kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

‘সরকারের ছাড়ে’ চ্যালেঞ্জের মুখে সড়ক-শৃঙ্খলা

কর্মবিরতি প্রত্যাহার ঘোষণার পরও খুলনাসহ বিভিন্ন জেলায় বাস বন্ধ ছিল

পার্থ সারথি দাস   

২২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘সরকারের ছাড়ে’ চ্যালেঞ্জের মুখে সড়ক-শৃঙ্খলা

শেষ পর্যন্ত গুরুদণ্ডের সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ কার্যকরে কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসেছে সরকার। গত বুধবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পরিবহন নেতাদের বৈঠকে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে ছাড় দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, কঠোর অবস্থান থেকে সরকার সরে আসায় সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর বিষয়টি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে এটা ছাড় নয়, সমঝোতা।

রাজধানীর ধানমণ্ডিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় পরিবহন নেতাদের সাড়ে চার ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত সড়ক আইনের কঠোর প্রয়োগ করা হবে না। সেই সঙ্গে এই সময়ের মধ্যে চালকদের লাইসেন্স উপযুক্ত শ্রেণি অনুসারে সংশোধন করার সময় দেওয়া হয়েছে। ফিটনেসসহ বিভিন্ন খাতে গাড়ি মালিকদের বকেয়া মওকুফ করা হবে। সড়ক দুর্ঘটনার মামলা জামিনযোগ্য করাসহ ৯টি ধারা সংশোধনের ব্যাপারে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দাবি এসংক্রান্ত টাস্কফোর্সে পাঠানো হবে। যুক্তিযুক্ত মনে করলে সরকার আইনের এসব ধারা সংশোধনের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারে।

এসব সিদ্ধান্তের পর বুধবার রাতেই পরিবহন নেতারা কর্মবিরতি ও কথিত ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। এরপর পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক হলেও যাত্রীবাহী বাস চলাচল সব জেলায় স্বাভাবিক হয়নি।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ঢাকার সড়ক ও বিভিন্ন মহাসড়কে বাস ছিল খুব কম। কয়েকটি জেলায় বাস চলাচলই করেনি। এ কারণে যাত্রীরা পুরোপুরি জিম্মিদশা থেকে রেহাই পায়নি।

আইন পাসের ১৪ মাস পর মূলত গত সোমবার থেকে নতুন সড়ক পরিবহন আইনে মামলা ও জরিমানা আদায় শুরু হয় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। এই আইনের বিরোধিতা করে আসছিলেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতারা। তার পরও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আইনটি জাতীয় সংসদে পাস হয় গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর।

আইন কার্যকরের আগে থেকেই পরিবহন শ্রমিক নেতাদের ইন্ধনে দেশের বিভিন্ন জেলায় বাস বন্ধ রাখা শুরু হয়। গত বুধবার ৩০টি জেলায় শ্রমিকরা অঘোষিত ধর্মঘট শুরু করে। আগের দিন মঙ্গলবার ঘোষণা দেওয়া ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ধর্মঘট বুধবার শুরু হলে সেদিন দেশজুড়ে পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় হঠাৎ বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান তাঁর ধানমণ্ডির বাসায় পরিবহন নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

বৈঠকে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান ড. কামরুল আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, সড়ক পরিবহন আইনের ১২৬টি ধারার মধ্যে ৯টি ধারা নিয়ে পরিবহন নেতাদের আপত্তি আছে। তাঁরা এগুলো সংশোধন করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা ক্ষণে ক্ষণে উত্তেজিত হয়ে চাপ সৃষ্টি করে বলছিলেন, এসব ধারা স্থগিত করতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ধৈর্যসহকারে তাঁদের বক্তব্য শুনেছেন। সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করে তাঁদের জানানো হয়েছে যে সংসদে পাস হওয়া আইন স্থগিত করার ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নেই। আগামী ২৪ নভেম্বর এসংক্রান্ত টাস্কফোর্সের বৈঠক হবে। সেখানে আইনের যেসব ধারা সংশোধন করা দরকার বলে তাঁরা মনে করছেন সেগুলো উপস্থাপন করতে পারবেন পরিবহন নেতারা। সরকার মনে করলে তা সংশোধন করতে পারে।

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক মো. রুস্তম আলী খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন আইনে হালকা লাইসেন্স ব্যবহার করে ভারী গাড়ি চালালে শাস্তি পেতে হবে। এ ভয়ে চালকরা কর্মবিরতিতে গিয়েছিলেন। আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়টি তুলে ধরেছি। এ ছাড়া আমরা সড়ক দুর্ঘটনার মামলা জামিনযোগ্য করার দাবি করেছি। আমরা বলেছি, মহাসড়কের দুই পাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে বেষ্টনী তৈরি করতে, যাতে তার মধ্যে কোনো পথচারী প্রবেশ না করতে পারে। সরকার বিষয়টি বিবেচনা করবে বলে জানানো হয়েছে।’

রুস্তম আলী বলেন, ‘তৈরি পোশাক পরিবহনের জন্য কাভার্ড ভ্যান আশির দশক থেকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ভারী যানটির বাড়তি অংশ রয়েছে। এটা রাখলে নতুন আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। নতুন আইনে যানবাহনের আকারের বিষয়ে যে ধারা রয়েছে সেটা মানলে ৮০ শতাংশ গাড়িই রাস্তায় চালানো যাবে না। তাতে বিশেষ করে পণ্য পরিবহন প্রায় বন্ধ করে দিতে হবে।’

এদিকে গতকাল রাজধানীর সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে সীমিত বাস চলাচল করেছে দেশের বিভিন্ন রুটে। সে কারণে দূরপাল্লার যাত্রীদের ভিড় দেখা গেছে কমলাপুর রেলস্টেশন ও সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। ডেমরার সানারপাড় ও নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় দূরপাল্লার ও লোকাল বাস থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দেয় পরিবহন শ্রমিকরা।

আমাদের খুলনা অফিস ও বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিরা জানান, খুলনায় চতুর্থ দিনের মতো গতকাল বাসচালকরা কর্মবিরতি পালন করেছেন। এ ছাড়া জেলার অভ্যন্তরীণ রুটে বাস বন্ধ ছিল। সাতক্ষীরায় কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে বাস ছাড়েনি। সেখানে চলছিল অঘোষিত ধর্মঘট। নড়াইলে অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার সব রুটে বাস বন্ধ ছিল। দিনাজপুরের হিলি-বগুড়া রুটে বাস চলেনি। শেরপুর, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, ফরিদপুরেও বাস বন্ধ ছিল।

গতকাল ট্রাফিক সচেতনতা পক্ষের এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেছেন, পুলিশের উদ্দেশ্য সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো, জরিমানা আদায় নয়। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর বিষয়ে তিনি হুঁশিয়ার করে বলেছেন, ‘সড়কে বিশৃঙ্খলা হলে আবারও যদি আমাদের সন্তানরা রাস্তায় নামে তাহলে আমাদের কারোর পিঠের চামড়া থাকবে না।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক অধ্যাপক ড. সামছুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কত কমিটি, কত সুপারিশ— কিছুই বাস্তবায়ন করা যায় না। করতে গেলেই ধর্মঘটকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন পরিবহন নেতারা। তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ব্যবস্থাপনায় সক্ষম হতে হবে। তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আইন বাস্তবায়ন করতে হবে।’

সরকার কঠোর অবস্থান থেকে নমনীয় হওয়ার বিষয়টিকে বিশেষজ্ঞরা ছাড় দেওয়া বলে দাবি করলেও বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলছেন, ‘এটাকে ছাড় বলা যাবে না। বরং এটা এক ধরনের নেগোসিয়েশন।’

আজ জানা যাবে ফেডারেশনের সিদ্ধান্ত : নতুন সড়ক আইন সংশোধনের দাবিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত ২৩৩টি শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা ও পরিবহন শ্রমিকরা অনড় রয়েছে। ফেডারেশনের বর্ধিত সভা গতকাল ঢাকার সেগুনবাগিচায় সংগঠনের কার্যালয়ে শুরু হয়েছে। আজ শুক্রবার এ সভা শেষ হবে। সভার পর আজ পরিবহন শ্রমিকরা তাদের অবস্থান জানাবে। গতকাল সভার প্রথম দিনে বিভিন্ন জেলার পরিবহন শ্রমিক নেতারা তাঁদের মতামত তুলে ধরেন। অনেকে কর্মবিরতি অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দেন।

গতকাল পণ্যবাহী যানের ধর্মঘট তুলে নেওয়া হলেও বাসচালকরা গতকালও কর্মবিরতি পালন করেন কয়েকটি জেলায়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা