kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

নতুন সড়ক পরিবহন আইন

ব্যবস্থাপনার ঘাটতিকে পুঁজি করে ফায়দা লুটতে চান পরিবহন নেতারা

পার্থ সারথি দাস   

২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ব্যবস্থাপনার ঘাটতিকে পুঁজি করে ফায়দা লুটতে চান পরিবহন নেতারা

নতুন সড়ক পরিবহন আইনের ৯০ ধারায় মোটরযান পার্কিং, যাত্রী বা পণ্য উঠানামার নির্ধারিত স্থান ব্যবহার না করলে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আগের মোটরযান অধ্যাদেশে এ অপরাধে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা জরিমানা ছিল। ঢাকা মহানগরীতে মোটরযান পার্কিং, যাত্রী বা পণ্য উঠানামার যথেষ্ট নির্ধারিত স্থান নেই। পার্কিং নীতিমালা না করে, নতুন টার্মিনাল তৈরি না করে জরিমানা বাড়ানো হয়েছে ১০ গুণ।

ব্যবস্থায় ঘাটতি রেখে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে শুরুতেই বাধার মুখে পড়ে সরকার। আর শ্রমিকদের ব্যবহার করে মুনাফালোভী ও দুর্নীতিবাজ পরিবহন নেতারা এসব ঘাটতি ও দুর্বলতাকে পুঁজি করে আইনটি শুধু শিথিল নয়, দীর্ঘদিন যাতে বাস্তবায়নও করা না হয় তার পাঁয়তারা করছেন। গত বুধবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে পরিবহন নেতাদের বৈঠকের পর আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত লাইসেন্সসংক্রান্ত ৬৬ ধারাসহ বিভিন্ন ধারায় মামলা করা হবে না বলে সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া আইনের জামিন অযোগ্য তিনটি ধারা সংশোধন করে এগুলো জামিনযোগ্য করাসহ ৯টি ধারা সংশোধনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, পরিবহন খাতের শীর্ষ নেতারা সরকারের ছাড় দেওয়া এই ছয় মাসের মধ্যে আইনের আরো দুর্বলতা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতিগুলো খুঁজে বের করে ফের আন্দোলন করার পরিকল্পনা করছেন। এসব নেতা সরকারের শুদ্ধি অভিযানের কারণে বর্তমানে প্রকাশ্যে আসতে চাইছেন না।

নতুন আইনের একাদশ অধ্যায়ে অপরাধ বিচার ও দণ্ড বিষয়ে ৬৬ ধারায় ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরযান ও গণপরিবহন চালালে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আবেদন করার পরও ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানকারী সংস্থা বিআরটিএ সারা দেশে প্রায় চার লাখ চালকের লাইসেন্স সরবরাহ করতে পারছে না। এ ছাড়া ৮০ শতাংশ ভারী গাড়ি চালানো হচ্ছে হালকা গাড়ির লাইসেন্সে। অথচ ভারী গাড়ি চালাতে হলে ভারী গাড়ির লাইসেন্সই লাগবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ, বিআরটিএ এবং পরিবহন নেতাদের অনেকে ঘুষ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন।

পরিবহন নেতা মঞ্জুরুল আহসান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লাইসেন্স নিতে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছে। ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রেখে এই দুর্নীতি হচ্ছে। বিআরটিএতে জনবল ঘাটতি রেখে অব্যবস্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। আবেদনকারীরা বারবার গিয়েও সেবা পাচ্ছেন না।’

তবে বিআরটিএর চেয়ারম্যান ড. কামরুল আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা চিহ্নিত করে ঘাটতি পূরণ করা হবে।’ 

আইনের ৭৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ফিটনেস সনদ ছাড়া গাড়ি চালানো বা আয়ু ফুরানো গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে। বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, ফিটনেস পরীক্ষার জন্য মিরপুর কার্যালয়ে আধুনিক ব্যবস্থা থাকলেও সংস্থার বেশির ভাগ কার্যালয়ে গাড়ি পরিদর্শনের আধুনিক ব্যবস্থা নেই। বর্তমানে প্রায় তিন লাখ গাড়ির ফিটনেস সনদ নেই। ঢাকায় ২০ বছরের বেশি পুরনো গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ করা হলেও সেগুলো পুলিশ, বিআরটিএ কর্মকর্তা এবং পরিবহন নেতাদের ঘুষ বা চাঁদা দিয়ে চালানো হচ্ছে। ১০ বছর ধরে বারবার ঘোষণার পরও এসব গাড়ি উচ্ছেদ করা হয়নি। এই অব্যবস্থাপনা টিকিয়ে রেখে আইন বাস্তবায়ন করতে গেলে জরিমানা আদায় করতেই হবে। এ অবস্থায় পরিবহন মালিকরা ঘাটতির দোহাই দিয়ে আইন বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা চাইছেন। 

নতুন আইনের ৭১ নম্বর ধারায় ‘কন্ডাক্টর লাইসেন্স’ ছাড়া গণপরিবহনে কন্ডাক্টর নিয়োগ দিলে সর্বোচ্চ এক মাসের জেল বা সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, ‘এ পদে নিয়োগ দেওয়ার ফরমও এখনো তৈরি করেনি বিআরটিএ। এ অবস্থায় নতুন আইন প্রয়োগ হলে জরিমানা করা যৌক্তিক হবে না।’ 

নতুন আইনের একাদশ অধ্যায়ে অপরাধ বিচার ও দণ্ড বিষয়ে ৪১টি ধারা আছে। এর মধ্যে ৬৬ ও ৯০ নম্বর ধারা ছাড়াও আরো সাতটি ধারার সংশোধনী চান পরিবহন শ্রমিক নেতারা। ৮৪, ৯৮ ও ১০৫ ধারায় অপরাধের মামলা জামিন অযোগ্য। ৯৮ ধারায় সড়ক দুর্ঘটনার সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড বা তিন লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় শাস্তির বিধান, ১০৫ ধারায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আবার কেউ সড়কে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গাড়ি চালিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটালে তার প্রাণদণ্ডের বিধানও এ আইনে রয়েছে। এসব ধারা সংশোধন করে অপরাধ জামিনযোগ্য করার দাবি পরিবহন নেতাদের। বিভিন্ন অপরাধে যে জরিমানা তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা কমানোর দাবিও তাঁদের। ৭৬ ধারায় ট্যাক্স-টোকেন হালনাগাদ না থাকলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা, ৭৭ ধারায় রুট পারমিট ছাড়া যানবাহন চালালে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জরিমানা, ৮৬ ধারায় অতিরিক্ত মাল বহনে বিধি না মানলে সর্বোচ্চ শাস্তি এক বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

গত বুধবার রাতে সমঝোতা বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে, আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত লাইসেন্সসংক্রান্ত ৬৬ ধারায় মামলা করা হবে না। ৮৪ ধারার অপরাধেও নতুন আইনে শাস্তি হবে না।

বাস চলাচল স্বাভাবিক হচ্ছে : দেশের সব রুটে যাত্রীবাহী বাস ও মিনিবাস চলাচল গতকাল শুক্রবার থেকে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। ছুটির দিনে রাজধানীর সায়েদাবাদ, গাবতলী, মহাখালী ও ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার বাস ছেড়ে গেছে।

গতকাল গাবতলীতে জাতীয় সড়ক পরিবহন মোটর শ্রমিক ফেডারেশন কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি মোস্তাকুর রহমান গাড়িচালকদের প্রতি কর্মবিরতি প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের বর্ধিত সভাও গতকাল শেষ হয়েছে। ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খান এমপির সভাপতিত্বে দেশের বিভিন্ন জেলার পরিবহন শ্রমিক নেতারা এ সভায় অংশ নেন। সভায় জামিন অযোগ্য ধারা বাতিল, জরিমানা ও শাস্তির পরিমাণ কমানোসহ ৯টি ধারা নিয়ে পরিবহন শ্রমিক নেতারা দাবি জানান।

আজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফেডারেশন নেতাদের বৈঠক : এই ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খান এমপি গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আগামীকাল (শনিবার) রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বাসায় বৈঠকে বসব। আমরা সুনির্দিষ্ট দাবিনামা তৈরি করছি।’ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক-শ্রমিক নেতাদের দাবিগুলোর সঙ্গে আপনাদের দাবির মিল কতটা আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সুনির্দিষ্ট দাবি করব। আইনের অনেক কিছু পরিবর্তন করতে হবে। বৈঠকের পর সব দাবি গণমাধ্যমকে জানাব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা