kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

সাক্ষীর নিরাপত্তাও নেই, যাতায়াত খরচও নেই

আশরাফ-উল-আলম   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সাক্ষীর নিরাপত্তাও নেই, যাতায়াত খরচও নেই

দেশের আদালতে মামলার পাহাড়। প্রায় ৩৭ লাখ মামলা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে বিচার বিভাগ। মামলাজট কমাতে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। কিন্তু মামলার সংখ্যা না কমে প্রতিবছরই বাড়ছে। বেশির ভাগ বিচারাধীন মামলায় সাক্ষী হাজির হয় না। রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে সাক্ষীকে হাজির করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এ কারণে ন্যায়বিচার লঙ্ঘিত হয়। খালাস পেয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। সাক্ষী হাজির না হওয়ার অন্যতম কারণ তাঁদের নিরাপত্তাহীনতা। সংক্ষুব্ধ পক্ষের হামলায় সাক্ষী নিহত হওয়ার ঘটনা অনেক। তাঁদের নিরাপত্তায় আইন করার অনেক সুপারিশ আলোচনায় এসে ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে।    

বাংলাদেশের আদালতের বিভিন্ন মামলার হিসাব অনুযায়ী বেশির ভাগ আসামি খালাস পেয়ে যায়। আর এই খালাস পাওয়ার অন্যতম কারণ সাক্ষী হাজির হয় না। এর কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাক্ষীদের নিরাপত্তা নেই। আবার সাক্ষীদের কোনো যাতায়াত ভাতাও দেওয়া হয় না। কিছু সাক্ষী হাজির হন বাদীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে। তাঁরা নিরপেক্ষ সাক্ষী হিসেবে বিবেচিত হন না। সাধারণ বা নিরপেক্ষ সাক্ষীরা আদালতে হাজির হলে সেদিন তাঁদের কোনো বেনিফিট থাকে না। এক দিনের শ্রম নষ্ট, যাতায়াত বাবদ খরচ ও দুপুরের খাবার খরচ এবং ভোগান্তির বিষয়টি মাথায় রেখে নিরপেক্ষ সাক্ষীরা আদালতে যান না। আর এ কারণে বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় ২০০৫ সালের একটি জোড়া খুন মামলার আসামিদের হামলায় সাক্ষী সিকান্দার আলী গুরুতর আহত হন। গত ১০ জানুয়ারি রাতে পাথারিয়া ইউনিয়নের আসামুড়া গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। ওই হামলায় রিয়াজ উদ্দিন ও সিরাজ উদ্দিন নামে দুই সহোদরও আহত হন। সিকান্দার আলী, রিয়াজ উদ্দিন ও সিরাজ উদ্দিন আলোচিত জোড়া খুনের মামলার সাক্ষী। এ ঘটনায় দক্ষিণ সুনামগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০০৫ সালে দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পাথারিয়া ইউনিয়নের আসামুড়া গ্রামের সমাইউল্লাহ ও দৌলত মিয়াকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।  আসামিরা ওই মামলায় আপস করার জন্য মামলার বাদী ও সাক্ষীদের কয়েক দিন ধরে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিল। এরপর সাক্ষীদের ওপর হামলা করা হয়।

গত ১৩ জুন নাটোরের গুরুদাসপুরে মোমিন মণ্ডল হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী জালাল হোসেন মণ্ডলের (৬০) হাত ও পা কেটে নিয়ে যায় ওই মামলার আসামিরা। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। উপজেলার বিয়াঘাট ইউনিয়নের সাবগাড়ী এলাকায় ওই ঘটনা ঘটে। জালাল আট বছর ধরে সপরিবারে ঢাকায় বসবাস করছিলেন। অবসরপ্রাপ্ত সচিব আবদুল জব্বারের বাসায় কেয়ারটেকার হিসেবে ছিলেন। আগের দিন ১২ জুন তিনি মামলায় সাক্ষ্য দিতে বাড়ি যান। সকালে আদালতে যাওয়ার পথে তাঁর ওপর হামলা করে আসামিরা। জালালের চিৎকারে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে গুরুদাসপুর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তিনি মারা যান।

২০১৭ সালে চুয়াডাঙ্গা জজ আদালতে একটি মাদক মামলায় সাক্ষ্য দিয়ে ফেরার পথে হামলার শিকার হন মাসুদ হোসেন জোয়ার্দার। তাঁকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা হাসপাতালে ভর্তি করে। মাসুদ হোসেন পরে সাংবাদিকদের জানান, মাদক মামলায় সাক্ষ্য দিয়ে আদালত থেকে বেরিয়ে তিনি একটি ইজি বাইকে ওঠেন। এ সময় ওই মামলার আসামি সাঈদ হোসেন ইজি বাইক থেকে তাঁকে নামিয়ে বেধড়ক পেটান।

২০১৬ সালের ১ জুন লক্ষ্মীপুরে জেলা জজ আদালত চত্বরে জমি দখল ও চাঁদাবাজির মামলার বাদী রহিমা বেগম, তাঁর ছেলে সাক্ষী মাকছুদুর রহমান ও অটোরিকশাচালক ফারুক হোসেনকে মারধর করে ওই মামলার আসামিরা। ওই ঘটনায় লক্ষ্মীপুর সদর থানায় মামলা হয়। পরে মো. সাজু ও মঞ্জু নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সিরিয়াল কিলার হিসেবে কুখ্যাত রসু খাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মাশরুরা খাতুন হত্যা মামলার বিচার চলাকালে চট্টগ্রামের দ্রত বিচার ট্রাইব্যুনালে রসু খাঁ হামলা চালিয়েছিল তিন সাক্ষীর ওপর। ২০১১ সালের ১ জুন নিহতের বাবা মাহবুবুর রহমান, দুই চাচা শফিকুল ইসলাম ও ছানোয়ার হোসেনের সাক্ষ্য নেওয়া শেষ হলে ট্রাইব্যুনাল থেকে বের হওয়ার সময় হামলা করে রসু খাঁ। ওই সময় বিষয়টি বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।

গত ৮ এপ্রিল নোয়াখালীর জেলা জজ আদালতে একটি হত্যা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণকালে বিচারকের সামনেই নুরুল ইসলাম নামের এক সাক্ষীর মাথা ফাটিয়ে ফেলে আসামি। মামলার আসামি মিলন হাতকড়া পরা অবস্থায় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ছিল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মিলন কাঠগড়া থেকে নেমে হাতকড়া দিয়ে সাক্ষীর মাথায় আঘাত করে। এতে রক্তাক্ত জখম হন সাক্ষী। তাঁকে নোয়াখালী সদর হাসপাতালে নিতে হয়।

এ রকম অসংখ্য ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। আবার অনেক ঘটনা অপ্রকাশিত থেকে যায়। তবে সাক্ষীদের নিরাপত্তাহীনতা থেকেই যায়। বিশ্বের অনেক দেশের আইনেই সাক্ষীর নিরাপত্তার বিষয়টি রয়েছে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সাক্ষ্য দিতে এসে বিরোধীপক্ষের চক্ষুশূল হয় অনেকে। নির্যাতন ও ভয়ভীতি তো আছেই। সাক্ষী গুম হয়ে যাওয়ার নজিরও কম নয়। বাংলাদেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভিন্ন মামলা থেকে খালাস পাচ্ছে। সাক্ষীরা ভয়ে আদালতে হাজির হন না। এ বিষয়ে মাথা ব্যথা নেই কারো। সাক্ষীর সুরক্ষা আইন নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা থাকলেও তা হচ্ছে না।

২০০২ সালে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ এম হাসান আরিফ এ ধরনের আইন প্রণয়নের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। ২০০৬ ও ২০১১ সালের দিকেও এ ধরনের প্রস্তাব পেয়ে আইন মন্ত্রণালয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিল। কিন্তু তা আর হয়নি।

২০১৫ সালের ৭ ডিসেম্বর ফৌজদারি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নির্ধারিত দিনে সাক্ষীর উপস্থিতি ও তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে সরকারকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একটি হত্যা মামলার আসামির জামিন আবেদনের শুনানি শেষে ওই নির্দেশ দেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি আমির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। কিন্তু ওই আদেশের ফল আজেও দেখা যায়নি। 

সাক্ষীর খরচ দেওয়ার বিধান থাকলেও বাস্তবে নেই : ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪৪ ধারায় মামলার বাদী ও সাক্ষীদের আদালতে আসা-যাওয়ার খরচ দেওয়ার বিধান আছে। এর জন্য সরকারি অফিস আদেশ দরকার। ১৯৮২ সালে দুটি কার্যাদেশ দিয়ে সাক্ষীদের আদালতে আসা-যাওয়া ও খাওয়া খরচ দেওয়ার বিধি করেছিল সংস্থাপন মন্ত্রণালয়। কিন্তু বর্তমানে ওই বিধির কার্যকারিতা নেই। ঢাকার আদালতে কর্মরত একাধিক বিচারকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আদালতে সাক্ষীদের আসা-যাওয়ার খরচ দেওয়ার জন্য কোনো বাজেট নেই। কোনো ফান্ডও নেই। সাক্ষীদের এ ধরনের কোনো খরচ দেওয়া হয় না।

ঢাকার জেলা আদালতের অতিরিক্ত পিপি আনোয়ারুল কবীর বাবুল কালের কণ্ঠকে বলেন, সাক্ষীরা আদালতে হাজির হন না। তাঁরা দৈনিক আয় বা কর্মস্থল বাদ দিয়ে আদালতে আসতে চান না। তাঁদের কোনো খরচ দেওয়া হয় না। আবার আদালতে এলেও বিভিন্ন ধরনের ঝামেলা পোহাতে হয়। নিরাপত্তাও নেই। তাই সাক্ষী কেন আদালতে হাজির হবেন? তিনি জানান, আদালতে এ ধরনের কোনো বাজেট বরাদ্দ নেই। তিনিও সাক্ষীর নিরাপত্তা আইন করার পক্ষে যুক্তি দেন।

ঢাকার আদালতের সিনিয়র আইনজীবী ও ফৌজদারি মামলা পরিচালনাকারী সৈয়দ আহমেদ গাজী বলেন, একসময় সাক্ষীদের খরচের জন্য বাজেট ছিল। খুবই অল্প পরিমাণ বরাদ্দ ছিল সাক্ষীদের জন্য। এখন নেই। তিনি বলেন, একদিকে সাক্ষীদের নিরাপত্তা নেই। আদালতে এসে অপহরণ, মারধরের শিকার হতে হয়। অন্যদিকে বিনা স্বার্থে তাঁদের কর্মদিন নষ্ট করে আদালতে আসতে হয়। এ কারণে সাক্ষীদের সাক্ষ্য দেওয়ার উৎসাহ থাকে না। কাজেই মামলায় সাক্ষীর অভাবে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন বিচারপ্রার্থীরা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাদীপক্ষ, আবার কোনো ক্ষেত্রে আসামিপক্ষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।

আইনজীবীরা বলেন, সাক্ষীদের আদালতে না এনেও বিচার সম্পন্ন করা যায়। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাক্ষ্য নেওয়ার বিধান করলে সাক্ষীরা নিজ এলাকায় থেকে সাক্ষ্য দিতে পারেন। তথ্য-প্রযুক্তির যুগে এ ধরনের আইন করা যেতে পারে। ২০১৭ সালে  তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে মামলার বিচারসংক্রান্ত একটি আইনের খসড়া প্রণয়ন করেছিল আইন কমিশন। এতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাক্ষ্য নেওয়ার বিধান করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেটাও বাস্তবায়িত হয়নি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা