kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

আ. লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর পূর্ণাঙ্গ কমিটি

আগের কমিটির বেশির ভাগেরই ঠাঁই হবে না

নতুন মুখের বেশির ভাগই সাবেক ছাত্রলীগ নেতা

তৈমুর ফারুক তুষার   

৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আগের কমিটির বেশির ভাগেরই ঠাঁই হবে না

ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন কৃষক লীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে নেওয়া হবে না বিগত কমিটির বেশির ভাগ নেতাকেই। ওই নেতারা নানা অপকর্মে জড়িয়ে সংগঠনকে বিতর্কিত করায় তাঁদের কেন্দ্রীয় রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে যুবলীগ ও কৃষক লীগের বিগত কমিটির অল্প কয়েকজন ছাড়া বেশির ভাগই বাদ পড়বেন। কালের কণ্ঠকে এমনটা জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পর‌্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা।

ওই কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সংগঠনগুলোতে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে নতুন রক্ত সঞ্চালন করতে চান বলেই দ্রুত কেন্দ্রীয় সম্মেলন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যাঁরা এরই মধ্যে নানা অপকর্মে জড়িয়ে সংগঠনকে বিতর্কিত করেছেন, সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছেন, তাঁদের আর কেন্দ্রীয় কমিটিতে রাখা হবে না। অপকর্মে জড়িতদের বাদ দিয়ে তরুণ, মেধাবী ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান দেওয়া হবে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সহযোগী সংগঠনগুলোর ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ সামনে। যে কমিটিগুলো হয়েছে প্রত্যেকটিতেই আগে যারা নেতৃত্বে ছিল তারা বাদ পড়ে গেছে। শুধু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যে বাদ পড়ে গেছে তা নয়, তাদের যে মূল কমিটি ছিল সেগুলোও কিন্তু পরিবর্তন হবে। এখন যখন নতুনভাবে কমিটি করা হবে, নতুন লোকদের স্থান দেওয়ার চিন্তাভাবনাই আমাদের বেশি।’

স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘সহযোগী সংগঠনগুলোর বিগত কমিটির বিতর্কিতদের নতুন কমিটিতে স্থান পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নাই। শিগগিরই স্বেচ্ছাসেবক লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা হবে। কমিটিতে যাদের স্থান দেওয়া হচ্ছে তাদের বিষয়ে খোঁজ খবর নেওয়া ও যাচাই-বাছাইয়ে একটু সময় লাগছে। বিতর্কিত, অনুপ্রবেশকারী ও সুবিধাবাদী, টেন্ডারবাজদের বাদ দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য। সেটা বাস্তবায়নে যেন ভুলত্রুটি না হয় সে জন্য আমরা সতর্কতা অবলম্বন করছি।’ তিনি বলেন, ‘ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের অনেকেরই স্বেচ্ছাসেবক লীগে স্থান পাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক লীগে সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের জন্য, ত্যাগী নেতাদের জন্য দ্বার উন্মুক্ত রাখা আছে, সুযোগ রাখা আছে।’

কৃষক লীগের সভাপতি সমীর চন্দ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিগত কমিটির অনেকে সিভি জমা দিয়েছেন, অনেকে দেননি। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আসতে আগ্রহী যেসব নেতার সিভি জমা পড়েছিল তাঁদের মধ্যে অনেক যোগ্যতাসম্পন্ন নেতা আছেন, যাঁরা নতুনভাবে কৃষক লীগ করতে আগ্রহী। এবারই প্রথম কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন একজন নারী। ফলে এবারের কমিটিতে আমরা গতবারের চেয়ে দ্বিগুণসংখ্যক নারীকে স্থান দিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘সাবেক ছাত্রনেতা, বিশেষ করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বা কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলেন তাঁদের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এবারের কমিটিতে রেখেছি। বিভিন্ন জেলা বা উপজেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এমন প্রবীণ নেতাদের আমরা কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান দিয়ে সম্মানিত করার চেষ্টা করেছি। আর যারা কেন্দ্রীয় কমিটিতে থেকে নানা অপকর্মে যুক্ত হয়েছে, সংগঠনের শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড করেছে, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি করেছে তাদের কমিটিতে রাখা হয়নি।’

যুবলীগের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি প্রসঙ্গে সংগঠনটির চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার সুযোগ হয়েছে একটা পরিবর্তন আনার এবং কিছু করার।...রাজনৈতিকভাবে যাদের মেধা আছে এবং অভিজ্ঞতা আছে তারা হয়তো সিস্টেমের অভাবে, হয়তো সাংগঠনিক পরিচ্ছন্নতার অভাবে পিছিয়ে আছে, তাদরকে মূল্যায়ন করতে হবে।’

শামস পরশ আরো বলেন, ‘যাদের নামে অভিযোগ আছে তাদরকে সরে দাঁড়াতে হবে। অভিযুক্তদের অব্যাহতি দেওয়া হবে। দলীয় ফোরামে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেব কবে নাগাদ দেওয়া যায়। তবে অবশ্যই ত্যাগী ও সংগ্রামী নেতারা একটা জায়গায় থাকবেন। সাবেক ছাত্রনেতারা একটা জায়গা পাবেন।’

স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি নির্মল রঞ্জন গুহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ কমিটি আমরা মোটামুটি রেডি করেছি। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা স্পেন সফর শেষে দেশে ফিরলে তাঁর হাতে খসড়া কমিটি তুলে দেব। তিনি অনুমতি দিলেই কমিটি ঘোষণা হবে।’ কমিটিতে কারা থাকছেন জানতে চাইলে নির্মল রঞ্জন বলেন, ‘বিগত কমিটির মধ্যে যারা ভালো কাজ করেছে, আগে ছাত্রলীগ করেছে, আমরা চেষ্টা করব তাদের সবাইকে রাখার জন্য। এর বাইরে বাদবাকি আমরা সাবেক ছাত্রনেতাদের মধ্য থেকে নেব। যারা আমাদের সঙ্গে থেকে বিভিন্ন সময়ে সাংগঠনিক কাজকর্ম করেছে তারা প্রাধান্য পাবে।’

কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে জানান, কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের লক্ষ্যে আগ্রহী নেতাদের জীবনবৃত্তান্ত গ্রহণের জন্য কৃষক লীগের সাবেক সদস্য ও মেহেরপুর জেলা কৃষক লীগের সভাপতি মাহবুবুর রহমান শান্তিকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি কমিটি করা হয়। সেখানে প্রায় সাড়ে ৬০০ জীবনবৃত্তান্ত জমা হয়। সেখান থেকে কৃষক লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং আট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা যাচাই-বাছাই করে ১১১ সদস্যের কমিটির খসড়া তৈরি করেন। এই খসড়া সপ্তাহখানেক আগে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেন কৃষক লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। দু-এক দিনের মধ্যেই কমিটির অনুলিপি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের হাতে তুলে দেওয়া হবে। আওয়ামী লীগ সভাপতি অনুমোদন দিলেই যেকোনো দিন কমিটি ঘোষণা হবে।

সূত্রগুলো জানায়, কৃষক লীগের খসড়া কমিটিতে বাদ পড়েছেন নানা অপকর্মে যুক্ত প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন নেতা। কমিটিতে জেলা ও উপজেলা থেকে ২০-২৫ জন প্রবীণ নেতাকে রাখা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কৃষি পদক পেয়েছেন এমন চারজন নেতা স্থান পেয়েছেন কমিটিতে। কমিটিতে গতবারের চেয়ে এবারে নারীর সংখ্যা দ্বিগুণ করা হয়েছে।

সূত্রগুলো জানায়, যুবলীগের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটিতে বিগত কমিটির সবচেয়ে বেশি নেতা বাদ পড়তে যাচ্ছেন। সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, কমিটি বাণিজ্যে অভিযুক্ত নেতাদের বাদ দেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের লক্ষ্যে যুবলীগের দপ্তরে আগ্রহী নেতাদের জীবনবৃত্তান্ত জমা নেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত সেখানে প্রায় আড়াই শ জীবনবৃত্তান্ত জমা পড়েছে।

স্বেচ্ছাসেবক লীগের সূত্রগুলো জানায়, এরই মধ্যে একটি খসড়া কমিটি গঠন করেছেন সংগঠনটির নেতারা। এই কমিটি থেকে বাদ পড়েছেন বিগত কমিটির অনেক নেতাই। আবার বিগত কমিটির বেশ কয়েকজন নেতা পদোন্নতিও পেয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এমন একাধিক নেতাকে কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক কয়েকজন নেতাকে স্বেচ্ছাসেবক লীগে নতুন মুখ হিসেবে দেখা যাবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা