kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

মামলার ঘানিতে নিঃস্ব বিপর্যস্ত বিচারপ্রার্থীরা

আশরাফ-উল-আলম   

৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মামলার ঘানিতে নিঃস্ব বিপর্যস্ত বিচারপ্রার্থীরা

‘তুমি কারাগারে আছ। কবে মুক্তি পাবা জানি না। মামলায় পড়ে তোমার টাকা-পয়সাও শেষ। তোমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই’—এ কথা বলে স্বামী তাহেরকে ছেড়ে গেছেন তাঁর স্ত্রী। এর পর থেকে তাঁদের ছেলে-মেয়েদের লালন-পালন করছেন তাহেরের ভাইয়েরা।

ঢাকার একটি আদালতে কথা হয় তাহেরের সঙ্গে। জানান, একটি কম্পানিতে চাকরি করতেন তিনি।

কম্পানির কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে তিনিও বেশ কয়েকটি প্রতারণার মামলার আসামি হন। এই মামলাগুলো যে ধারায় দায়ের করা হয়েছে, সে ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছর। অথচ তার চেয়েও বেশি সময় ধরে তিনি কারাগারে আছেন। কোনো মামলারই বিচার নিষ্পত্তি হয়নি। মামলাগুলোতে কোনো সাক্ষী আসছে না। শুধু তারিখের পর তারিখ পরিবর্তন হচ্ছে।

কালের কণ্ঠকে তাহের বলেন, ‘অপরাধ হয়ে থাকলে বিচার হবে। কিন্তু এ রকম অনির্দিষ্টকাল বিচার চলায় আমার পরিবারে বিপর্যয় নেমে এসেছে। ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট হচ্ছে।’ তিনি জানান, গ্রেপ্তারের পর থেকে এ পর্যন্ত কয়েক লাখ টাকা তাঁর খরচ হয়েছে। বারবার আইনজীবী পরিবর্তন করতে হয়েছে। তিনি এখন নিঃস্ব।

২০০৩ সালে বিয়ের কথা বলে চট্টগ্রামের একটি হোটেলে নিয়ে এক কলেজছাত্রীকে ধর্ষণ করেন নোয়াখালীর মাহমুদ নামের এক যুবক। এই অভিযোগে মামলা করেন কলেজছাত্রী। পাঁচ বছর মামলা চলার পর ২০০৮ সালে চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ওই বছরই আসামি হাইকোর্টে আপিল করলে তাঁকে জামিন দেওয়া হয়। হতাশ হন কলেজছাত্রী। পরিস্থিতির কারণে তিনি এখন আর ঢাকা যেতে পারেন না। ওই আপিলের রায় হয়েছে কি না তা আর জানেন না।

ধর্ষিতা এই নারী বলেন, প্রেমিক তাঁর প্রতি অন্যায় করায় তিনি বিচার চেয়ে আদালতে যান। বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হয়। এ কারণে তাঁর বিয়ে হয়নি। পরিবার থেকে তাঁকে বারবার বলা হয় মামলা না করতে। কিন্তু তিনি শোনেননি। এ কারণে পরিবারের সদস্যরাও তাঁকে ভালো চোখে দেখেন না। কারো সঙ্গে ভালো সম্পর্ক নেই। একা একা সময় কাটাতে হয় তাঁকে। তিনি আরো জানান, মামলার পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে বাবার পেনশনের টাকা পর্যন্ত শেষ হয়ে গেছে। বাবা অসুস্থ। তাই এখন মামলার খবর নেওয়ার মতো পয়সা তাঁর নেই। তিনি এখন নিঃস্ব। ওই নারী বলেন, ‘প্রতিশোধের আগুন জ্বলছিল শরীরে। তাই টাকা পয়সার দিকে তাকাইনি। তবে মামলার বাদী হয়ে এত টাকা খরচ হবে কেন? বিচার পাওয়ার একটা নির্দিষ্ট ফি থাকা উচিত।’

এ রকম লাখ লাখ ঘটনা। ভুক্তভোগী অগণিত। মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে সীমাহীন খরচে হাবুডুবু খাওয়ার পাশাপাশি পারিবারিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে হয় তাদের। অনেক সংসারই ধ্বংস হয়ে যায় মামলায় জড়িয়ে। বিপুল টাকা ব্যয়, একখণ্ড জমি উদ্ধার করতে আরো জমি বিক্রি করা, পারস্পরিক রেষারেষিতে পড়ে সর্বস্ব খোয়ানো, আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে চিরদিনের জন্য বিরোধ লাগে। ঘরের সোনা-গয়না বিক্রি করে মামলা চালানো, শখের জিনিস বিক্রি করেও মামলা চালানোর ঘটনা ঘটে।

পাটকল শ্রমিক জাহালমের ঘটনা সবার জানা আছে। দুদকের ৩৩টি মামলায় সালেক নামের একজনের পরিবর্তে জাহালমকে কারাগারে পাঠানো হয়। এসব মামলা থেকে জাহালমকে মুক্ত করতে পরিবারের সহায় সম্বল সব কিছু বিক্রি করতে হয়েছে। কিন্তু তাঁকে মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে জাহালম মুক্তি পান। তার আগেই নিঃস্ব হয়ে যায় পরিবারটি।

রাজশাহী মহানগরের শিরোইল এলাকার সাইফুল ইসলামকে ফাঁদে ফেলে বিয়ে করেন মনিরা খাতুন নামের এক নারী। সাইফুল ছিলেন ওই নারীর ২৯ নম্বর স্বামী। সাইফুল এটা জানতেন না। কিছুদিন পরই বুঝতে পারেন। তবে বোঝার আগেই নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলায় পড়ে যান। ওই মামলায় জামিন পেতে সাইফুল ইসলামকে বিপুল টাকা ব্যয় করতে হয়।

কুলাউড়া উপজেলার মুদিপুর গ্রামের বাসিন্দা সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী মো. সেলিম ২০১৬ সালের ১৫ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে জানান, তাঁর মামা বকরত আলী ও আজমত আলীর সঙ্গে ৩০ শতক জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল একই গ্রামের এরশাদ আলীর। এ নিয়ে দেওয়ানি আদালতে দীর্ঘদিন থেকে মামলা চলছে। প্রতিপক্ষকে দমাতে এরশাদ আলী মেয়েকে দিয়ে অপহরণ নাটক সাজিয়ে ২০১২ সালে কুলাউড়া থানায় মামলা করেন। এই মামলায় প্রবাসী সেলিম ১৬ মাস কারাগারে ছিলেন। কারাগারে থাকায় তাঁর ভিসা বাতিল হয়ে যায়। তিনি আর বিদেশে যেতে পারেননি। উপার্জনের সব পথ নষ্ট হয়। বিদেশ থেকে আয় করা সব টাকা-পয়সা ব্যয় হয় মামলায়। এখন তিনি মানবেতর জীবনযাপন করছেন স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে।

সাতক্ষীরার পলাশপোল এলাকার কওছার গাজী একজন ব্যবসায়ী। তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা করেন স্থানীয় শহিদুল ইসলামসহ অন্যরা। এসব মামলার ঘানি টানতে তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি তাঁর পরিচালিত কমিউনিটি সেন্টারও বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন বলে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন।

মিরপুরের কামাল উদ্দিন জানান, ৫৫ বছর ধরে মামলার ঘানি টানছেন তাঁর পরিবার ও তিনি। মিরপুরের জমি নিয়ে এই মামলা-মোকদ্দমা বিরোধ তাঁদের নিঃশেষ করে ফেলেছে। এখন অনেক সময় চাল কেনার পয়সাও থাকে না। আর কত দিন এই মামলা চলবে তা নিয়ে তিনিও শঙ্কিত।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন মামলা চলায় খরচের হিসাব থাকে না। অধিক ব্যয়ের মধ্যে থাকে আইনজীবীদের ফি। আইনজীবীদের কোনো নির্ধারিত ফি নেই। কিছু নামকরা আইনজীবীকে কোনো মামলায় শুনানি করতে নেওয়া হলে মোটা অঙ্কের ফি দিতে হয়। মামলায় জেতার জন্য বিচারপ্রার্থীরা তাই করেন। আবার ঘুষও প্রচলিত। ঘুষ দেওয়ার নাম করেও বিচারপ্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়। আদালতের কর্মচারীদেরও দফায় দফায় বকশিশ বা টাকা দিতে হয়। দেশের একটি প্রচলিত কথা, ‘কোর্টের ইটও টাকা খায়।’ আদালতে যারা যায় তারা এ কথার সত্যতাও খুঁজে পায়।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সাইদুর রহমান মানিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেওয়ানি প্রকৃতির এক মামলা তিন প্রজন্মকে লড়তে দেখেছি। আদালতে মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবীদের নির্ধারিত ফি না থাকায় বিচারপ্রার্থীদের বেকায়দায় পড়তে হয়। মামলার প্রকারভেদে খরচ হয়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ হলো দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি করা। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি আইন কার্যকর করে বিচারপ্রার্থীরা যাতে সহজে বিচার পান সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। আইনও সংশোধন করতে হলে তা করতে হবে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা