kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

বিচার চেয়ে বছর ঘোরে আদালতে

► গত বছরের শেষ নাগাদ ফৌজদারি মামলা ছিল ১৭ লাখ ১১ হাজার ৬১৮
► ৫ বছরের বেশি বিচারাধীন মামলা কয়েক লাখ
►আদালত খালাসও দেয় না, সাজাও দেয় না’

আশরাফ-উল-আলম   

৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বিচার চেয়ে বছর ঘোরে আদালতে

রাজধানীর খিলক্ষেতের আজিজা বেগম তাঁর তিন ছেলে-মেয়েকে নিয়ে ১৫ বছর ধরে ঢাকার একটি আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁর ঘর থেকে কিছু গাঁজা উদ্ধার হয়েছিল। সেই মামলা বর্তমানে ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতে বিচারাধীন। ক্ষোভের গলায় তিনি বলেন, ‘অপরাধ প্রমাণ হলে সাজা হবে। প্রমাণ না হলে খালাস পাব। এত বছর আদালতে হাজিরা দেওয়াই তো শাস্তি। আর কত?’ তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে দাবি করে আজিজা বলেন, ‘আদালতে আসা-যাওয়া, আইনজীবীদের টাকা দেওয়া, আদালতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা যে কত ভোগান্তি, তা বলে শেষ করা যাবে না। আর এই বয়সে (৬০-এর ওপরে বয়স) আদালতে হাজিরা দেওয়া কত যে অসম্মানের, তা আর না-ই বা বললাম।’

হাফিজুর রহমান মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের করা একটি দুর্নীতি মামলার আসামি। ২০০৭ সালে দায়ের করা মামলাটি ঢাকার একটি বিশেষ আদালতে বিচারাধীন বলে তিনি জানান। এ পর্যন্ত মাত্র একজন সাক্ষী আদালতে হাজির হয়েছেন। কিন্তু তিনি এত বছর ধরে হাজিরা দিতে দিতে হাঁপিয়ে উঠেছেন। প্রতি হাজিরায় মিরপুর থেকে পুরান ঢাকায় যাতায়াত, দফায় দফায় বিভিন্ন অজুহাতে টাকা খরচ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটা ন্যায়বিচার হতে পারে না।

সাতক্ষীরার কাজী নিজাম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, সাড়ে চার একর জমি উদ্ধারের জন্য মামলা করেছিলেন তাঁর বাবা। ১৯৭৮ সালে এই মামলা দায়েরের পর রায় পেয়েছেন ২০১৪ সালে। এর আগেই তাঁর বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর চার-পাঁচ বছর তিনি মামলা পরিচালনা করেন। তবে এখনো সব জায়গার দখল বুঝে পাননি। দখল বুঝে পেতে হয়তো তাঁকে আরো মামলা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে আরো কত বছর মামলা লড়তে হবে, তা জানা নেই। তিনি বলেন, ‘এই মামলার ভোগান্তি পোহাতে পোহাতে বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন।

তারপর মারা যান।’

ঢাকার একটি ট্রাইব্যুনালে একটি অস্ত্র মামলায় ১৮ বছর ধরে হাজিরা দিচ্ছেন বৃদ্ধা রাবেয়া। হাইকোর্টে তাঁর মামলা বাতিলসংক্রান্ত শুনানির দিন তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আর কত দিন ঘুরতে হবে?’ তিনি আরো বলেন, ‘আদালত আমাকে খালাসও দেয় না, সাজাও দেয় না।’  

অঙ্কুশ কুমার সাহা ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে অনেকে চেক দিয়ে মালামাল নেয়। ওই চেক ব্যাংকে দাখিল করার পর তা ডিস-অনার হলে দেনাদারদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য চেক প্রতারণার মামলা করেন তিনি। তিনি নিজে বাদী হয়ে ৯০টির বেশি মামলা করেছেন ঢাকার আদালতে। অঙ্কুশ সাহা জানান, এর মধ্যে ১০টির বেশি মামলা ১০ বছরের বেশি বিচারাধীন। ৪০টির বেশি পাঁচ বছরের বেশি বিচারাধীন। বাকি মামলাগুলো কম সময়ে বিচারাধীন। তিনি জানান, এসব মামলায় মাত্র একজন সাক্ষীর সাক্ষ্য নিয়ে বিচার নিষ্পত্তি করা হয়। তার পরও দুই বছরের কম সময়ে কোনো মামলা নিষ্পত্তি হয় না।

‘জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’ (বিচার বিলম্বিত হওয়া বিচার না পাওয়া)—বিশ্বে আইন-আদালতের জগতে বহুল উচ্চারিত এই বাক্য যেন বাংলাদেশকে উদ্দেশ্য করেই বলা। প্রায় ৩৭ লাখ মামলা বর্তমানে দেশে বিচারাধীন। সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী গত বছর শেষে অধস্তন আদালতে বিচারাধীন ফৌজদারি মামলার সংখ্যা ছিল ১৭ লাখ ১১ হাজার ৬১৮। এর মধ্যে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন দুই লাখ ২৯ হাজার ৭৭৪টি। পাঁচ বছরের বেশি বিচারাধীন দেওয়ানি মামলার সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।

কালের কণ্ঠ পুরান ঢাকার নিম্ন আদালতে বিচারপ্রার্থীদের নিয়ে একটি জরিপ করে সম্প্রতি। আদালতে উপস্থিত বিচারপ্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁদের মধ্যে ফৌজদারি মামলায় বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে আদালতে ঘুরছে। আর দেওয়ানির প্রায় ৭০ শতাংশ মামলা পাঁচ বছরের বেশি বিচারাধীন। দেওয়ানি মামলা এক-দুই যুগ ধরে চলছে এমন সংখ্যাই বেশি। ফৌজদারি মামলার অনেক আসামিই আক্ষেপ করে বলেন, খালাস না দিলে সাজা দিয়ে দিক। মিরপুরের সুমন বিশ্বাস, মহাখালী ওয়্যারলেস গেটের মনির, টঙ্গীর দিলীপ সাহা সাত-আট বছর ধরে মামলায় হাজিরা দেন। তাঁরা বলেন, হয়রানির একটা সীমা থাকা উচিত। সাক্ষী আসে না। কিন্তু বিচারকরা মামলা ঝুলিয়ে রাখেন। এর চেয়ে কয়েক বছরের জেল দিয়ে দিক।

মিরপুর মনিপুরের কামাল আহমেদ বলেন, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে একটি মামলার বাদী হিসেবে তাঁর পূর্বপুরুষ ও তিনি ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে লড়ছেন। তিনিও মৃত্যুর আগে মামলার রায় দেখে যেতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহে আছেন।

বিশেষ আইনের কিছু মামলা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু ওই বিধানেরও কোনো কার্যকারিতা নেই। নারী ও শিশু নির‌্যাতনের মামলা ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করার বিধান রয়েছে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির হার ৫ শতাংশেও পৌঁছেনি। এ ধরনের ৩৭ হাজার মামলা বিচারাধীন।

সম্প্রতি হাইকোর্ট ১০ বছর বা এর বেশি সময় ধরে দেশের দায়রা আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলাগুলো ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন। নারী ও শিশু নির‌্যাতন আইনের মামলা ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে বলেছেন আরেক আদেশে। এর আগে সুপ্রিম কোর্ট পাঁচ বছর আগের সব মামলা নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন। এসব নির্দেশেও কোনো কাজ হচ্ছে না।

অথচ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দেশের কোনো কোনো জেলায় জজদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ খুবই ফলপ্রসূ হয়েছিল। ২০০৯ সালের আগস্টে মানিকগঞ্জে জেলা জজ হিসেবে যোগদান করেন মোহাম্মদ নুরুল হুদা। তিনি মাত্র দুই বছরের মধ্যে ওই জেলায় ২০০০ সালের আগের সব মামলা দক্ষতার সঙ্গে নিষ্পত্তি করে আলোচনায় আসেন। জেলার সব বিচারক ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরসহ স্থানীয় আইনজীবী সমিতির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে তিনি পুরনো মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেন। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে ১৯টি প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে একটি কর্মপন্থা তৈরি করেন। এরপর শুরু হয় মামলার নিষ্পত্তি।

মানিকগঞ্জ আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালে পুরনো মামলা নিষ্পত্তির হার যেখানে শূন্যে ছিল, সেখানে ২০১০ সালের শেষে পুরনো মামলা নিষ্পত্তির হার ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। আবার ২০১১ সালে ৫২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ২০১১ সালে এসে দেখা যায় পাঁচ বছর আগের দায়ের করা মামলার ৯০ শতাংশই নিষ্পত্তি হয়েছে। জেলা জজ মোহাম্মদ নুরুল হুদা পরে ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালন করেছেন। ওই দুই জেলায়ও মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে তিনি কার্যকর ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি এখন অবসরে আছেন।

আইনবিষয়ক জার্নাল ঢাকা ল রিপোর্টসের (ডিএলআর) সম্পাদক অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, বিলম্বিত বিচার মানেই বিচারপ্রার্থীকে ন্যায়বিচার থেকে বিঞ্চত করা। মামলা কিভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট বিচারকদের দক্ষতার ওপর। জেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারককে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। এক-দুজন বিচারক যদি পারেন, তবে অন্য বিচারকরা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে পারেন না কেন? তিনি বলেন, বিচারক, প্রশাসন, পুলিশ ও আইনজীবী সমিতিকে আন্তরিক হতে হবে।

ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, বিচার বিলম্বিত হলে বিচারপ্রার্থীরা হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হতে হতে একসময় আদালতমুখী হন না। ফলে ন্যায়বিচার ব্যাহত হয়। তিনি বলেন, ‘ব্রিটিশ আমলের আইন নিয়ে আমাদের মামলা পরিচালনা করতে হচ্ছে। আইন যুগোপযোগী করার পাশাপাশি মামলা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নুর-উল মতিন জ্যোতি বলেন, ব্রিটেনসহ অনেক দেশেই এখন বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি আইন (এডিআর) করা হয়েছে। বাংলাদেশেও দেওয়ানি, পারিবারিক ও অর্থঋণ আইনে এডিআর ব্যবস্থা চালু রয়েছে। আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতা বা মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হলে মামলাজট কমানো সম্ভব। এতে বিচারপ্রার্থীদের হয়রানিও কমে যাবে। কিন্তু এই ব্যবস্থা তেমন কার্যকর নয়। বিচারপ্রার্থীদের এডিআর ব্যবস্থার সুফল বোঝাতে না পারায় তাঁরা উৎসাহিত হন না। আবার আইনজীবী, বিচারকসহ অনেকেরই এডিআর সম্পর্কে ধারণা নেই। এডিআরের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হলে অর্ধেক মামলাই হ্রাস পাবে। উন্নত বিশ্বে এখন এডিআর ব্যবস্থা অত্যন্ত ফলপ্রসূ। তিনি বলেন, ফৌজদারি আইনেও এডিআর সংযুক্ত করা উচিত। তাহলে ছোটখাটো অপরাধের বিচার স্বল্পতম সময়ে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা