kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

সন্ধ্যা নামার আগেই আঁধারে ডুবল বাংলাদেশের ব্যাটিং

সামীউর রহমান, কলকাতা থেকে   

২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সন্ধ্যা নামার আগেই আঁধারে ডুবল বাংলাদেশের ব্যাটিং

দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামবে, গ্যালারির গোলাপি টুনি বাল্বগুলোর সঙ্গে জ্বলে উঠবে পেলাই ফ্লাডলাইটগুলো। গঙ্গার ওপর থেকে উড়ে আসা জলদ হাওয়ায় ভারী শিশির ভেজাবে ইডেন গার্ডেনসের সবুজ ঘাস। আর তাতেই বোলারদের হাত থেকে ছুটে আসা গোলাপি রঙের বলটা হয়ে যাবে ‘আন আইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট’! ভারতের মাটিতে প্রথম দিন-রাতের টেস্টের আগে তো পূর্বাভাস ছিল এমনটাই। অথচ ইডেনের ফ্লাডলাইট জ্বলে ওঠার আগেই যে নিভে গেল বাংলাদেশের ব্যাটিং! প্রথম বিরতির আগেই শেষ সিংহভাগ, বাকিটাও গেছে নতুন করে খেলা শুরুর পর। ১৭৫ মিনিট স্থায়ী প্রথম ইনিংসে মাত্র ১০৬ রানে অলআউট হয়েছে বাংলাদেশ, যে রানটা টপকে যেতে ভারতের লেগেছে মাত্র ২৮ ওভার! এরপর বড় লিড নেওয়ার পথেই আছে স্বাগতিকরা। প্রথম দিনের খেলা শেষে ভারতের সংগ্রহ ৩ উইকেটে ১৭৪।

কাগজে-কলমে হয়তো নেই, তবে অন্তরালে ক্রিকেটের তিন মোড়ল আজও সক্রিয়। অস্ট্রেলিয়া তো টেস্ট খেলতে ডাকেই না বাংলাদেশকে, সেই আদ্যিকালে একবার ডাকলেও মেলবোর্ন, ব্রিসবেনের মতো মর্যাদার ভেন্যুগুলোর তালা খোলেনি। ২০১০ সালে সবশেষ ইংল্যান্ড সফরে গিয়েছিল বাংলাদেশ, এরপর আইসিসি প্রতিযোগিতায় ক্রিকেটের জন্মভূমি ভ্রমণ হলেও টেস্ট খেলার আশা থেকে গেছে হতাশা হয়েই। এমনকি বছর দুই আগে দক্ষিণ আফ্রিকাও বাংলাদেশকে আতিথ্য দেওয়ার সময় ডারবান, কেপটাউনের মতো ভেন্যুগুলোতে খেলেনি বাংলাদেশের সঙ্গে।

পাঠিয়েছে পচেফস্ট্রুম, ব্লুমফন্টেইনের মতো জায়গায়। সেখানে ইডেন টেস্টকে ঘিরে বিসিসিআই বা সিএবির আয়োজনের কমতি ছিল না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসেছেন আমন্ত্রিত হয়ে। সৌরভ গাঙ্গুলি টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে প্রথম ম্যাচে যাঁদের বিপক্ষে খেলেছেন, যাঁদের নিয়ে খেলেছেন তাঁরা সবাই আমন্ত্রণ পেয়েছেন ইডেনে। শহরে আলোকসজ্জার কমতি নেই। অথচ বাংলাদেশের ব্যাটিং নিকষ কালো আঁধারে ঢাকা। ৬৮ হাজার ধারণক্ষমতার ইডেনে উপস্থিতি ৫০ হাজার ছাড়িয়ে, তাদের সামনে মমিনুল হকের দল যে ব্যাটিংটা করলেন সেটা মেনে নেওয়া কঠিন।

টস জিতলেন মমিনুল, দ্বিতীয়বারের মতো। নিলেন ব্যাটিং। অথচ দলে তিনজন পেসার, তাইজুল ইসলামকে বসিয়ে নেওয়া হয়েছে আল আমিন হোসেনকে। মেহেদী হাসান মিরাজকে বসিয়ে আরেক অফস্পিনার নাঈম হাসানকে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল ইডেনে। অবশ্য পরে দুজনেই খেলেছেন, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই! মাথায় বল লেগে মাঠ ছেড়েছেন লিটন দাস ও নাঈম হাসান, তাঁদের জায়গায় ক্রিকেটের নতুন চালু হওয়া নিয়ম ‘কনকাশন সাবস্টিটিউট’ হিসেবে ঢুকেছেন মিরাজ ও তাইজুল। লিটনের বদলি মিরাজ শুধু ব্যাটিং করবেন, বোলিং করার উপায় নেই নিয়মের বেড়াজালে। নাঈমের বদলে নামা তাইজুল অবশ্য বোলিংটাই করবেন। গোলাপি বলে আবু জায়েদ, আল আমিন আর এবাদত হোসেনের ত্রিফলার সামনে ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপকে পরীক্ষায় ফেলার একটা সুযোগ নিতে পারতেন মমিনুল, কিন্তু তিনি নিলেন ব্যাটিং। এর পরের গল্পটা ইন্দোরের প্রথম ইনিংসের চেয়েও হতাশার।

ইমরুল কায়েস ইদানীং ছয় আর চার ছাড়া কিছুই করছেন না! কথাটা আশাব্যঞ্জক শোনালেও আসলে হতাশার। ইন্দোরে দুই ইনিংসেই আউট হয়েছিলেন ৬ রান করে, কাল ইডেনে প্রথম ইনিংসে আউট হয়েছেন ৪ রানে। আউট হওয়ার সময় নষ্ট করে গেছেন একটি রিভিউও। বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের জন্য ইশান্ত শর্মার ইনসুইং ডেলিভারিটা গিয়ে লাগে ইমরুলের প্যাডে, মাঠের আম্পায়ার আউট দেওয়ার পর রিভিউ নিয়েও টিভি আম্পায়ারের কৃপাদৃষ্টি পাননি এই বাঁহাতি উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। এর আগে অবশ্য একই বোলারের বলে মাঠের আম্পায়ার আউট দিলেও রিভিউয়ে বেঁচে যান ইমরুল, স্নিকোমিটার খুঁজে পায়নি ব্যাটে বল লাগার আওয়াজ। তবে দ্বিতীয়বার আর বাঁচেননি ইমরুল, দুটো রিভিউয়ের মাঝে নিজের রানটাও বাড়াতে পারেননি। মমিনুল এসে একটা ওভার খেললেন, কোনো রান নেননি। এরপর নতুন ওভারের প্রথম বলেই রোহিত শর্মার দারুণ ক্যাচের শিকার হয়ে ফেরত আসেন মমিনুল। ১ বল পর আউট মোহাম্মদ মিঠুনও। জোড়া উইকেট পতনের যে ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছিল নাগপুরে, সেটার ব্যত্যয় হলো না কলকাতা এসেও। উমেশ যাদবের এক ওভারে জোড়া উইকেটপতন কার্যত মেরুদণ্ডটা ভেঙে দিল বাংলাদেশের।

তার পরও আশা মরেনি। কারণ শুরুর এমন বিপর্যয় তো কতই দেখেছে বাংলাদেশ। এ রকম জায়গা থেকেই তো মুশফিকুর রহিম-মাহমুদ উল্লাহর হাত ধরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দল। কিন্তু কাল হতাশ করেছেন দুজনেই। একজন ৬৯তম টেস্ট খেলতে নেমেছেন, অন্যজন ৪৮তম। বছর দশেকের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা আর অনুশীলন ও অধ্যবসায়ের যোগফল ৬! গোলাপি রঙের হাতলের ব্যাট ব্যবহার করা মুশফিক গোলাপি বলের ক্রিকেটে রানের খাতা খোলার আগেই মোহাম্মদ সামির বলে ইনসাইড এজ হয়ে বোল্ড। নাগপুরে, মিডিয়াম পেসার শুভমান গিলের বলেও অনেকটা একইভাবে আউট হয়েছিলেন মুশফিক। অধ্যবসায় নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, তবে কৌশলে যদি কোনো খুঁত থাকে সেটা ধরিয়ে দেওয়ার কোনো লোকও কিন্তু এখন বাংলাদেশ দলে নেই। ব্যাটিং পরামর্শক নেইল ম্যাকেঞ্জি যে চলে গেছেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। ভালো খেলতে থাকা সাদমানও এই হতাশায় বোধ হয় ক্যাচ দিলেন উইকেটের পেছনে। তাঁর বিদায়ে এলেন লিটন দাস, বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের আঁধারে একমাত্র আশার ঝলক। প্রথম বলেই চার, যেটা প্রশংসা কুড়িয়েছে ভিভিএস লক্ষ্মণেরও। কিন্তু সেই আলোও তো নিভে গেল দমকা হাওয়ায়।

২১তম ওভারের তৃতীয় বলে হেলমেটে বল লাগে লিটনের। বোলার ছিলেন মোহাম্মদ সামি। এরপর ২২তম ওভারের চতুর্থ বলে আবার মাথায় বল লাগে লিটনের, বোলার ছিলেন ইশান্ত। সেবা শুশ্রূষার জন্য একটু আগেই খেলোয়াড়দের ডেকে নেওয়া হয় ‘সাপার’ ব্রেকের জন্য। বিরতির পর আর ফেরা হয়নি ২৭ বলে ২৪ রান করা লিটনের। তখনই তাঁকে দেখিয়ে দেওয়া হয় রিটায়ার্ড হার্ট, টেলিভিশনে মাঝবিরতির অনুষ্ঠানে সুনীল গাভাস্কার লিটনের ব্যাটিংয়ের দারুণ প্রশংসা করলেও তাঁকে আর দেখা যায়নি মাঠে। ৭৩ রানে ৬ উইকেটে বিরতিতে যাওয়ার পর ফিরে এসে খুব বেশিক্ষণ স্বাগতিক দর্শকদের অপেক্ষায় রাখেননি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। ৩০.৩ ওভারেই ১০৬ রানে অলআউট বাংলাদেশ। প্রথমবারের মতো প্রতিপক্ষের ১০ উইকেটের সব কটিই তুলে নিলেন ভারতের পেসাররা। ২২ রানে ৫ উইকেট দেশে ইশান্তের সেরা বোলিং, ৩ উইকেট উমেশ যাদবের আর জোড়া শিকার সামির।

ইন্দোরের ডাবল সেঞ্চুরিয়ান মায়াঙ্ক আগরওয়ালকে আলআমিন ফিরিয়ে দেন মাত্র ১৪ রানেই। এবাদত দারুণ ডেলিভারিতে রোহিত শর্মাকেও ২১ রানে এলবিডাব্লিউ করার পর ভারতের স্কোর ২ উইকেটে ৪৩ রান। এখান থেকে অনেক কিছুর স্বপ্নই উঁকি দিতে পারত, কিন্তু দৃঢ় হাতে বিপর্যয় সামাল দিলেন বিরাট কোহলি ও চেতেশ্বর পূজারা। তৃতীয় উইকেটে তাঁদের ৯৪ রানের জুটিতেই লিড পেয়ে যায় ভারত। গোলাপি বলের টেস্টে ভারতের প্রথম হাফসেঞ্চুরি করার পর ৫৫ রানে এবাদতের বলে সাদমানের হাতে ক্যাচ দিয়েছেন পূজারা। কোহলিও তুলে নিয়েছেন হাফসেঞ্চুরি।

রথী মহারথীদের আগমন উপলক্ষে স্বর্গপুরীর মতোই সাজানো হয়েছিল ইডেন গার্ডেনসকে। লাল নীল আলোর মালা, ফুলের তোড়া, চাঁদোয়া; সব মিলিয়ে কেমন যেন স্বপ্নদৃশ্যের মতো। অথচ এখানেই দুঃস্বপ্নের ব্যাটিং করে গেলেন মুশফিক মমিনুলরা। আনন্দ আয়োজনের এই মঞ্চে, সব বিষাদ কেবল বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমেই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা