থাকলে মামলা বেশি রুজু হলেও নিষ্পত্তি দ্রুত হতে পারে। ফ্রান্স ও পেরুর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মামলা রুজুর চেয়ে নিষ্পত্তির হার বেশি। এই ১১টি দেশে বিচারকপ্রতি মামলা নিষ্পত্তির হার গড়ে এক হাজার ২৫৫টি। যুক্তরাষ্ট্রে এটি এক ২৩৩। মামলা নিষ্পত্তির হার সিঙ্গাপুরে ৯৪ শতাংশ, জার্মানিতে ৯৮ শতাংশ, পেরুতে ১০৪ শতাংশ ও ফ্রান্সে ১১০ শতাংশ।

গবেষণায় বলা হয়েছে, মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিচারকের ব্যক্তিগত সক্ষমতা ও আদালত ব্যবস্থাপনার দক্ষতা দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। প্রায়ই দেখা যায়, মামলার চাপ বেড়ে গেলে নিষ্পত্তির হার কমে যায়, এর অর্থ হলো প্রয়োজনমতো কর্মদক্ষতা বাড়াতে সক্ষম নন সংশ্লিষ্ট বিচারক।

যুক্তরাষ্ট্রসহ শিল্পোন্নত দেশগুলোতে নিষ্পত্তির হার ৯৭ শতাংশ। কিন্তু পিছিয়ে থাকা দেশ পেরুতে নিষ্পত্তির হার ১০৪ শতাংশ অর্থাৎ মামলা রুজুর চেয়ে নিষ্পত্তি বেশি। সংস্কারের মাধ্যমে আদালত ও বিচারকের সক্ষমতা বাড়ানোর ফলেই তা সম্ভব হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সক্ষমতা দেখিয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলিও। বছরে গড়ে একজন বিচারক পাঁচ হাজারের বেশি মামলা নিলেও ৯৩ শতাংশ মামলাই নিষ্পত্তি করেন তাঁরা।

মামলাজট কমাতে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোতে বাড়তি সংস্কারের পরামর্শ রয়েছে গবেষণায়। এতে অস্থায়ী বিচারক নিয়োগ, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির চর্চা বাড়ানো, মামলা ব্যবস্থাপনায় নতুন কৌশল প্রয়োগ, আর নথি থেকে তামাদি মামলা বাদ দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে।

বিচারব্যবস্থার সংস্কারের অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় মামলা তালিকা থেকে বাদ দিয়েই ৯০ শতাংশ জট কমিয়েছেন কানাডার ওন্টারিওর আদালত।

যুক্তরাষ্ট্রে বেশির ভাগ মামলাই শেষ হয় সামান্য বিচারিক প্রক্রিয়ায় অথবা আদালতের বাইরে। সিঙ্গাপুরে ১৯৯২ সাল থেকে ৮০ শতাংশ বাণিজ্যিক মামলা এক দিনের শুনানিতেই নিষ্পত্তি হয়। জার্মানিতে ৪০ শতাংশ মামলা শেষ হয় তিন মাসে। মাত্র ৩ শতাংশ মামলায় দুই বছরের বেশি সময় লাগে। মামলা নিষ্পত্তির গড় সময় পাঁচ মাস। যুক্তরাষ্ট্রে মামলা নিষ্পত্তির গড় সময় ১১ মাস। চিলিতে ১৬ মাস। 

গবেষণা মতে, বিচারকের সংখ্যা একটি বড় বিষয় হলেও দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সেটিই একমাত্র মাপকাঠি নয়। ফ্রান্সে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য বিচারক ৮.৪৫ জন, আর সিঙ্গাপুরে ০.৬৪ জন। তবু সিঙ্গাপুরে নিষ্পত্তির হার ৯৪ শতাংশ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি এক লাখ নাগরিকের জন্য বিচারক ১.২ জন, সেখানে নিষ্পত্তির হার ৯৮ শতাংশ।

বিচারক পদে সর্বোচ্চ বেতন দিলে ভালো প্রার্থী পাওয়া যাবে এবং দুর্নীতি কমবে বলে মত দেওয়া হয়েছে গবেষণায়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা