kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

‘পাকিস্তানি আর্মির গাড়ি মাইন পুঁতে উড়িয়ে দিই’

আব্দুল খালেক ফারুক, কুড়িগ্রাম   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘পাকিস্তানি আর্মির গাড়ি মাইন পুঁতে উড়িয়ে দিই’

মুক্তিযোদ্ধা, হোসায়েন আলী

হোসায়েন আলীর বয়স তখন ২২ বছর। মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার শপথ নিয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে ঘর ছাড়েন ২৮ মার্চ। সঙ্গে ছিলেন গ্রামের আরো চার যুবক। ভূরুঙ্গামারী ও সাহেবগঞ্জ ক্যাম্পে রিপোর্ট করার পর প্রশিক্ষণের জন্য তাঁদের দলটিকে পাঠানো হয় ভারতের দার্জিলিংয়ে মুজিব ক্যাম্পে। টানা ২৮ দিন প্রশিক্ষণ চলে। এরপর কম্পানি কমান্ডার আকরাম হোসেনের নেতৃত্বে তাঁকে পাঠানো হয় কুড়িগ্রামের সীমান্তবর্তী সোনাহাট ক্যাম্পে।

প্রথম অপারেশনের স্মৃতি আজও জ্বলজ্বল করে হোসায়েন আলীর হৃদয়কোণে। স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘ভারতীয় মেজরের নির্দেশে কম্পানির সবচেয়ে চৌকস ও সাহসী যোদ্ধাদের বাছাই করা হয়। সোনাহাট ব্রিজের পশ্চিম পারে বাংকার খুঁড়ে ডিফেন্স নিই। পাকিস্তানি বাহিনী আসার পথে অ্যান্টি পারসোনেল মাইন পুঁতে রাখি। কমান্ডারের নির্দেশে এক্সপ্লোসিভ দিয়ে কাটিং চার্জ করে সোনাহাট ব্রিজের একটি গার্ডার ধসিয়ে দিই।’

হোসায়েন আলী বলতে থাকেন, ‘মাইন পোঁতার পরদিন সকাল ১১টার দিকে পাকিস্তানি আর্মির একটি গাড়িবহর ওই এলাকায় আসার সঙ্গে সঙ্গে মাইন বিস্ফোরণে উড়ে যায় একটি গাড়ি। নিহত হয় বেশ কয়েকজন সেনা। এরপর দু-পক্ষে শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। প্রায় তিন ঘণ্টা গোলাগুলির একপর্যায়ে আমাদের গুলি ফুরিয়ে যায়। আমার বাংকারে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা আজিজার ছিল। আত্মরক্ষার্থে দুজন দুধকুমার নদে ঝাঁপ দিই। ওদিকে আমরা নদী পার হওয়ার আগেই আমাদের বাংকারটিতে মর্টার চার্জ করা হয়। ব্রিজের ওপর থেকে গুলি ছুড়তে থাকে পাকিস্তানি আর্মি। গুলিবিদ্ধ হয়ে আজিজার দুধকুমার নদে ডুবে যায়। আমিও গুলিবিদ্ধ হই। তবে হাল ছাড়িনি। কচুরিপানা আর কলাগাছের আড়াল হয়ে ভাটির দিকে যেতে থাকি। সারা দিন ও সারা রাত নদে ভেসে থাকার পর ভোরের দিকে চরের বালুতে পা ঠেকে। এরপর স্থানীয় এক চিকিৎসক একটি গুলি বের করেন। অবস্থার অবনতি হলে গরুর গাড়িতে করে আমাকে ভারতের হাসপাতালে পাঠানো হয়। আর পুঁটিমারীর চরে এক বিধবার জমিতে দাফন করা হয় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আজিজারকে।’

দীর্ঘ ৯ মাস রণাঙ্গনে অবস্থানকালে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে অংশ নেন হোসায়েন। ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা আর অসম সাহসের জন্য তাঁকে ‘পাগলা হোসেন’ বলে ডাকত সবাই। গত বুধবার দুপুরে রাজারহাট উপজেলার উমর পান্তাবাড়ি গ্রামের বাড়িতে বসে কালের কণ্ঠ’র কাছে স্মৃতিচারণা করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

হোসায়েন আলী বলেন, ‘ভূরুঙ্গামারীর পাটেশ্বরী যুদ্ধে আমাদের কম্পানি পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যারিকেডের মধ্যে পড়ে যায়। এখানে যুদ্ধে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এরপর আমাদেরকে পাঠানো হয় ভূরুঙ্গামারীর বাউশমারী এলাকায়। স্থানীয় চেয়ারম্যান আমাদের খাওয়ানোর জন্য গরু জবাই করে রান্নার আয়োজন করেন। ওই সময় হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করে বসে। আমরাও পাল্টা জবাব দিতে শুরু করি। টানা তিন দিন যুদ্ধ চলার একপর্যায়ে আমাদের কাভার দিতে সেখানে মুক্তিবাহিনীর আরেকটি কম্পানি পাঠানো হয়। ওই যুদ্ধে ২০-৩০ জন মুক্তিযোদ্ধাসহ উভয় পক্ষে বেশ কিছু লোক হতাহত হয়। একপর্যায়ে হানাদাররা পিছু হটে।’

ভূরুঙ্গামারীর মিলনী স্কুলে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্প থেকে ৪১ জন ধর্ষিতাকে উদ্ধারের স্মৃতিচারণা করেন হোসায়েন আলী। তিনি বলেন, ‘ইনফরমারের মাধ্যমে খবর নিয়ে হানাদার বাহিনীর সদস্যরা নিরস্ত্র থাকার সময়টাতে আমরা ক্যাম্পে আক্রমণ চালাই। আমাদের সাঁড়াশি অভিযানে বেশ কিছু সেনা নিহত হয়। অনেকেই পালিয়ে যায়। পরে বাংকারে তল্লাশি চালানোর সময় সেখানে ৪১ জন নারীকে উদ্ধার করি। কয়েক নারীর মরদেহও পাওয়া যায়। একজন আমাদের সামনেই মারা যান। আর বাংকারে সারি সারি সেনার লাশ পড়ে ছিল।’

যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে হোসায়েন আলীসহ কয়েকজনকে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য দার্জিলিংয়ে পাঠানো হয়। সেখান থেকে পাঠানো হয় নেপালে। সেখানে ১৫ দিনের প্রশিক্ষণকালে বন্য হাতির আক্রমণে তিনজন প্রশিক্ষকসহ ১৫-২০ জন মুক্তিযোদ্ধা মারা যান। তাঁরা দার্জিলিংয়ে ফিরে আসার পর শেখ কামাল ও শেখ জামাল যান ওই ক্যাম্পে। এরপর সাহেবগঞ্জ হেডকোয়ার্টারে পাঠানো হয় তাঁকে। আগস্ট মাসে বাহাদুরাবাদ-ফুলছড়ির ফেরি ধ্বংসের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকেসহ কয়েকজন যোদ্ধাকে। স্মৃতিচারণা করে হোসায়েন আলী বলেন, ‘আমরা ফুলছড়ি ঘাটের তিন মাইল উজান থেকে নদীতে গা ভাসিয়ে দিই। ফেরি আসার সঙ্গে সঙ্গে দূর থেকে চারটি অ্যান্টি ট্যাংক মাইন দিয়ে ফেরিটি ধ্বংস করে দিই। বেশ কিছু আর্মি হতাহত হয়। আর হানাদার বাহিনীর বোমায় সহযোদ্ধা মহসিন নিহত হন।’

আরেক ঘটনার উল্লেখ করে হোসায়েন বলেন, ‘আমরা পাকিস্তানি সেনা বহনকারী ট্রেন ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নিই। ২৭ নভেম্বর সকালে ট্রেন টার্গেট করা জায়গায় আসামাত্র আমরা মাইনের বিস্ফোরণ ঘটাই। পরে ট্রেনে থাকা সেনাদের সঙ্গে আমাদের সম্মুখযুদ্ধ বেধে যায়। ওই যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাসহ সাত রাজাকার নিহত হয়।’ 

সব শেষে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা নিজের একটি কষ্টের কথা তুলে ধরেন। আবেদন করলেও আজও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি তিনি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা