kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

তিন দিনেই ‘লড়াই’ শেষ!

সামীউর রহমান. ইন্দোর থেকে   

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



তিন দিনেই ‘লড়াই’ শেষ!

সকালের সেশনের খেলা এক ঘণ্টা পেরোতে না পেরোতেই ল্যাপটপে বিমানের টিকিট বুকিং সাইটে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন অনেক সাংবাদিক। তিন দিনেই শেষ হয়ে যাচ্ছে ইন্দোর টেস্ট, কলকাতায় দ্বিতীয় টেস্টের আগে মধ্য প্রদেশের এই শহরে পড়ে থাকার কোনো মানে হয় না ভেবেই দিল্লি-মুম্বাইয়ের সাংবাদিকরা ফেরার ফ্লাইট খুঁজছেন। প্রথম ঘণ্টাতেই ৪ উইকেটে ৪৪ হয়ে গিয়েছে বাংলাদেশ; এখান থেকে ভি ভি এস লক্ষ্মণ, বেন স্টোকস ও ব্রায়ান লারা—তিনজন এসে ব্যাট ধরলেও যে জেতাটা অসম্ভব!

প্রেসবক্সের কাচের দেয়ালের এপার থেকে দেখা যাচ্ছিল ছন্নছাড়া ব্যাটিং। স্কিল, টেম্পারামেন্ট, কোনো কিছুর বালাই নেই, মুশফিকুর রহিম বাদে কারো ব্যাটে নেই এতটুকুও আত্মনিবেদন ও দায়িত্বশীলতার ছোঁয়া। টেস্ট অভিষেকের দুই দশক পরেও হতশ্রী চেহারার ব্যাটিং। দক্ষতার, অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকতেই পারে; কিন্তু আত্মনিবেদনের জায়গাটায় কম পড়া মানে তো নিজেকেই ফাঁকি দেওয়া!

সকালের শিশিরভেজা উইকেটের সুবিধা নিতে, রাতভর ঘুমিয়ে সতেজ হয়ে ওঠা বোলারদের গতকাল ফের মাঠে নামিয়ে দিলেন বিরাট কোহলি। উমেশ যাদব দ্বিতীয় দিন শেষে ফিরেছিলেন নট আউট ব্যাটসম্যান হিসেবে, মাঠে নামলেন নতুন বলের দ্বিতীয় বোলার হয়ে। এবারও বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের ড্রেসিংরুমে ফেরার রাস্তাটা চিনিয়েছেন ইমরুল কায়েস। উমেশ যাদবের অফস্টাম্পে পড়া একটি বলে গাঁইতির মতো ব্যাট চালিয়ে ভেতরে টেনে এনে ইনসাইড এজ হয়ে বোল্ড ইমরুল। মমিনুল এসে দ্বিতীয় বলেই একটি বাউন্ডারি মেরে রানের খাতা খুললেও পরের বলে লেগ বিফোর উইকেটের জোরালো আবেদনে বেঁচে যান। রিভিউ নিয়ে প্রথম দফা মমিনুলকে থামাতে পারেনি ভারত, পরে অবশ্য রিভিউতেই বিদায় অধিনায়কের। মাঠের আম্পায়ার এলবিডাব্লিউ দেননি, বিরাট কোহলি ডিআরএস ডাকলে টিভি আম্পায়ার রিপ্লে দেখে সংকেত দেন আউটের। তার আগে অবশ্য ঈশান্ত শর্মার দারুণ এক ডেলিভারিতে বিদায় নিয়েছেন সাদমান ইসলামও। ৩৪৩ রানের লিড নিয়ে দান ছেড়েছিলেন কোহলি, বাংলাদেশ ৪৪ রান তুলতেই ৪ উইকেট হারিয়ে ফেলায় ম্যাচকে ঘিরে সব অনিশ্চয়তা সেখানেই সমাপ্ত।

এ রকম পরিস্থিতিতে যেটা হয়, কেউ একজন রুখে দাঁড়ান। সম্মান বাঁচানোর লড়াইয়ে মধ্যযুগীয় নাইটদের মতো একাই লড়ে যান। কাল সেই ভূমিকায় মুশফিকুর রহিম। সঙ্গী হিসেবে খানিকটা সময় পেয়েছেন লিটন কুমার দাসকে। তৃতীয় দিনের দুপুরের উইকেট, তখনো ভাঙন ধরেনি। লিটনের ব্যাট থেকে সুন্দর সব শট বেরিয়ে আসছে। মুশফিকও খেলছেন স্থিরতার প্রতীক হয়ে। এই জুটিতে চলে আসে ৬৩ রান। এরপর হঠাৎই ছন্দঃপতন। উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে এসে মারতে চেয়েছিলেন লিটন, বেশ জোরের ওপরই মেরেছিলেন। বলটা চলে গিয়েছিল একদম রবিচন্দ্রন অশ্বিনের মুখসোজা। চোখের পলকে যেভাবে রিটার্ন ক্যাচটি লুফে নিলেন অশ্বিন, তাতে বাহবা দিতেই হয় তাঁকে। ৩৯ বলে ৩৫ রান, ৬টি বাউন্ডারিতে। লিটন দাসের ইনিংসটা মহাকালের কাছে হয়তো বিশেষ কিছু নয়, তবে ভারতের এই শক্তিশালী লাইনআপের বিপক্ষে প্রথম প্রতিরোধের গল্প তো বটেই। মেহেদী হাসান মিরাজ বল হাতে ব্যর্থ, ব্যাট হাতে সেটাই যেন খানিকটা পুষিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা। মুশফিকের সঙ্গে সপ্তম উইকেট জুটিতে যোগ করলেন ৫৯ রান। প্রথম বলেই ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়ে মিরাজ সংগত দিয়ে মুশফিককে তাঁর প্রাপ্য হাফসেঞ্চুরিটা পাইয়ে দিয়েছেন। ১০১ বলে অর্ধশতক পূর্ণ করেন মুশফিক, অন্যপাশে মিরাজের রান তখন ১৯। একটা সময় মনে হচ্ছিল, এই দুজন মিলে হয়তো দ্বিতীয় দিনটা পার করে দেবেন। চা বিরতিতে মুশফিক ৫৩ রানে অপরাজিত, মিরাজ ৩৮ রানে।

কিন্তু চা খেয়ে চাঙ্গা হয়ে আসা উমেশ যাদব প্রথম ওভারের পঞ্চম বলেই উড়িয়ে দিলেন মিরাজের স্টাম্প। বলটা একটু বাড়তি লাফিয়েছিল, মিরাজের গ্লাভসে লেগে ঢুকে গেল ভেতরে। ইন্দোর টেস্টের ড্রপসিন ওখানেই পড়ে গেছে। বাকিটা আসলে বাংলা সিনেমায় শেষ দৃশ্যে পুলিশের আসার মতো অবশ্যম্ভাবী। তাইজুল ক্যাচ দিলেন উইকেটের পেছনে, মিড অফে দুর্দান্ত ক্যাচ ধরে ৬৪ রানে মুশফিককে থামালেন চেতেশ্বর পূজারা আর অশ্বিনকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে যাদবের হাতে ক্যাচ দেন এবাদত। ৬৯.২ ওভারে ২১৩ রানে অল আউট বাংলাদেশ, তৃতীয় দিনের খেলা শেষ হতে তখনো ঘণ্টা দেড়েক বাকি।

ম্যাচ শুরুর আগে খুব কথা হচ্ছিল, দক্ষিণ আফ্রিকার চেয়ে ভালো করতে পারে বাংলাদেশ। উপমহাদেশের দল, স্পিন খেলায় ভালো দখল ইত্যাদি ইত্যাদি। বাস্তবে খেলা মাঠে গড়াতে বোঝা গেল, প্রাণবন্ত উইকেটে জোরে বোলিং খেলার সামর্থ্য এই দলের বেশির ভাগেরই নেই। আর বাংলাদেশের স্পিনাররা মিরপুরের কালো মাটির উইকেটে, যেখানে বল হাঁটুর উপরে ওঠে না এবং প্রায়ই নিচু হয়; এ রকম জায়গায় বল একসুতো না ঘুরিয়েও উইকেট পেতে পারেন। তবে ভারতের ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে এ রকম স্পিন বোলিং করা মানে সিংহের খাঁচায় খালি হাতে ঢুকে পড়া। একরত্তিও ছাড় দেবে না প্রতিপক্ষ। যেমনটা দেননি ম্যাচসেরা মায়াঙ্ক আগরওয়াল। কাল যেমন ম্যাচ শেষে ভারতের ব্যাটিং কোচ বিক্রম রাঠোর এসে বলছিলেন, ‘ও অনেক দিন ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে অনেক অনেক রান করে এখানে এসেছে। বড় বড় সব ইনিংস খেলেছে। এখানে এসে সে তো রানের ক্ষুধা মিটিয়ে প্রমাণ করতে চাইবেই।’ অস্ট্রেলিয়া সফরে অভিষেকে ভালো দুটি ইনিংস ছিল মায়াঙ্কের। দেশে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজে ২১৫ ও ১০৮ রানের ইনিংসের পর বাংলাদেশের বিপক্ষে ২৪৩ রানের ইনিংস বেঙ্গালুরুর এই ব্যাটসম্যানের। যে রানটা দুটো ইনিংসে একবারের জন্যও পুরো বাংলাদেশ দল মিলেও করতে পারেননি। তাই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানের জায়গা থেকে হয়তো শিখর ধাওয়ানকে আপাতত সরিয়েই দিলেন বীরেন্দর শেবাগকে আদর্শ মানা মায়াঙ্ক। ম্যাচসেরা পুরস্কারটা উঠেছে তাঁর হাতেই।

আগেভাগেই ম্যাচ শেষ হয়ে গেলেও ইন্দোর ছাড়ছেন না ক্রিকেটাররা। ভারতীয় দল আজ অনুশীলন করবে গোলাপি বলে। ইন্দোরে দুই দিনের ‘ছুটি’তে বাংলাদেশও অনুশীলন করবে গোলাপি বলে। তবে আজ ক্রিকেটারদের মন থাকবে ঢাকার র‌্যাডিসন হোটেলে, বিপিএলের প্লেয়ার্স ড্রাফট। টেস্টের চেয়ে সীমিত ওভারের বিশেষ করে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে ক্রিকেটারদের বাড়তি মনোযোগের অনুযোগ তো আর নতুন কিছু নয়ও!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা