kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

কলকাতাজুড়ে গোলাপি সৌরভ

সামীউর রহমান, কলকাতা থেকে   

২১ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কলকাতাজুড়ে গোলাপি সৌরভ

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বিমানবন্দর থেকে বের হতেই বিশাল হোর্ডিং, ‘ভারতের প্রথম দিবারাত্রির টেস্ট ম্যাচে স্বাগতম’। রাতের ইডেনের ছবিটা নিঃসন্দেহে আগে হয়ে যাওয়া কোনো সীমিত ওভারের ম্যাচের, কারণ গোলাপি বলে দিন-রাতের টেস্ট ম্যাচ তো এর আগে ভারতীয় উপমহাদেশেই কোথাও হয়নি। বিশ্বকাপ ফুটবলের বাছাই পর্বে, ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচকে ঘিরে ছিল নীল রঙের জোয়ার। ভারত-বাংলাদেশ টেস্ট ম্যাচের আগে শহরের রং গোলাপি।

সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান। তাঁর শহরে ভারতের প্রথম দিন-রাতের টেস্ট। সব মিলিয়ে উত্তেজনার খই ফুটছে সবখানেতেই। আর খবরের ভাঁজে উড়ো খবরও যে ভাসছে না তা নয়! তাই কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা সেটা বিশ্বাস করা কঠিন। এই যেমন একজন ভারতীয় সাংবাদিক বললেন, প্রথম দিনের নৈশভোজে শেখ হাসিনাকে ভেটকি মাছের একটি পদ খাওয়ানো হবে! ইলিশ, চিংড়ি এসব বাদ দিয়ে ভেটকি কেন, এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চাপা কৌতুকে উত্তর, ‘ইস্ট বেঙ্গল-মোহনবাগান, কোনো পক্ষই যেন বেজার না হয় তাই ইলিশ-চিংড়ি বাদ দিয়ে ভেটকি!’

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসছেন, পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো থাকবেনই। তাঁরা দুজনেই নাকি ইডেনের বিখ্যাত ঘণ্টাটা বাজিয়ে শুরু করাবেন দিনের খেলা। আরো থাকবেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, তাঁর ছেলে জয় শাহ, যিনি এখন বিসিসিআই সচিব।

ইডেন গার্ডেনস মাঠটার জায়গাটা সেনাবাহিনীর, ময়দান নামে পরিচিত অঞ্চলটায় ইস্ট বেঙ্গল, মোহনবাগানসহ ছোট-বড় অনেক ক্লাবের তাঁবু, সবটাই সেনাবাহিনীর জমির ওপর। পাশেই বিখ্যাত ফোর্ট উইলিয়াম, এখন যেটা ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চল কমান্ডের সদর দপ্তর। তাই ইডেনে যখন এমন দক্ষযজ্ঞ চলবে, ভিনদেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা আসবেন, তখন টেস্ট ম্যাচের আগে তাদেরও তো কিছু করা চাই! দুই দেশের জাতীয় সংগীতের সুর বাজাবেন সেনাবাহিনীর বাদকদলের সদস্যরা। তবে এটা অনেকটাই প্রচলিত রীতি। নতুন চমকটা হচ্ছে, গোলাপি বল নিয়ে আকাশ থেকে নেমে আসবেন প্যারাট্রুপার! আকাশ থেকে মাঠে নেমে এসে বিরাট কোহলি ও মমিনুল হকের হাতে গোলাপি বল তুলে দেবেন ছত্রীসেনা। ম্যাচের মধ্যবিরতিতে এইচআইভি আক্রান্ত শিশুদের সঙ্গে ৬ ওভারের প্রীতিম্যাচ খেলবেন সাবেক ক্রিকেটার-ধারাভাষ্যকাররা। ম্যাচ শেষে থাকবে ৪৫ মিনিটের বিশেষ অনুষ্ঠান। যেখানে সম্মাননা জানানো হবে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টে খেলা ক্রিকেটারদের, গান গাইবেন রুনা লায়লা। এ ছাড়া ইডেনে যে টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ফলোঅনে পড়েও ম্যাচ জিতেছিল ভারত, সেই অমর কথার দুই রূপকার, ভি ভি এস লক্ষ্মণ ও রাহুল দ্রাবিড়কেও দেওয়া হবে বিশেষ সম্মাননা। উপস্থিত থাকবেন ভারতের মহিলা বক্সার ম্যারি কমসহ আরো বেশ কজন কৃতী ক্রীড়াবিদ। সেই সঙ্গে আরো অনেক চমক নাকি থাকছে, যা ফাঁস করতে চাইছেন না আয়োজকরা।

তবে এই আয়োজন মাঠে বসে দেখার সৌভাগ্য খুব বেশি মানুষের নাও হতে পারে। টিকিটের প্রচণ্ড চাহিদা চারদিকে। সাংবাদিক, সিএবি কর্তা সবার কাছে টিকিট চেয়ে ফোন আসছে। কাউন্টারে কোনো টিকিট বিক্রি হচ্ছে না, তবু ইডেনের মূল ফটকের সামনে লম্বা লাইন। প্রথম তিন দিনের খেলার সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে, কেউ এক দিন বাড়িয়ে বলছেন চার দিনেরই টিকিট শেষ। ৫০ টাকার টিকিট কালোবাজারে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ইডেনের দর্শক ধারণ ক্ষমতা ৬৮ হাজার, এর ভেতর ২৬ হাজারের মতো টিকিট সাধারণ দর্শকদের জন্য বরাদ্দ থাকে। বাকিগুলো আমলা, পৃষ্ঠপোষক, সিএবি (ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গল) অধিভুক্ত ক্লাব ও নানা সরকারী সংস্থার কাছে চলে যায় ‘কমপ্লিমেন্টারি’ হিসেবে; কাঁটাতারের দুধারেই সংস্কৃতিটা প্রায় অভিন্ন!

আয়োজকদের জোর প্রচেষ্টা টেস্ট ম্যাচ আয়োজনে নতুনত্বের ছোঁয়া দেওয়ার। তাইতো মাঠের দেয়ালের থামগুলোকে গোলাপি কাপড়ে মুড়ে দেওয়ার চেষ্টার পাশাপাশি কর্তাব্যক্তিরা নিজেরাও নাকি মাঠে আসবেন গোলাপি শার্ট গায়ে! আছে দুই দলের দুই মাসকট, পিঙ্কু ও টিঙ্কু এরই মধ্যে বাচ্চাদের মাঝে বেশ সাড়া জাগিয়েছে। কাছেই গঙ্গা, সেখানে চলাচল করা লঞ্চগুলোকে সাজানো হয়েছে গোলাপি আলোর মালায়। কলকাতার সবচেয়ে উঁচু ভবন ‘দ্য ফোর্টি টু’, শহীদ মিনার এসব স্থাপনা রাঙানো হবে গোলাপি রঙে, টাটা স্টিলের ভবনের ছাদে থাকবে থ্রিডি ম্যাপিং। ইডেনে উড়ছে গোলাপি বেলুন, শহরে চলবে পিংক থিম বাস, জ্বলবে এলইডি বোর্ড, সব মিলিয়ে যাকে বলে একেবারে এলাহি ব্যাপার।

ভারতের জাতীয় পতাকা তেরঙ্গা কিংবা বাংলাদেশের লাল-সবুজ, কোথাও নেই গোলাপি। তবে বলের রংটা গোলাপি হওয়াতেই এই টেস্টজুড়ে এত উন্মাদনা। অবশ্য গত কিছুদিন ধরে বাংলাদেশ দলের টেস্টের যা পারফরম্যান্স আর ভারতের যতটা সাফল্য, তাতে করে দিনের বেলায় এই দুই দল টেস্ট খেললে মাঠে সাংবাদিক আর পুলিশ ছাড়া কজন দর্শকই বা আসতেন! সৌরভ গাঙ্গুলি বোর্ড প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের শহরের মাঠে প্রথম সুযোগেই প্রাণ ফিরিয়ে আনলেন, প্রশাসক হিসেবে যেটা তাঁর ধ্রুপদি কভার ড্রাইভের চেয়েও যেন ঝকমকে মাস্টারস্ট্রোক।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা