kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

পুঁজিবাজার উন্নয়নে পদক্ষেপ

‘দুর্বল’ আইসিবির পাশাপাশি আসছে নতুন বাজারশক্তি

বিডিবিএলকে বিনিয়োগ ব্যাংকে রূপান্তরের পরিকল্পনা

সজীব হোম রায়   

২১ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘দুর্বল’ আইসিবির পাশাপাশি আসছে নতুন বাজারশক্তি

পুঁজিবাজার উন্নয়নে ‘মার্কেট মেকারের’ ভূমিকায় ১৯৭৬ সাল থেকে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) একচ্ছত্রভাবে কাজ করছে। এবার আইসিবির পাশাপাশি একই ভূমিকায় কাজ করবে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল)। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আইসিবি যেসব সুযোগ-সুবিধা পায়, রাষ্ট্রায়ত্ত বিডিবিএল তাও পাবে। প্রাথমিকভাবে এটিকে ইনভেস্টমেন্ট বা বিনিয়োগ ব্যাংক হিসেবে

কার্যক্রম পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এরই মধ্যে বিডিবিএলকে পুঁজিবাজার নিয়ে কাজ করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে কাজও শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

মূলত পুঁজিবাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার না করা এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আইসিবির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পরিপ্রক্ষিতে বিডিবিএলকে পুঁজিবাজারের আরেক শক্তি হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে।

এ ছাড়া পুঁজিবাজার উন্নয়নে একগুচ্ছ পরিকল্পনাও নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এসব বিষয়ের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে—এমনটি আমরা দীর্ঘদিন ধরেই শুনছি। আইসিবির পাশাপাশি পুঁজিবাজারে সহায়তা দেওয়ার জন্য এ রকম একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা খুবই ইতিবাচক।’ বাজার স্থিতিশীলতায় বিডিবিএল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এ ব্যাপারে বিডিবিএলের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মতিনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বিডিবিএলের পুঁজিবাজারে আসার ব্যাপারে আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইসিবির সঙ্গে কেউ যদি পুঁজিবাজারে সাপোর্ট দেয় তাহলে মার্কেট চাঙ্গা হতে বাধ্য। কারণ, আগে আইসিবি একা মার্কেটে কাজ করত। এতে অনেক সমস্যা হতো। এখন বিডিবিএল এলে ভালো হবে। এটি ইতিবাচক। এখন টিম ওয়ার্কের মতো হবে।’

পুঁজিবাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্কিমের টাকা যথাযথভাবে ব্যবহার না করা এবং স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নের ব্যাপারে আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের তদন্তের যথাযথ জবাব দিয়েছি। বন্ডের ৭৫ শতাংশ টাকা বিনিয়োগের কথা থাকলেও আমরা ৯০ শতাংশ টাকা বিনিয়োগ করেছি। আমাদের কার্যক্রমে কোনো অস্বচ্ছতা নেই।’

সূত্র মতে, ১৯৯৬ সালের পর ২০১০ সালে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা বড় ক্ষতির সম্মুখীন হন। পথে বসেন অনেকেই। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত স্থিতিশীল হয়নি দেশের পুঁজিবাজার। পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতায় আইসিবিকে দফায় দফায় টাকা দিয়েছে সরকার। চলতি বছর আইসিবির অনুকূলে দুই হাজার কোটি টাকার বন্ড ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের প্রণোদনা স্কিমের টাকা থেকে ৮৫৬ কোটি টাকা ছাড় করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এসব টাকা যথাযথভাবে ব্যবহার না করার অভিযোগ রয়েছে। আবার আইসিবির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক সভায় এ প্রশ্ন তুলেছেন খোদ বিএসইসির চেয়ারম্যান এম খায়রুল হোসেন।

গত ৪৩ বছরে আইসিবির অর্জন যেমন অনেক। ঠিক তেমনি ব্যর্থতা এবং অভিযোগের তালিকাও অনেক লম্বা। এসব বিবেচনায় নিয়ে বিডিবিএলকে সামনে আনা হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বাড়ানোর মাধ্যমে বিনিয়োগ চাহিদা বাড়ানোর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুপারিশ হলো—পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাজার সৃষ্টিকারী সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এতে পুঁজিবাজারে অস্বাভাবিক উত্থান-পতন হ্রাস পাবে। অর্থ মন্ত্রণালয় তাদের সুপারিশে বলেছে, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বিডিবিএলকে ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম শুরু করাতে পারলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিষয়টিতে একমত পোষণ করেছেন অর্থমন্ত্রী। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী অংশীজনদের সঙ্গে শেরেবাংলানগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে একটি সভা করেন। সেখানে বিভিন্ন অংশীজনরাও এ প্রস্তাব করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী বৈঠকেই বলেন, আইসিবি যেখানে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হবে সেখানে বিডিবিএল দায়িত্ব পালন করবে। মূলত এর পর থেকেই বিডিবিএলকে বিনিয়োগ ব্যাংকে রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

ওই সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, বিএসইসির চেয়ারম্যান এম খায়রুল হোসেন বলেছেন, পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ২০ শতাংশ। এটি যুক্তিসংগত নয়। আইসিবি ও বিডিবিএলকে সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে অনুরোধ করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. ফজলে কবির এ পরিপ্রেক্ষিতে সভায় ঘোষণা দেন, এখন থেকে আইসিবি ও বিডিবিএলের জন্য সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার (একক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ঋণ পাওয়ার সর্বোচ্চ সীমা) ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনা পেয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কিভাবে বিডিবিএলকে বিনিয়োগ ব্যাংকে রূপান্তরিত করা যায় তা নিয়ে কাজ শুরু করেছে। আর এ ক্ষেত্রে প্রথমেই ব্যাংকটির ‘আর্টিক্যাল অব ম্যামোরেন্ডাম’ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ‘বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক’ এবং ‘বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থাকে’ একীভূত করে ২০০৯ সালে বিডিবিএল প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই একীভূতকরণের সময় কী কী বিষয় উল্লেখ ছিল তাও দেখছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ ছাড়াও রয়েছে অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ। আর এসব করতে গিয়ে বিনিয়োগ ব্যাংক রূপান্তর প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ আইসিবির সমালোচনা করে বলেন, ‘আইসিবি এখন বিরাট আকার ধারণ করেছে। খরচ হচ্ছে বেশি, লোকবল বেড়েছে। তবে কোনো কাজ হচ্ছে না। পুঁজিবাজার গঠনে যে ভূমিকা নেওয়ার কথা ছিল তাও নিতে পারছে না আইসিবি। তাই বিডিবিএলকে সামনে আনা ইতিবাচক পদক্ষেপ।’ বাজার স্থিতিশীলতায় দুই প্রতিষ্ঠান এক সঙ্গে কাজ করলে ভালো হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা