kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

সোনায় মোড়ানো দিন বাংলাদেশের

শাহজাহান কবির   

৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সোনায় মোড়ানো দিন বাংলাদেশের

বাংলাদেশের তিন সোনাজয়ী। ছবি : মীর ফরিদ

গেমসে এমন সোনালি দিন কমই এসেছে বাংলাদেশের। তায়কোয়ান্দোর সোনা দিয়ে আসর শুরু করা বাংলাদেশ কাল এক দিনেই যে জিতেছে তিন সোনা। দুপুর গড়ানোর আগেই সাতদোবাতোর কারাতে হল মুখরিত ‘বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশ’ ধ্বনিতে। এদিন স্বাগতিক নেপালিরাও যেন কোণঠাসা। বাংলাদেশের কাল তিনটি সোনার সবটিই কারাতেতে। পাকিস্তানকে হারানো আল আমিনকে দিয়ে শুরু, এরপর একে একে সোনার হাসি হেসেছেন মারজান আক্তার ও হুমায়রা আক্তার।

আগের দিন এবারের আসরে বাংলাদেশকে প্রথম পদকটি এনে দিয়েছিলেন হুমায়রা। সেটি ব্রোঞ্জ। তাতে হাসি ফোটেনি কারো মুখেই। কাল বাংলাদেশ যখন সকাল থেকেই হাসছে তখন এই তরুণী নিজের ইভেন্টেও সেই খুশিটা ম্লান হতে দেননি নেপালের আনু গুরংয়ের বিপক্ষে ফাইনালে। আগের দিন কারাতেতেই সাতটি সোনা জেতা নেপালিরা এদিন বাংলাদেশের উত্থান দেখছিল। হুমায়রা আর আনুর লড়াইয়ের সময়ও বাংলাদেশি সমর্থকরা যেমন গনগনে হয়ে উঠছিল তাতে স্বাগতিক সমর্থকরাও কিছুটা স্তম্ভিত। তবে এই উত্তাপের মাঝেও হুমায়রা লড়ছিলেন মাথা খাটিয়ে, নেপালি আনু ছিলেন আক্রমণাত্মক। তাতে পয়েন্ট নেওয়া পাঞ্চগুলো বেশি আসছিল হুমায়রার কাছ থেকেই। ব্যবধানও বাড়িয়ে নিচ্ছিলেন বাংলাদেশি কারাতেকা। ম্যাচের যখন ৩০ সেকেন্ড বাকি তখন ৫-২ পয়েন্টে এগিয়ে হুমায়রা। এই সুযোগ কি তিনি হাতছাড়া করেন! গ্যালারিতে ততক্ষণে সময়ের কাউন্টডাউন শুরু করে দিয়েছিলেন হুমায়রার সতীর্থরা। শেষ পর্যন্ত ব্যবধানটা ধরে রেখেই নেপালকে হারিয়ে বাংলাদেশের সোনা জয়।

জাপানি কোচ তেতসুরো কিতামুরা মারজানের মানসিক শক্তির প্রশংসা করেন আগে থেকেই। একই সঙ্গে নান্দনিক কাতা আর এমন রক্তক্ষয়ী কুমিতে অংশ নেওয়া সহজ নয়। কিন্তু মারজান যেন অন্য ধাতুতে গড়া। ব্যর্থতায় মুষড়ে পড়েন না, বরং নতুন করে জ্বলে ওঠেন। কুমিতে ইভেন্টটাই মারামারির। ফলে কারাতে হলেও উত্তেজনার কমতি নেই। পাকিস্তানের কাওসার সানার বিপক্ষে মারজানের লড়াইটা তো হলো রক্তক্ষয়ী। ৩-০-তে এগিয়ে থাকা অবস্থায় প্রতিপক্ষের এক বেমক্কা পাঞ্চে নাক কেটে যায় মারজানের, রক্ত ঝরতে থাকে। ম্যাট থেকে বেরিয়ে গিয়ে শুশ্রূষা নিতে হয় তাঁকে। তাতেই মাথা গরম করে ফেলেন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া এই তরুণী। ফিরে এসে খুব বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছিলেন, তাতে পয়েন্টও হারান। তবে ম্যাচ হাতছাড়া হতে দেননি মারজান, ৪-৩ ব্যবধানে জেতেন সোনার পদক।

কাল দিনের প্রথম সোনা এনে দেওয়া আল আমিন ঠাণ্ডা মাথার। কোচের ভাষায়, ‘ও কখনো অনুশীলনে ফাঁকি দেয় না। বাড়তি পরিশ্রম করে।’ আগের দিন ব্রোঞ্জের সীমা ছাড়িয়ে ফাইনালে উঠেও যখন দুইবার আটকে গিয়েছিল বাংলাদেশ, কাল আল আমিনেই সেই দেয়াল ভেঙে গিয়ে ধরা দেয় কারাতের প্রথম সোনালি সাফল্য। এই প্রথমটাও পাকিস্তানি প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে। কারাতেতে পাকিস্তান বরাবর শক্ত প্রতিপক্ষ। কিন্তু আল আমিনের দৃঢ়তার সঙ্গে এদিন কিছুতেই পেরে ওঠেননি পাকিস্তানি জাফর। আল আমিন ম্যাচ জেতেন ৭-৩ ব্যবধানে। এর আগে সেমিফইনালে বিদায় করেন তিনি আরেক ফেভারিট নেপালের রাজিব পোদাসানিকে।

আল আমিনের আধিপত্যই পরের ইভেন্টগুলোতে বাংলাদেশিদের বড় শক্তি জুগিয়েছে। পাকিস্তানি সানার সঙ্গে পিছিয়ে থেকেও তাই ম্যাচ জিতে যান মারজান, নেপালের অন্যতম সেরা আনুও থামাতে পারেন না হুমায়রাকে। কারাতের এই তিন সোনা এবং আগের দিন তায়কোয়ান্দোতে দিপু চাকমার অর্জনে গেমসের দ্বিতীয় দিনেই বাংলাদেশের ঝুলিতে এখন চার সোনা। ২০১৬ সালে গুয়াহাটিতে বাংলাদেশ পুরো আসর মিলিয়েই যে সাফল্য পেয়েছিল, নেপালে এবার শুরুর দুই দিনেই তা ছুঁয়ে ফেলেছে লাল-সবুজ কন্টিনজেন্ট। কারাতেতে ভারত না থাকাটা বাংলাদেশের জন্য সুবিধা হয়েছে—এমনটাও মনে করেন না বাংলাদেশ কোচ কিতামুরা। তাঁর মতে, এই ডিসিপ্লিনে মূল প্রতিপক্ষ নেপাল। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশকে তিনি প্রায় পাশাপাশিই রাখেন। আর আগের দিন দিপু তো ভারতীয়দের পেছনে ফেলেই জিতেছেন সোনা। তাই এই অর্জন পুরোটাই রঙিন। কারাতেকাদের এই সাফল্য উপভোগ করতে কাল দলে দলে সাতদোবাতোতে ছুটে এসেছিলেন বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা। সেফ ডি মিশন আসাদুজ্জামান কোহিনুরের মুখজুড়ে তৃপ্তির ছাপ, ‘বলেছিলাম আমরা আগেরবারের চেয়ে ভালো করব। এখন আমরা সে পথেই আছি। কম করে হলেও ডাবল ডিজিট ছুঁতে চাই এবার।’ কারাতে, তায়কোয়ান্দোর ইভেন্ট আছে আরো। সোনার প্রত্যাশী মহিলা ক্রিকেট দল শক্তিশালী শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে শুরু করেছে পোখারায়, সেখানে আর্চারিতেও যে একাধিক সোনা জয়ের সম্ভাবনা এবার। তাতে সফল প্রধানের প্রত্যাশাকে আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা