kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ কার্যকর

নেতাদের উসকানিতে ১৪ জেলায় পরিবহন ধর্মঘট

► আইন বাস্তবায়নে অনড় সরকার
►প্রথম দিনে সহনীয় মাত্রায় জরিমানা আদায়
► ঢাকায় ছয় ভ্রাম্যমাণ আদালতের ৮৮ মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



নেতাদের উসকানিতে ১৪ জেলায় পরিবহন ধর্মঘট

নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর হয়েছে। রাজধানীজুড়ে চলছে অভিযানও। এর মধ্যেই মাঝ সড়কে যাত্রী ওঠানামা করছে বাসগুলো। গতকাল মালিবাগের হাজীপাড়া থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

পরিবহন নেতাদের উসকানিতে শ্রমিকরা উত্তর, দক্ষিণ-পশ্চিমের ১৪টি জেলায় অবৈধ কর্মবিরতি চলার মধ্যে গতকাল সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ কার্যকর করা হয়েছে। আইন অমান্যের ক্ষেত্রে প্রথম দিনে সহনীয় মাত্রায় জরিমানা আদায় করা হয়। বিআরটিএর আটটি ভ্রাম্যমাণ আদালত ঢাকা মহানগরীতে পরিচালনা করা হয়। এই অভিযানকালে দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত কয়েকটি রুটে বাস চলাচল খুব কম ছিল। এতে সিটিং বাসও লোকাল হয়ে যায়। গাদাগাদি করে যাত্রীদের চলতে হয়েছে, ভাড়া বেশি লেগেছে, গন্তব্যে পৌঁছতে দেরিও হয়েছে। নতুন আইন প্রয়োগের মধ্যেও সড়কে অনেককে লেনবিধি অমান্য করা, কাছে ফুট ওভারব্রিজ থাকার পরও পথচারীদের দৌড়ে সড়ক পারাপার হতে দেখা গেছে।

রাজধানীতে সাত স্থানে অভিযান : বিআরটিএ গতকাল সকাল ১১টা থেকে বিকেল পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীর সাতটি স্থানে ছয়টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। এর মধ্যে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের দুটি স্থানে দুটি আদালত পরিচালনা করা হয়। এ ছাড়া আদালত পরিচালনা করা হয় কাকলী, পল্লবী, রায়েরবাগ, দিয়াবাড়ী ও উত্তরায়। আদালতে ৮৮টি মামলা এবং এক লাখ ২১ হাজার ৯০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।

দুপুর সোয়া ১টার দিকে কাকলীতে বিমানবন্দরমুখী সড়কের বাঁ পাশে ফুটপাতের ওপরে দেখা মিলল বিআরটিএর ভ্রামাম্যণ আদালত-৪-এর। এখানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এম এম সামীউল ইসলাম আদালত পরিচালনা করছিলেন। সকাল ১১টা থেকে তখন পর্যন্ত এখানে ১০টি মামলা এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। দেখা গেল আজিমপুর থেকে বাইপাইলের দিকে যেতে থাকা বিকাশ পরিবহনের একটি বাস (নম্বর ঢাকা মেট্রো-ব-১৪-৮০৫৪) আটকানো হয়েছে। কারণ কী জানতে চাইলে বাসের চালক মো. শিপলু স্বীকার করেন, গাড়ির কোনো বৈধ কাগজপত্রই নেই। দুটি মামলায় জরিমানা দেওয়ার মেয়াদও শেষ হয়েছে। তাঁর গাড়ি চালানোর লাইসেন্সও নেই। বাসে ১৫ যাত্রী এ অবস্থায় নেমে পড়তে বাধ্য হয়। এর আগে আরেকটি বাসের রুট পারমিট না থাকায় চার হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এ ছাড়া ঢাকা মেট্রো-ন-২০-২৫৩৮-এর চালকের কাছে লাইসেন্স না থাকায় ৬৬ ধারায় এক হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। নতুন আইনে এ অপরাধের সর্বোচ্চ জরিমানা ২৫ হাজার টাকা।

সকাল ১১টায় মানিক মিয়া এভিনিউয়ে আদালত পরিচালনা করছিলেন বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত-৭ ও আদালত-৮। ভ্রাম্যমাণ আদালত-৮-এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ সাদিয়া তাজনীন জানান, নতুন আইনের সর্বোচ্চ হারে জরিমানা এখনই আদায় করা হচ্ছে না। ভ্রাম্যমাণ আদালত-৭-এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাসুদ হাসান পাটোয়ারী জানান, অভিযানে গাড়িচালকের লাইসেন্স, ফিটনেস সনদ, নিবন্ধনসহ বিভিন্ন কাগজপত্র ঠিক আছে কি না দেখা হচ্ছে। বিআরটিএর পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) এ কে এম মাসুদুর রহমান গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অভিযানকালে কাউকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়নি। আইনটি প্রথমবারের মতো কার্যকর হচ্ছে বলে আমরা জনসচেতনতাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। অভিযান সরকারি ছুটির দিন ছাড়া অব্যাহত থাকবে।’

চাপে সরবে না সরকার : নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের প্রথম দিনে দক্ষিণ ও উত্তরের বিভিন্ন জেলায় পরিবহন শ্রমিকরা যখন ধর্মঘট করছিল তখন সচিবালয়ে সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, কোনো চাপেই নতুন সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নের পথ থেকে সরকার সরে আসবে না। এ আইন প্রয়োগে যেন অযথা বাড়াবাড়ি না হয় সে ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়ার কথাও তিনি জানান। তিনি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়াকালেই ১০ জেলায় বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার বার্তা আসে। তখন ওবায়দুল কাদের বলেন, যত চাপই থাকুক, আইনটি বাস্তবায়ন করতেই হবে।

ধর্মঘটের বিষয়ে সড়কমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি সেটা জানি, তাদের সঙ্গে আমাদের সচিব আলোচনা করেছেন, আমিও কথা বলেছি, দেখেন না কী হয়। তাই বলে আইন প্রয়োগ না করে সরে যাব, এটি কি আপনারা চান? আপনারাও আমাকে সহযোগিতা করুন, তারা তো চাপ দেবেই।

কর্মবিরতিতে যাত্রী দুর্ভোগ : নতুন আইন কার্যকরের প্রতিবাদে পূর্বঘোষণা ছাড়াই গতকাল সকাল থেকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলাসহ আরো চার জেলায় বাস চলাচল বন্ধ রাখে পরিবহন শ্রমিকরা। এতে দুর্ভোগে পড়ে দূরপাল্লার যাত্রীরা। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, মাগুরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গায় এ ধর্মঘট চলে। এ ছাড়া ধর্মঘট চলে রাজশাহী, শেরপুর, দিনাজপুরের হিলি ও নওগাঁর ধামইরহাটে। রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর রুটে বাস চলাচল বন্ধ থাকে। শেরপুর থেকে ঢাকাসহ বেশির ভাগ রুটের বাস চলাচল বন্ধ থাকে। ঢাকা থেকে বরিশাল, খুলনা, রংপুর, বগুড়া, পটুয়াখালী, পঞ্চগড়সহ দূরপাল্লার বাস চলাচল সীমিত ছিল। পরিবহন শ্রমিক নেতারা একে বলছেন ‘স্বেচ্ছায়’ কর্মবিরতি।

নতুন আইনে বেপরোয়া মোটরযানের কবলে দুর্ঘটনা হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জেল, সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কিছু নেতা পরিবহন শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে বলছেন, তাদের ফাঁসি হবে। এ কারণে শ্রমিকদের এই কর্মবিরতি। সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন আইনে দুর্ঘটনার জন্য চালকদেরই দায় নিতে হচ্ছে। পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা দিতে হবে। চালকরা বলছে, কাউকে তারা ইচ্ছা করে হত্যা করে না। এ কারণে বহু স্থানে তারা কর্মবিরতি পালন করছে। আমরা বাধা দিলেও তারা তা করছে।’

খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনালে দুপুর ১টায় দেখা যায়, টার্মিনালে বাসগুলো সারি সারি দাঁড়িয়ে। যাত্রীরা এসে বাস চলাচল সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছে; কিন্তু বাস চলাচল কখন শুরু হবে, কেউ তা বলতে পারছিল না। যাত্রী আব্দুল হালিম জানান, পাইকগাছা যাবেন বলে টার্মিনালে এসেছিলেন। তিনি পরে ইজি বাইকে গল্লামারী হয়ে সেখান থেকে তিন চাকার যানে করে চুকনগর যান। এভাবে ভেঙে ভেঙে গন্তব্যে যাবেন বলে জানান। খুলনা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. নুরুল ইসলাম বেবী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের প্রতিবাদে শ্রমিকরা বাস চালাচ্ছে না। তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি শুরু করেছে।’

নড়াইলে জেলার অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক ও মহাসড়কে কোনো বাস, ট্রাক বা অন্য কোনো পরিবহন চলেনি। দুপুর থেকে নতুন আইন সংস্কারের দাবিতে কয়েক দফা বিক্ষোভ মিছিল করে পরিবহন শ্রমিকরা। গোপালগঞ্জ থেকে যশোর যাওয়ার জন্য যাত্রী ইলিয়াস হোসেন সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে কালনা ঘাটে গিয়ে কোনো গাড়ি চলছে না দেখে নড়াইল পর্যন্ত ভাড়ায় মোটরসাইকেলে এবং পরে ইজি বাইকে যশোর যান। লোহাগড়া থেকে ছেলেকে চিকিৎসক দেখাতে যশোর যেতে বের হয়ে আরতী রানী তিন গুণ ভাড়া দিয়ে ইজি বাইকে গন্তব্যে পৌঁছেন। জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি সরদার আলমগীর হোসেন বলেন, এটা বাস মালিকদের কোনো ধর্মঘট নয়। চালকরা গাড়ি চালাতে চাচ্ছেন না। তাই বাস বন্ধ রয়েছে।

কালের কণ্ঠ’র স্থানীয় প্রতিনিধিরা জানান, যশোর-বেনাপোল ও যশোর-সাতক্ষীরার অভ্যন্তরীণ রুটে কোনো বাস চলাচল করেনি। তবে ঢাকা-কলকাতা ও বেনাপোল থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং দেশের অন্যান্য স্থানে দূরপাল্লার বাস চলাচল করেছে। প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, ইজি বাইক, মহেন্দ্র, নসিমন-করিমনসহ ছোট যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ছিল যশোরে। ঝিনাইদহে ভাড়ায় চালিত মাইক্রোবাস ও প্রাইভেট কার চালকরাও কর্মবিরতি পালন করেন। ঝিনাইদহ-যশোর, ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ-মাগুরা, ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ-হাটফাজিলপুর ও ঝিনাইদহ-হরিণাকুণ্ডু রুটে বাস চলাচল বন্ধ থাকে। চুয়াডাঙ্গায় সকাল থেকে জেলার অভ্যন্তরীণ রুটের বাস চলাচল বন্ধ থাকে। সকাল ১০টার পর ঢাকা-চুয়াডাঙ্গা রুটের বাসও বন্ধ হয়ে যায়।

স্থানীয় প্রতিনিধির কাছ থেকে জানা গেছে, রাজশাহী থেকে সব রুটের বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয় সকাল থেকে। বিকেলে অবশ্য ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়। রাজশাহীর মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা ঢাকাগামী বিভিন্ন কোচের কাউন্টারে অবস্থান করে বাস ও মিনিবাস চলাচল বন্ধ করে দেন। তাঁরা কাউন্টারগুলোতে অপেক্ষমাণ যাত্রীদেরও বের করে দেন। ভোরে কয়েকটি বাস যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে ছাড়ে। তবে সকাল সাড়ে ৬টার পর আর কোনো বাস ছাড়েনি। বিকেল সাড়ে ৪টায় বাস চলাচল শুরু হয়। দিনাজপুরের হিলি থেকে বগুড়া রুটে তৃতীয় দিনের মতো বাস চলাচল বন্ধ ছিল গতকাল। ঢাকা-শেরপুর রুটে সোনার বাংলা পরিবহনের বাস চলাচল বন্ধ ছিল। জেলার অভ্যন্তরীণ রুটেও চালকরা কর্মবিরতি পালন করেন।

[সংশ্লিষ্ট জেলাগুলো থেকে প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন কালের কণ্ঠ’র নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা] 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা