kalerkantho

সোমবার । ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ১ পোষ ১৪২৬। ১৮ রবিউস সানি                         

‘আমার পছন্দের শাড়ি পরে এ্যানি ডিউটিতে যাচ্ছিল’

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘আমার পছন্দের শাড়ি পরে এ্যানি ডিউটিতে যাচ্ছিল’

সবে মাত্র বড় ছেলের জেএসসি পরীক্ষা শেষ হলো। কয়েক দিন পর চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া ছোট ছেলের বার্ষিক পরীক্ষা। গতকাল রবিবার থেকে শুরু হওয়া প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষায় তাদের মা এ্যানি বড়ুয়ার সহকারী হল সুপারের দায়িত্ব পড়ে পটিয়া সরকারি প্রাথমিকের একটি কেন্দ্রে। ঘটনার দিন সকালে কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হয়েছিলেন এ্যানি, কিন্তু কেউ কি জানত সেই যাত্রাই তাঁর শেষ যাত্রা হতে যাচ্ছে! 

বাসা থেকে বের হয়ে কিছুটা এগিয়েছিলেন মাত্র এ্যানি। এ সময় পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোডে গ্যাসলাইনের রাইজার বিস্ফোরণে পাশের দেয়ালধসে ঘটনাস্থলেই মর্মান্তিক মৃত্যুর মুখে পড়েন প্রধান শিক্ষক এ্যানি বড়ুয়া। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পাশে লাশঘরে রাখা ছিল এ্যানির মরদেহ। দুপুরবেলা সেখানে তাঁর স্বামীসহ স্বজনদের বুকফাঁটা আর্তনাদে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। 

এ্যানি বড়ুয়ার স্বামী চট্টগ্রাম পিডিবির শিকলবাহা নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ বড়ুয়া বলেন, ‘আজকের পিএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন ডিউটিতে কোন শাড়ি পরবে তাকে আমি ঠিক করে দিয়েছি। আমার পছন্দের শাড়ি পরে এ্যানি ডিউটিতে যাচ্ছিল। বাসা থেকে সে আগে বের হয়, আমি একটু পরে বের হচ্ছিলাম। এর মধ্যে শুনি এই দুর্ঘটনার খবর। মুহূর্তেই আমাদের সাজানো গোছানো সংসার শেষ!’

তিনি আরো বলেন, ‘এ্যানি সাধারণত কোতোয়ালি মোড় দিয়ে স্কুলে যায় না। আরেক সহকর্মীর সঙ্গে পরীক্ষার ডিউটিতে যাওয়ার জন্য আজকে কোতোয়ালি মোড় এলাকার (ঘটনাস্থলের দিকে) দিকে গিয়েছে, গাড়িতে ওঠার জন্য। কিন্তু তাঁর এ যাওয়া যে শেষ যাওয়া হবে তা জানতাম না। আমি এখন দুই ছেলে নিয়ে কী করব। কারা দেখবে আমার ছেলেদের? কে স্কুলে নিয়ে যাবে?’

পরিবারের সদস্যরা জানায়, পটিয়া মেহেরআটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন এ্যানি। গতকাল থেকে শুরু হওয়া পিইসি পরীক্ষায় তাঁর দায়িত্ব ছিল পটিয়ার পূর্বজিরি আমানিয়া লোকমান হাকিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী হল সুপারের। স্বামী এবং দুই সন্তান অভিষেক ও অভিজিৎকে নিয়ে নগরের পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোডে ভাড়া বাসায় থাকতেন এ্যানি। তাঁদের গ্রামের বাড়ি পটিয়ার মৌলভীহাট এলাকার উনাইনপুরায়।

‘নুরুলের এক বছর বয়সী মেয়ে জান্নাতের কী হবে’ 

দুই বছর আগে রংমিস্ত্রি নুরুল ইসলাম (২৮) বিয়ে করেছেন। কক্সবাজারের উখিয়া থেকে চট্টগ্রাম নগরে এসে রঙের কাজ করে তাঁর পরিবার চলত। গতকাল রবিবার নগরের পাথরঘাটায় গ্যাস লাইনে বিস্ফোরণ-দেয়াল ধসের ঘটনায় একমাত্র উপার্জনকারী নুরুল ইসলামকে হারিয়ে পরিবারে শোকের মাতম চলছে। বড় প্রশ্ন—কী হবে এখন তাঁর এক বছর বয়সের কন্যাসন্তানের?

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের লাশঘরের পাশে স্ত্রী সাদিয়াসহ পরিবার-স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। এক বছর বয়সী মেয়ে মিফতা জান্নাত কান্নায় ভেঙে পড়া মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে অবোধ দৃষ্টিতে।

সাদিয়াদের বাসা নগরের নতুন ব্রিজ (শাহ আমানত সেতু) এলাকার বাস্তুহারা কলোনিতে। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বললেন, ‘আজকে (গতকাল) সকাল ৭টার দিকে বাসা থেকে বেরিয়ে কাজে আসছিল সে। এখানে (হাসপাতালে) এসে দেখি আমার স্বামী নেই। আমার পরিবারের এখন কী হবে?’

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নিহত নুরুল ইসলামের বন্ধু মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমরা পাঁচজন একসঙ্গে রঙের কাজ করি। ঘটনাস্থলের পাশে একটি বাড়িতে কাজ করার জন্য সবাই আসতেছিলাম। আমরা আগে দুজন চলে আসছি। পেছনে দুজন ছিল। নুরুল ইসলাম মাঝে ছিল। দুর্ঘটনায় নুরুল ইসলাম মারা গেছে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা