kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

দেশ অচল করে নতুন সড়ক আইন সংশোধনের চাপ

পার্থ সারথি দাস   

২০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



দেশ অচল করে নতুন সড়ক আইন সংশোধনের চাপ

নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংস্কারের দাবিতে গতকাল রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় সড়ক অবরোধ করে পরিবহন শ্রমিকরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর করতে সরকার অনড়। অন্যদিকে সড়ক দুর্ঘটনার দায়ে চালকের ফাঁসি হবে, এমন গুজব ছড়িয়ে গতকাল মঙ্গলবার দেশের ২০টি জেলায় পরিবহন শ্রমিকদের কর্মবিরতি আরো ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আগের দিন সোমবার ১৪ জেলায় বাস চলাচল বন্ধ ছিল। শ্রম আইন না মেনে, প্রকাশ্যে ঘোষণা না দিয়ে এই কর্মসূচির নেপথ্যে ইন্ধন দিচ্ছেন পরিবহন নেতারা।

এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আজ বুধবার থেকে সারা দেশে পণ্য পরিবহন ধর্মঘট। শ্রম আইন অনুসারে এটিও ঘোষণা করা হয়নি। আইন না মেনে হঠাৎ পরিবহন ধর্মঘটে দেশ অচল করে নতুন সড়ক আইন সংশোধন করতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন পরিবহন খাতের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। অবশ্য শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলছেন, বিভিন্ন পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা সংগঠনের নির্বাচন সামনে রেখে স্বার্থ হাসিলের জন্য পরিবহন শ্রমিকদের উসকে দিচ্ছেন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন প্রকাশ্যে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। যদিও শ্রমিক ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা কর্মবিরতির পক্ষে জেলায় জেলায় প্রকাশ্যে বক্তব্য দিচ্ছেন। 

ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খান এমপি গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যারা বলছে আমি উসকানি দিচ্ছি, তারা নিন্দুক। নিন্দুকেরা অনেক কিছু বলে। নতুন আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় শাস্তির বিষয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে এসব কর্মসূচি পালন করাচ্ছে স্বার্থান্বেষী শ্রমিক নেতারা।’

আর বিপ্লবী সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মনজুরুল আহসান খান বলেন, ‘মালিক ও পরিবহন নেতারা চাঁদাবাজিতে ব্যস্ত। শুদ্ধি অভিযানের মধ্যে তাঁরা প্রকাশ্যে কর্মসূচির ঘোষণা দিচ্ছেন না। মালিকরা চালকদের নিষ্পেষণ করছেন। নতুন আইনে চালকদের যত অপরাধ ধরা হয়েছে, মালিকদের তত ধরা হয়নি। এটা এই পরিস্থিতির বড় কারণ।’

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত বিআরটিএ প্রধান কার্যালয়ে বিআরটিএ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন পরিবহন নেতারা। বৈঠকে শাজাহান খান উপস্থিত ছিলেন না। বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন আইনে বিআরটিএ যে প্রচারপত্র বিলি করেছে, তাতে শুধু চালকদের শাস্তি ও জরিমানার বিষয়টি আছে। আইনে কন্ডাক্টর নিয়োগ করার কথা থাকলেও বিআরটিএ এ জন্য ফরম তৈরি করে ছাপায়নি। সহনীয় পর্যায়ে জরিমানা করে আরো সময় নিয়ে আইন বাস্তবায়নসহ এসব বিষয়ে আমরা বিআরটিএর কাছে সুপারিশ তুলে ধরেছি। তারা এসব বিষয়ে সম্মত হয়েছে। আর কর্মবিরতি কেন চলছে তার দায় আমরা নিতে পারব না। সম্ভবত এটা হয়েছে যথেষ্ট সময় নিয়ে আইন কার্যকর না করায়।’

নতুন সড়ক পরিবহন আইনে অপরাধ জামিনযোগ্য করা ও জরিমানা কমানোসহ আট দাবিতে গত বছরের ৭ থেকে ৯ অক্টোবর ঢাকা বিভাগে পণ্য পরিবহনে কর্মবিরতি পালন করেছিল বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। এই পরিষদ গতকাল আবার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ঘোষণা অনুসারে আজ বুধবার সারা দেশে পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকবে।

শ্রম অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের পরিচালক ও রেজিস্ট্রার অব ট্রেড ইউনিয়ন বিল্লাল শেখ গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শ্রম আইন ২০০৬-এর ২১১ ধারা অনুসারে, ধর্মঘট বা কর্মবিরতিতে যেতে হলে সংশ্লিষ্ট সংগঠনকে প্রথমে মালিক, পরে শ্রম অধিদপ্তরের কাছে দাবিনামা পেশ করতে হয়। তারপর শ্রম অধিদপ্তর ব্যর্থ হলে সংগঠন সাত দিনের নোটিশ দিয়ে এ কর্মসূচিতে যেতে পারে। তবে আমার জানা মতে, পরিবহন খাতে যে কর্মবিরতি চলছে তার আগে কোনো সংগঠন দাাবিনামা জানানোসহ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হানিফ খোকন গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কর্মবিরতি পালন করছেন চিহ্নিত পরিবহন নেতারা। তাঁরা প্রকাশ্যে নয়, গোপনে মোবাইল ফোনে উসকানি দিচ্ছেন।’

সারা দেশে ট্রাক বন্ধের ঘোষণা : বিভিন্ন জেলায় বাস চলাচল বন্ধ রাখার পর গতকাল মঙ্গলবার সারা দেশে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লরিসহ পণ্য পরিবহনের যান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। গতকাল সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পরিষদের আহ্বায়ক মো. রুস্তম আলী খান নতুন আইন স্থগিত রাখাসহ ৯টি দাবিতে আজ বুধবার থেকে অনির্দিষ্টকালের এ কর্মবিরতি শুরুর কথা ঘোষণা করেন।

পণ্যবাহী পরিবহনের ধর্মঘট শুরু হলে পণ্য পরিবহন বাধার মুখে পড়বে ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিষদের নেতারা বলছেন, হালকা লাইসেন্স দিয়ে ভারী গাড়ি চালানো যায় না। ভারী গাড়ি চালানোর জন্য বিআরটিএ লাইসেন্স দিচ্ছে না। হালকা লাইসেন্স দিয়ে ভারী গাড়ি চালাতে গেলে জরিমানা করা হচ্ছে ২৫ হাজার টাকা। এ জরিমানা একজন চালক কিভাবে দেবেন—তাই তাঁরা গাড়ি চালাবেন না। নতুন আইনে চালকের লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটা হবে। এ আইন বাংলাদেশে চলে না।

জেলায় জেলায় ধর্মঘট-ভোগান্তি : গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো খুলনায় চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের ‘কর্মবিরতিতে’ বাস চলাচল বন্ধ থাকে। তার আগের দিন অভ্যন্তরীণ রুটে বাস চলাচল বন্ধ ছিল। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, যশোর, ঝিনাইদহসহ আশপাশের সব জেলার অভ্যন্তরীণ বাস চলাচল বন্ধ থাকে। স্থানে স্থানে শ্রমিকদের বাধায় এসব জেলা থেকে ঢাকামুখী বাসও চলাচল করতে পারেনি। তবে পণ্যবাহী কিছু ট্রাক চলাচল করে। খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল ও রয়্যালের মোড়ে সারি সারি বাস বন্ধ করে রাখা হয়। সাতক্ষীরায় কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে যাত্রীরা বাসের অপেক্ষা করে ফিরে যান। ওই জেলা থেকে ঢাকামুখো বাস চলাচলও বন্ধ ছিল।

চুয়াডাঙ্গায় অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ ছিল। যাত্রীবাহী বাস ছাড়াও সেখানে বন্ধ থাকে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল। মেহেরপুরেও বাস বন্ধ থাকে। যশোরে গতকালও বাস চলেনি। সব ধরনের সড়কে বাস চলাচল বন্ধ থাকে। গত রবিবার সকাল ১১টা থেকে যশোর-নড়াইল, যশোর-খুলনা, যশোর কেশবপুর, যশোর-চৌগাছা, যশোর-নাভারণ-সাতক্ষীরা, যশোর-রাজগঞ্জ, যশোর-ঝিনাইদহ, যশোর-মাগুরাসহ বিভিন্ন রুটে বাস চলাচল বন্ধ রাখা হয়। গতকাল দুপুরে খুলনা সার্কিট হাউসে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতারা কর্মবিরতি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। আজ বুধবার থেকে সেখানে চালকরা গাড়ি চালাবেন বলে প্রশাসন আশা করছে।

মেহেরপুরে ধর্মঘটের ফলে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী ও চাকরিজীবীরা বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। নড়াইল-যশোর, নড়াইল-লোহাগড়াসহ অভ্যন্তরীণ পাঁচটি রুটে ঘোষণা ছাড়াই বাস চলাচল বন্ধ রাখা হয়।

বরিশাল জেলার বিভিন্ন স্থানে বাস চলাচল বন্ধ থাকায় সেখানেও দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। মাদারীপুরে গতকাল ভোর থেকে জেলার বিভিন্ন রুটে বাস চলাচল বন্ধ থাকে।

নওগাঁয় গতকালও অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার বাস চলাচল করেনি। নওগাঁর সঙ্গে বগুড়া, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাটের বাস চলাচল বন্ধ থাকে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে দূরপাল্লার বাস বন্ধ রাখেন চালকরা। গাজীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে গাড়ি আটকে রাখা হয়। বিকেল থেকে এ পথে বাস চলাচল শুরু হয়। তবে যাত্রীরা ঢাকা, ময়মনসিংহ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন বাস টার্মিনালে গিয়ে বাস চলছে না দেখে জরুরি যাত্রা বাতিল করেন।

খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় পরিবহন ধর্মঘটের জেরে দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া-রাজৈর সড়কে বাস চলাচল করেনি। যাত্রীরা মহেন্দ্র ও ইজি বাইকে অতিরিক্ত ভাড়ায় চলাচল করেন।

মাদারীপুর থেকে লোকাল ও দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকে। মাদারীপুর জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান হাওলাদার বলেন, নতুন আইন গলায় ফাঁসির মতো সেঁটে দিয়েছে সরকার। ফাঁসির দড়ি নিয়ে চালকরা গাড়ি চালাবেন না। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে লোকাল বাস চলেনি। আন্ত জেলা বাস চলেছে হাতে গোনা।

পাবনায় অবশ্য চালকদের একটি অংশ বিরোধীদের উপেক্ষা করে বাস চালায় কয়েক রুটে। দিনাজপুরের হিলিতে চতুর্থ দিনের মতো হিলি-বগুড়া রুটে বাস ধর্মঘট চলে। নওগাঁ জেলা থেকে ১১ উপজেলার সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ থাকে। রাজশাহী-বগুড়া রুটের বাস চলাচলও বন্ধ থাকে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভেতরে বাস ও ট্রাক চলাচল পুরোপুরি বন্ধ থাকে। ঝালকাঠির অভ্যন্তরীণ ১৪ রুটে বাস না চলায় বিপাকে পড়েন যাত্রীরা।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলায় বাস ধর্মঘটের কারণে ফরিদপুরের সঙ্গে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। গতকাল সকাল থেকে ওই সব আন্ত জেলা রুটে ফরিদপুর থেকে কোনো বাস ছেড়ে যায়নি।

গতকাল ফরিদপুর থেকে খুলনা, বেনাপোল, পাবনা, রাজশাহী, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর পথে কোনো বাস চলাচল করেনি। বিআরটিএ’র সাতটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করায় গতকাল রাজধানীতে গণপরিবহন কম ছিল। অভিযানকালে ৭৯টি মামলা করা হয়। তবে কাউকে জেল দেওয়া হয়নি।

আজ বৈঠক হতে পারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে : পরিবহন শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান খানের বৈঠক আজ অনুষ্ঠিত হতে পারে। বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ঐক্য পরিষদের পাঁচজন নেতা গতকাল রাত প্রায় ১০টার দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকার মনিপুরীপাড়ার বাসায় অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময়ে বসেন। মতবিনিময়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আজ সারা দেশ থেকে সংগঠনের নেতারা ঢাকায় আসার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট পরিবহন শ্রমিক নেতারা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন আমাদের সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা