kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

বিএনপিতে পদত্যাগ

নেপথ্যের কারণ আর নতুন কৌশলের খোঁজ

শফিক সাফি   

২২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নেপথ্যের কারণ আর নতুন কৌশলের খোঁজ

বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা পদত্যাগ করায় বিব্রত দলটির হাইকমান্ড। বিশেষ করে সিনিয়র নেতা দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান ও ভাইস চেয়ারম্যান এম মোর্শেদ খানের পদত্যাগের ঘটনায় ‘সতর্ক’ অবস্থানে দলের হাইকমান্ড। আর যেন কোনো নেতা দল থেকে পদত্যাগ না করেন সে জন্য সজাগ দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। নেতারা কেন দল ত্যাগ করছেন, এর পেছনের কারণ নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণও করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এসব পদত্যাগের অন্যতম কারণ ‘সরকারের চাপ’। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যেসব নেতা পদত্যাগ করেছেন, তাঁদের বিষয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছে না হাইকমান্ড। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এ মুহূর্তে কারো পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করা। সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা। বরং কৌশলে পদত্যাগ করা নেতাদের বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হবে।

জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকার তো প্রথম থেকেই বিএনপিকে নির্মূলের চেষ্টা করছে। সে জন্য তারা বহু মামলা দিয়েছে। নির্বাচন করার পরও যখন দেখছে; বিএনপিকে নির্মূল করা যাচ্ছে না, তখন তারা নানা প্রচারণা চালাচ্ছে। কিন্তু বিএনপি এখন আগের চেয়ে অনেক সতর্ক। দলের নেতারা সরকারের নীলনকশা বুঝতে পারছেন।

স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘বিএনপি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্ল্যাটফর্ম, একটি বটগাছ। ক্লান্ত শরীর নিয়ে মানুষ এখানে আসবে, বিশ্রাম নেবে, পিপাসা মেটানোর পর আবার চলে যাবে। এটাই স্বাভাবিক। নেতাকর্মীদের ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে খালেদা জিয়া যে সরকার গঠন করেছিলেন তখন অনেক নামিদামি নেতা আমাদের দলে এসেছিলেন। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হয় তাঁদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। সে কারণে তাঁরা প্রস্থান করতে চান।’

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী বলেন, ‘ ১/১১-এর আগে থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এখন আবার নতুন ষড়যন্ত্রের আভাস পাচ্ছি। কিন্তু বিএনপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে কোনো কাজ হবে না। সরকারের নানামুখী চাপের কারণে কেউ কেউ পদত্যাগপত্র দিচ্ছেন। আমরা এসব পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত দিচ্ছি না।’

২০১৬ সালের ১৯ মার্চ কাউন্সিলের সাড়ে চার মাস পর স্থায়ী কমিটির ১৯ জন সদস্য, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ৭৩ জন, ভাইস চেয়ারম্যান ৩৫ জন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব একজন, যুগ্ম মহাসচিব সাতজনসহ ৫০২ সদস্যবিশিষ্ট নির্বাহী কমিটি ঘোষণা করে বিএনপি। ওই কমিটি ঘোষণার পর পদত্যাগ করেন উপদেষ্টা মোসাদ্দেক আলী ফালু এবং সহপ্রচার সম্পাদক শামীমুর রহমান শামীম। এরপর একে একে পদত্যাগ করেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আলী আসগর লবি, ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মুবিন চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য এম এ হাসেম, নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ শোকরানা, সহসাংগঠনিক সম্পাদক শামসুজ্জামান জামান, নির্বাহী কমিটির সদস্য শাহ আলম, মাগুরা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সালিমুল হক কামাল, সহ-অর্থবিষয়ক সম্পাদক মো. শাহাব উদ্দিন, নির্বাহী কমিটির সদস্য কণ্ঠশিল্পী মনির খান, ইসমাইল হোসেন বেঙ্গলসহ আরো কয়েকজন।

এর মধ্যে ইনাম আহমেদ চৌধুরী ও ইসমাইল হোসেন বেঙ্গলের পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছে। কারণ ইনাম আহমেদ আওয়ামী লীগে এবং বেঙ্গল এলডিপিতে যোগ দিয়েছেন।

সূত্র বলছে, দল থেকে এই নেতাদের পদত্যাগের বিষয়টি দলের স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, দল থেকে পদত্যাগ করা নেতাদের পদত্যাগপত্র আপাতত গ্রহণ করা হবে না। কিভাবে এই নেতাদের দলের সঙ্গে রাখা যায় তার কৌশল খোঁজা হচ্ছে।

বিষয় সম্পর্কে দলের স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জানান, শামীমুর রহমান শামীম পদত্যাগ করলেও আবার দলে ফিরে আগের মতো কাজ করছেন। লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে তাঁকে স্থায়ী কমিটিতেই রাখা হয়েছে। সর্বশেষ তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর বিএনপির পক্ষ থেকে পাঠানো শোক বার্তায় মাহবুবকে স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিএনপির অনেক নেতা বলছেন, কারো কারো মনে ক্ষোভ থাকতে পারে। কিন্তু সে জন্য পদত্যাগ, এটি গ্রহণযোগ্য নয়। আবার মোর্শেদ খান তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের বলেছেন, নির্বাচনী এলাকায় কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে তাঁর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এটি তাঁর পদত্যাগের একটি কারণ। কিন্তু মূল কারণ হচ্ছে তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য। বলা হচ্ছে, দলের সিনিয়র নেতা আব্দুল্লাহ আল নোমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনসহ আরো কয়েকজন নেতা পদত্যাগ করতে পারেন। খোঁজ নিয়ে দেখুন, তাঁরা নিষ্ক্রিয় থাকলেও দায়িত্ব দেওয়া হলে সঠিকভাবে তা পালন করছেন। এর মানে তাঁরা পদত্যাগে ইচ্ছুক নন। পদত্যাগ করা, নিষ্ক্রিয় এবং অবসরপ্রাপ্তদের ঝুলিয়ে রাখার কৌশলের আরেক বড় কারণ দলে তাঁদের অতীতের অবদান এবং ভবিষ্যতে যদি আবার সক্রিয় হন, সে সুযোগ রাখা।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘মোরশেদ খান একজন বড় ব্যবসায়ী। তিনি দেশের প্রথম মোবাইল ফোন কম্পানি সিটি সেলের মালিক। সেটা এখন বন্ধ। তাঁর আরো অনেক ব্যবসা আছে। রাজনীতির কারণে তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এসব বিবেচনায় যাঁরা বিএনপি থেকে পদত্যাগ করছেন, বা দূরে থাকছেন, মুক্ত পরিবেশ পেলে তাঁরা সবাই আবার সক্রিয় হবেন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা