kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

ঢাকায় বায়ুদূষণ ভয়াবহ

করণীয় ঠিক করতে ৭ মন্ত্রী বৈঠকে বসছেন

আরিফুর রহমান   

২১ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করণীয় ঠিক করতে ৭ মন্ত্রী বৈঠকে বসছেন

কখনো বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশ, কখনো রাজধানী শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা দ্বিতীয় প্রধান দূষিত বাতাসের শহর হিসেবে বিশ্ব গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়ে আসছে বাংলাদেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গ্রিনপিস, এয়ারভিজ্যুয়াল, যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা ইপিএসহ বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনে প্রতিবছরই উঠে আসছে বাংলাদেশে বায়ুদূষণের ভয়াবহতার বিষয়টি। বায়ুদূষণের কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবছর সোয়া লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটছে।

এসব উদ্বেগজনক প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরও কখনো বায়ুদূষণ কমানোর কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি সরকারের পক্ষ থেকে। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে প্রতিবছর নভেম্বর থেকে মার্চ—এই সময়ে প্রতিদিনকার বায়ুর মানমাত্রা বের করা হয়। সেখানেও উঠে আসছে রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ অন্যান্য শহরে অতি অস্বাস্থ্যকর বায়ুর তথ্য। তবে এই প্রথমবারের মতো বায়ুদূষণের ভয়াবহতা নিয়ে টনক নড়তে দেখা যাচ্ছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে। দূষণ কমিয়ে আনতে কী করণীয়, তা ঠিক করার পাশাপাশি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে ছয়জন মন্ত্রীকে নিয়ে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন পরিবেশমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন। বৈঠকে ডাকা হয়েছে মেয়র ও সচিবদেরও। আগামী ২৫ নভেম্বর সচিবালয়ে এই জরুরি আন্ত মন্ত্রণালয় সভা ডাকা হয়েছে।

সভায় যোগ দিতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি এই ছয়টি মন্ত্রণালয়ের সচিবদেরও ডাকা হয়েছে। আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রকেও। পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজি), বিআরটিএ চেয়ারম্যান, রাজউক চেয়ারম্যানসহ বায়ুদূষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদেরও সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বৈঠকে প্রস্তাবিত নির্মল বায়ু আইনের বিভিন্ন দিক নিয়েও আলোচনা হবে।

পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন, বায়ুদূষণ নিয়ে বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো এত বড় আকারে বৈঠক হতে যাচ্ছে। তাঁরা বলেছেন, জাতীয় পরিবেশ কমিটি নামে একটি কমিটি আছে; যে কমিটির প্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী। ওই সভা কয়েক বছর পর একবার হয়। সেখানে কয়েকজন মন্ত্রী থাকেন। কিন্তু সেখানে পরিবেশের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। শুধু বায়ুদূষণ প্রতিরোধ নিয়ে এর আগে কখনো এমন উঁচু মাপের বৈঠক হয়নি। তবে তাঁরা এটাও বলছেন, ২৫ নভেম্বরের বৈঠকে আমন্ত্রিত মন্ত্রীরা সবাই আসবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে সংশয় যা-ই থাকুক, বায়ুদূষণের ভয়াবহতা যে পরিবেশ মন্ত্রণালয় উপলব্ধি করেছে এবং সবাইকে নিয়ে সমন্বিতভাবে একটি উপায় খোঁজার চেষ্টা করছে, সেটিকে বেশ ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

গতকাল বুধবার পরিবেশমন্ত্রী শাহাব উদ্দিন বলেন, ‘আমরা দেখছি, ঢাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এটি উদ্বেগজনক। বায়ুদূষণ কিভাবে কমিয়ে আনা যায়, সে জন্য আমরা একটি আন্ত মন্ত্রণালয় সভা ডেকেছি। আমরা সবার মতামত শুনে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করব।’ তিনি বলেন, ‘বায়ুদূষণ রোধে আমরা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চাই। এর আগে সবার বক্তব্য শুনব। বায়ুদূষণ কমানো একা কারো পক্ষে সম্ভব নয়।’

এদিকে বায়ুদূষণ প্রতিরোধে মাঠে নামছে পরিবেশ অধিদপ্তরও। রাজধানীতে অবকাঠামো নির্মাণের কারণে বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি হওয়ার পেছনে সরকারের ১০টি সংস্থা দায়ী বলে তাদের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ওই ১০টি সংস্থাকে চিঠি দিতে যাচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর। দুই-তিন দিনের মধ্যে তাদের চিঠি দিয়ে সতর্ক করে দেওয়া হবে। দশটি সংস্থা হলো- ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, গণপূর্ত অধিদপ্তর, রাজউক চেয়ারম্যান, ঢাকা ওয়াসা, তিতাস, রিহ্যাব, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও ডিটিসিএ। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে ওই ১০টি প্রতিষ্ঠান যেসব প্রতিশ্রুতি পরিবেশ অধিদপ্তরকে দিয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু করেছিল, সেসব প্রতিশ্রুতি যাতে প্রতিপালন করা হয়, সেটিও চিঠিতে উল্লেখ থাকবে।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, ঢাকা শহরে চলমান মেট্রো রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় প্রকল্পগুলো বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় পানি ছিটানো, নির্মাণসামগ্রী ঢেকে পরিবহন ও মজুদ করা, যত্রতত্র ফেলে না রাখার শর্ত ছিল; কিন্তু এসব মানা হয় না। এসব শর্ত যাতে মানে সেই নির্দেশনা থাকবে চিঠিতে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তৈরি করা এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বায়ুদূষণের প্রধান কারণ হলো ইটভাটা। ৫৮ শতাংশ দায়ী ইটভাটা। এর পরের অবস্থানে আছে নির্মাণশিল্প। এরপর যথাক্রমে যানবাহনে ব্যবহৃত জ্বালানি ও বর্জ্য পোড়ানো।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বায়ুমান) জিয়াউল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেসব ইটভাটা সনাতন প্রক্রিয়ায় এখনো পরিচালিত হচ্ছে, আমরা শিগগিরই সেসব ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযানে নামব। সরকার ধীরে ধীরে অবকাঠামো নির্মাণে ইটের পরিবর্তে ব্লকের দিকে যাচ্ছে। অবৈধ কয়েক শ ইটভাটা আছে, আমরা অভিযান পরিচালনা করে সেসব বন্ধ করে দেব। এ ছাড়া সরকারের ১০টি সংস্থাকে আমরা চিঠি দেব, তারা যাতে বায়ুদূষণ না করে। ওই ১০টি সংস্থা ঢাকা শহরে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করে।’

নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেস) প্রকল্পের আওতায় পরিবেশ অধিদপ্তর প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, নারায়ণগঞ্জসহ বড় শহরগুলোতে প্রতিদিনকার বায়ুদূষণের মাত্রা বের করে। গত ১৫ নভেম্বরের তথ্যে দেখা গেছে, ঢাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা ছিল ২৩১। নারায়ণগঞ্জে ছিল ২৯৯, খুলনায় ১৪৯, রাজশাহীতে ১৫৫। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, বায়ুর মানমাত্রা ২০০ থেকে ৩০০ থাকলে সেটিকে বলা হয় অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। পরিবেশ অধিদপ্তরের তৈরি করা এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বায়ুদূষণের অন্যতম উপাদান ধুলা। নভেম্বর থেকে মার্চ—এই পাঁচ মাস ধুলাবালির পরিমাণ বেশি থাকে। এ সময় রাজধানীতে নির্মাণ ও উন্নয়নকাজ শুরু হয়। শীতকালে ঢাকার চারপাশে ইটভাটার কাজ শুরু হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, অন্য সময়ের (এপ্রিল-অক্টোবর) তুলনায় শীতের সময়ে (নভেম্বর-মার্চ) বায়ুদূষণের মাত্রা (পিএম-২.৫-এর নিরিখে) প্রায় পাঁচ গুণ হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট ও ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে এক লাখ ২২ হাজারের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ২৫ নভেম্বরের সভায় এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা