kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

ইউপি চেয়ারম্যান হয়ে কোটিপতি

লক্ষ্মীপুরের কুশাখালীর চেয়ারম্যান নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু

কাজল কায়েস, লক্ষ্মীপুর   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে




ইউপি চেয়ারম্যান হয়ে কোটিপতি

ছিলেন ইটভাটার শ্রমিক। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। ১৯৯৬ সালে ইউপি সদস্য (মেম্বার) পদে নির্বাচনে অংশ নেন। দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বের কথা গ্রামবাসীর কাছে তুলে ধরে মেম্বার নির্বাচিত হন। এরপর সরকারি বরাদ্দ লুটপাট ও অশোভনীয় আচরণের মাধ্যমে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি। ২০০৩ সালে আবারও মেম্বার এবং ২০১১ সালে ইউপি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভরাডুবি হয়। সব শেষে আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে ২০১৬ সালে ইউপি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে বিজয়ী হন। যদিও ওই নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। চেয়ারম্যান হয়েই রদ্রমূর্তি ধারণ করেন। সরকারি বরাদ্দ বিক্রি, চাঁদাবাজি, সালিস বাণিজ্য, বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার নামে পকেট ভারী করে তিনি এখন কোটিপতি। ক্ষমতার দাপটে শুধু ইউনিয়নের মানুষকে জিম্মি নয়, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলা-মামলা দিয়েও কোণঠাসা করেছেন। প্রতিবাদ করলে ‘পেটোয়া বাহিনী’র হামলার শিকার হতে হয় গ্রামবাসীকে।

তিনি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার কুশাখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নুরুল আমিন। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতিও। তাঁর অপকর্ম এখন মানুষের মুখে মুখে। অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক ও দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে প্রশাসন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলছেন—সবই চক্রান্ত।

এই চেয়ারম্যানের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে সম্প্রতি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এইচ এম এ খালেক ও মোশারেফ হোসেনসহ এলাকার কয়েক ব্যক্তি লিখিত অভিযোগ করেছেন। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যালয়ে এ অভিযোগ করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম বিভাগের স্থানীয় সরকারের পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব দীপক চক্রবর্তী একটি তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য চিঠি দেন। স্থানীয় সরকার বিভাগের লক্ষ্মীপুরের উপপরিচালককে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, নুরুল আমিনের বেপরোয়াপনার সহযোগী ছেলে আমিরুল ইসলাম জুয়েল, স্ত্রী নুর জাহান বেগম ও বড় ভাই গোলাম মাওলা। ছেলে জুয়েল যুবকদের নিয়ে পুরো ইউনিয়ন দাপিয়ে বেড়ান। বাবা-ছেলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেলেও অপমান-অপদস্থ হওয়ার ভয়ে এলাকাবাসী প্রকাশ্যে মুখ খুলতে অনিচ্ছুক।

দুজন ইউপি সদস্যের অভিযোগ—টিআর, কাবিখাসহ সরকারি সুযোগ-সুবিধা দিতে নুরুল আমিন চাহিদামতো টাকা আদায় করেন। গরিব-অসহায়দের না দিয়ে নিজের ঘরে ব্যবহার করছেন সরকারি বরাদ্দের এক হাজার ওয়াটের সোলার প্যানেল। চিলাদী ও কাঠালী গ্রামের অসহায়দের বয়স্ক, বিধবা ভাতার কার্ড, বিদ্যুৎ সংযোগ পাইয়ে দেওয়ার নামে চেয়ারম্যানের স্ত্রী-ছেলে অন্তত ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

অভিযোগে জানা গেছে, চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের পর নুরুল আমিন জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রায় দেড় হাজার শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন। স্ত্রী-ছেলের নামেও তিনি প্রায় ৩০০ শতাংশ জমি কিনেছেন। ইউনিয়নের শান্তির হাট বাজারে সরকারি জমিতে তিনি বহুতল মার্কেট নির্মাণ করেছেন। সেখানে দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কয়েক বছর আগেও সেখানে মাছবাজারের শেড ছিল। একইভাবে ইউনিয়ন পরিষদের সামনে সরকারি জমিতে দোকানঘর নির্মাণ করেছেন। সরকারি গভীর নলকূপ স্থাপনে মানুষের কাছ থেকে ২০-২৫ হাজার টাকা আদায় করছেন। হতদরিদ্র মায়েদের জন্য মাতৃত্বকালীন ও বিধবাসহ সরকারি ভাতার কার্ড দিতে প্রত্যেকের কাছ থেকে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে নিয়েছেন। এসব অপকর্মে তাঁর সঙ্গী স্ত্রী নুর জাহান। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া সই দিয়ে গ্রাহকের টাকা নিজেই উত্তোলন করে পকেট ভারী করছেন। ছেলে জুয়েল পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ পাইয়ে দিতে প্রতি গ্রাহক থেকে ছয়-সাত হাজার টাকা করে আদায় করেছেন। জুয়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সরকারি ঘর বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলে অন্তত ৫০ জনের কাছ থেকে ২০-৩০ হাজার টাকা করে নিয়েছেন। নুরুল আমিন ইউপি নির্বাচনের হলফনামায় ১০ লাখ টাকার সম্পত্তির কথা উল্লেখ করলেও বর্তমানে তিনি ১০ কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক বলে অভিযোগে বলা হয়।

গত শনিবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা জানা গেছে, ইপি চেয়ারম্যান ছয় হাজার টাকা নিয়ে চিলাদী গ্রামের জিন্নাতের নেছাকে ধোপা ভাতা কার্ড দিয়েছেন। তিন হাজার টাকা নিয়ে একই গ্রামের নয়ন আক্তারকে মাতৃত্বকালীন ভাতার কার্ড দেওয়া হয়। পরে জালিয়াতির মাধ্যমে চেয়ারম্যান নয়ন আক্তারের স্বাক্ষর দিয়ে ৯ হাজার টাকা উত্তোলন করে আত্মাসাৎ করেন। শরিয়ত উল্যা চেয়ারম্যানের ছেলে জুয়েলকে চার হাজার টাকা দিয়ে বয়স্ক ভাতা কার্ড নিয়েছেন। কুশাখালী গ্রামের দুলাল উদ্দিনের স্ত্রী মুরশিদা বেগম সুদের ওপর তিন হাজার টাকা নিয়ে জুয়েলকে দিয়েছেন মাতৃত্বকালীন ভাতার বইয়ের জন্য। দক্ষিণ চিলাদী গ্রামের জাহের মাঝির কাছে পারিবারিক সমস্যা সমাধান করে দেবেন বলে ছয় হাজার টাকা দাবি করেন চেয়ারম্যান। এ টাকা না পেয়ে তাঁকে তিনবার মারধর করেছেন। পরে সাদা কাগজে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ফের হামলার আশঙ্কায় কয়েক দিন জাহের মাঝি এলাকাছাড়া ছিলেন। গত সপ্তাহে তিনি এলাকায় এসেছেন।

চেয়ারম্যানের এহেন কার্যক্রম নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা চরম ক্ষুব্ধ। মধ্যম সারির তিনজন আওয়ামী লীগ নেতা জানান, জুয়া খেলার প্রতিবাদ করায় চেয়ারম্যান তাঁর অনুসারীদের দিয়ে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য অজি উল্যাকে বেদম পিটিয়ে পঙ্গু করে দিয়েছেন। তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পরপরই এ ঘটনা ঘটে। অজি উল্যা এখন বিছানায়। ১৮ বছর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি ছিলেন এই নেতা।

নির্যাতিত অজি উল্যা বলেন, ‘কুশাখালীতে নুরুল আমিনের শাসন চলছে। কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই ক্যাডার বাহিনী দিয়ে আমার মতো নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। সে বলে বেড়াচ্ছে, প্রশাসনও নাকি তার পকেটে।’

১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিন উদ্দিন বলেন, ‘২০১৬ সালে ইউপি নির্বাচনে মেম্বার বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিভিন্নজনের কাছ থেকে অন্তত ১০-১৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। সে সময় আমার কাছ থেকেও এক লাখ ৭০ হাজার টাকা নিয়েছেন। এখনো তা ফেরত না দিয়ে টালবাহানা করছেন।’ মহিন উদ্দিন মেম্বারও হতে পারেননি।

এত সব অভিযোগের বিষয়ে নুরুল আমিন বলেন, ‘বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীরা আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। চেয়ারম্যান হওয়ার আগে ক্রয় করা ৩০ শতাংশ জমি আমি পরে রেজিস্ট্রি করেছি। অভিযোগে উল্লেখ করা জমির পরিমাণ সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ঘরে ব্যবহার করা সোলার প্যানেলগুলো আমি কিনেছি। তবে ৬৫ ও ৪০ ওয়াটের দুটি সরকারি সোলার ছেলের নামে রয়েছে। স্ত্রী-ছেলে ও ইউপি সদস্যরা মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে থাকলে তার দায়ভার আমি নেব না।’

এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মোহাম্মদ সফিউজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অনেক অভিযোগ রয়েছে। এটি তদন্তের জন্য সময় প্রয়োজন। তবে এক মাসের মধ্যে স্থানীয় সরকার চট্টগ্রাম বিভাগে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা