kalerkantho

সোমবার । ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ১ পোষ ১৪২৬। ১৮ রবিউস সানি                         

নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরে নানা বাধা

পার্থ সারথি দাস   

১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরে নানা বাধা

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ কার্যকর করতে চাইলেও তাতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। তাঁরা পরিবহন ধর্মঘট ডেকে সরকারকে জিম্মি করে আইনের বিভিন্ন ধারা সংশোধন করতে চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন। এরই মধ্যে নতুন আইনে জরিমানা আদায় করা হচ্ছে—এমন অপপ্রচার চালিয়ে কয়েকটি জেলায় ধর্মঘট, কর্মবিরতি ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন শ্রমিকরা।

এ ছাড়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) আইন বাস্তবায়নে জরুরি বিধিমালা তৈরি করতে পারেনি। মামলা করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত পজ মেশিনও হালনাগাদ করতে পারেনি ট্রাফিক পুলিশ। এসব বাধা ছাড়াও আইন বাস্তবায়নে সহায়ক জনবল সংকটও রয়েছে বিআরটিএর।

এ অবস্থায় গতকাল থেকেই নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সকালে রাজধানীর কুড়িলে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এ ঘোষণা দেন।

এর আগে আইনটি কার্যকর করার কথা ছিল গত ১ নভেম্বর থেকে। এ জন্য গত ২২ অক্টোবর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। এর পর দুই দফা ঘোষণা দিয়ে দুই সপ্তাহের জন্য আইন কার্যকর স্থগিত রাখা হয়। কিন্তু পরিবহন মালিক সংগঠনের নেতারা দুই মাস পর এ আইন কার্যকরের আবেদন জানিয়েছেন।

সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘অবকাঠামো নির্মাণে এগিয়ে থাকলেও সড়কে শৃঙ্খলা আনাই বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা পরিবহন আইন বাস্তবায়ন করতে চাইলেও পরিবহন শ্রমিকরা ধর্মঘট ডাকাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়েছিল। আমরা সেটি মোকাবেলা করেছি।’ নতুন আইনে বেশি জরিমানার ভয়ে অনেকে আইন মানবেন, সড়কে শৃঙ্খলা আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বিআরটিএর চেয়ারম্যান ড. কামরুল আহসান গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন আইনের আওতায় শাস্তি ও জরিমানার জন্য তফসিলভুক্ত করার প্রজ্ঞাপন আজ (রবিবার) হয়েছে। আমরা সোমবার থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে পারব।’

প্রসঙ্গত নতুন আইনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হলে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তফসিলভুক্ত করার নিয়ম রয়েছে।

বিধিমালা প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে জানিয়ে বিআরটিএর চেয়ারম্যান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশ করতে হবে। তার জন্য আরো কিছুদিন সময় লাগবে।’

নতুন আইনে ভুল স্থানে পার্কিংয়ের জন্য আগের আইনের চেয়ে ১০ গুণ বেশি জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু ঢাকার পার্কিং নীতিমালাও দেড় বছরে অনুমোদন হয়নি। আইন হওয়ার পর সেবাগ্রহীতারা ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস সনদসহ বিভিন্ন সেবার জন্য বিআরটিএর কার্যালয়গুলোতে ভিড় করছেন। তবে জনবল সংকটসহ বিভিন্ন কারণে সেবা ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হচ্ছে। বিআরটিএতে জনবল আছে ৮২৩ জন। এর সঙ্গে আরো দুই হাজার ২৫০ জন জনবল বাড়ানোর প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিআরটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের পদ আছে ১৩টি। কিন্তু বর্তমানে ১১ জন কাজ করছেন।

ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশ আইন কার্যকর করতে নগরীর বিভিন্ন স্থানে আইনে বর্ণিত অপরাধ ও এর জন্য দণ্ড ও জরিমানাসংবলিত বিলবোর্ড টানিয়েছে। এ ছাড়া চারটি ট্রাফিক বিভাগের সংশ্লিষ্ট এক হাজার কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। উপযোগী পজ মেশিন আনতে দেরি হবে বলে আপাতত স্লিপের মাধ্যমেই নতুন আইনে মামলা ও জরিমানা করার প্রস্তুতি নিয়েছে ট্রাফিক পুলিশ। নতুন আইন পুরোপুরি প্রয়োগ করতে আরো এক সপ্তাহ লাগতে পারে বলে একাধিক ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজউদ্দিন আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ কালের কণ্ঠ’র কাছে আইন বাস্তবায়নে সড়কমন্ত্রীর সর্বশেষ ঘোষণার বিষয়টি (গতকাল থেকে আইন প্রয়োগের) অবহিত হয়ে তিনি বলেন, ‘আমি তাহলে খোঁজ নিচ্ছি। এখনো নতুন আইনে আমরা মামলা ও জরিমানা করা শুরু করিনি।’

পরিবহন নেতারা বলছেন, ড্রাইভিং লাইসেন্স সরবরাহ করতে পারছে না বিআরটিএ। ফিটনেস সনদ হালনাগাদসহ বিভিন্ন সেবা যথাসময়ে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে যারা আইন মানতে কাগজপত্র পেতে চায় তাদের তা সংগ্রহ করতে সময় দিতে হবে। না হলে জরিমানার ভয়ে গণপরিবহন রাস্তায় কম বের হবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতউল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা নতুন আইন বাস্তবায়নে সহায়তা করতে চাই। তবে তা ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা উচিত।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি বিভিন্ন জেলায় যোগাযোগ করে বলেছি, ধর্মঘট আহ্বান না করতে।’

বাংলাদেশ বাস-ট্টাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘আমরা সড়ক মন্ত্রণালয়ে দুই মাস পর আইন প্রয়োগের আবেদন জানিয়েছি। কারণ নতুন আইনের বিষয়ে মালিক-শ্রমিকদের আরো সচেতন হতে হবে। এ ছাড়া বিআরটিএতে যথাসময়ে সেবা পাচ্ছি না। এ জন্য সময় বাড়ানো দরকার।’

পরিবহন ধর্মঘট : গত শনিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বগুড়ায় বাস বন্ধ রাখে স্থানীয় পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন। ছয় রুটে বাস চলাচল বন্ধ রাখেন চালক-শ্রমিকরা। জরিমানা করা হবে না বলে পুলিশ আশ্বাস দিলে সন্ধ্যায় বাস চলাচল শুরু হয়। একই দিন কুষ্টিয়ায় ট্রাকচালকরা ধর্মঘট পালন করেন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন সূত্রে জানা গেছে, ফেডারেশন আসছে ২১ ও ২২ নভেম্বর ঢাকায় বৈঠক করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নতুন আইন বাস্তবায়নের অংশীজন হিসেবে পরিবহন শ্রমিকরা তাঁদের দাবি ও সিদ্ধান্ত তুলে ধরবেন এ বৈঠকে।

ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, নতুন আইনের কারণে শ্রমিকরা আতঙ্ক রয়েছেন।

কর্মবিরতি ও মানবন্ধন : নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনসহ ১০ দফা দাবিতে যশোরে গতকাল পরিবহন শ্রমিকরা ১৮ রুটে বাস চালাননি বলে জানিয়েছে আমাদের যশোর অফিস। জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোর্তজা হোসেন বলেন, পরিবহন শ্রমিকদের এ কর্মরিবতি অনির্দিষ্টকাল চলবে। ইউনিয়নের সভাপতি মামুনূর রশীদ বাচ্চু বলেন, ‘ফাঁসির দড়ি নিয়ে শ্রমিকরা কাজ করতে রাজি না বলে তারা কর্মবিরতি শুরু করেছে।’

হিলি প্রতিনিধি জানান, নতুন আইন সংশোধনের দাবিতে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর থেকে গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো হিলি-বগুড়া রুটে যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ রাখেন পরিবহন শ্রমিকরা।

নড়াইল প্রতিনিধি জানান, শাস্তি কমানোসহ ১১ দফা দাবিতে নড়াইলে পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ গতকাল সকালে নড়াইল প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে।

নতুন আইনে মামলা ও জরিমানা হচ্ছে : রংপুর অফিস জানায়, নতুন সড়ক আইনে ১৬ দিনে রংপুর মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ দুই হাজার ৬৬২টি মামলা করেছে। প্রাথমিকভাবে জরিমানা কম করা হচ্ছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা