kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

ফেলে দেওয়া পেঁয়াজ নিয়ে সমালোচনা

খাতুনগঞ্জ বাজারে ফের অভিযান

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম    

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



খাতুনগঞ্জ বাজারে ফের অভিযান

চট্টগ্রামে পচে যাওয়া পেঁয়াজ ফেলে দেওয়া হয়েছে কর্ণফুলীতে। সেখান থেকে সেগুলো কুড়িয়ে নিচ্ছে লোকজন। আকাশছোঁয়া দামের পেঁয়াজের এমন পরিণতি কেন তা নিয়ে কৌতূহলী প্রশ্ন সবার। ছবি : কালের কণ্ঠ

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি পেঁয়াজের বাজারে ফের অভিযান চালিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। জেলা প্রশাসনের দুজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যৌথভাবে গতকাল শনিবার দুপুরে এই অভিযান চালান। অভিযানের সময় দামের তালিকা না পেয়ে এক আড়তদারকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

খাতুনগঞ্জে একের পর এক অভিযান চালানোর কারণে সব পেঁয়াজ এখন রিয়াজ উদ্দিন বাজারে চলে গেছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা এখন রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকেই পেঁয়াজ কিনছেন।

অভিযানে খাতুনগঞ্জে দিনভর প্রতি কেজি ২২০ টাকা থেকে ২৫০ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি হলেও জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটদের সামনে দাম কমিয়ে দেওয়া হয় প্রায় ১০০ টাকা। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সামনে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রির কথা জানিয়েছেন পাইকারি বিক্রেতারা।

খাতুনগঞ্জে যৌথভাবে অভিযান চালান জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুস সামাদ শিকদার ও গালিব চৌধুরী। গালিব চৌধুরী জানান, খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঘুরে তাঁরা ভালো মানের মিয়ানমারের পেঁয়াজ ১৫০ টাকা থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হতে দেখেছেন। আর মিয়ানমারের কিছুটা নিম্নমানের পেঁয়াজ এবং তুরস্ক-মিসর থেকে আসা পেঁয়াজ ৮৫ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হতে দেখেছেন।

তবে গতকাল দুপুরে নগরীর খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন মার্কেটে মিয়ানমারের পেঁয়াজ প্রতি কেজি ২২০ থেকে ২৫০ টাকা দরে এবং তুরস্ক-মিসরের পেঁয়াজ ২০০ থেকে ২১০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবারও মিয়ানমারের পেঁয়াজ ১৬০ টাকা থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল খাতুনগঞ্জে।

এদিকে মিয়ানমার থেকে আসা অন্তত ১৫ টন পেঁয়াজ চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি আড়তের পাশে থাকা চাক্তাই ও কর্ণফুলী নদীর পারে ফেলে দেওয়া নিয়ে তুমুল সমালোচনা চলছে। নদীর পারে দুর্গন্ধ ছড়ানোর খবর পেয়ে পচা পেঁয়াজগুলো সরিয়ে সিটি করপোরেশনের আবর্জনাগারে নিয়ে যান পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার রাতে এ কাজটি করে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।

বাংলাদেশে পেঁয়াজ যখন রেকর্ড দরে বিক্রি হচ্ছে; ঠিক সেই সময়ে পচে যাওয়া পেঁয়াজ নদীতে ফেলে দেওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বেশির ভাগ মন্তব্য হচ্ছে অতিরিক্ত মুনাফার লোভে গুদামজাত করতে গিয়ে আড়তেই এসব পেঁয়াজ পচে গেছে। বলা হচ্ছে, ‘অতি মুনাফার লোভে আম-ছালা দুটোই গেল ব্যবসায়ীর।’

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদারকির অভাবে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা মজুদদারির সুযোগ নিয়েছেন। মজুদের মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি করে বাড়তি মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছেন তাঁরা। মজুদ করা যেসব পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারেনি, পচে গেছে, সেগুলো এখন ভাগাড়ে ফেলা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাইয়ের পাইকারি আড়তে প্রতিদিনই পচা পেঁয়াজের খোঁজ মিলছে। এসব পচা পেঁয়াজের বেশির ভাগই মিয়ানমার থেকে আসা। পচা পেঁয়াজের বস্তাগুলো আড়তের সামনে রাখা হয়, নামমাত্র দামে সেগুলো কিনে নিয়ে যায় একশ্রেণির ব্যক্তি। কর্ণফুলী নদীর পারে নিয়ে বস্তা খুলে সেখান থেকে কম পচে যাওয়া পেঁয়াজ বাছাই করা হয়। এরপর নদীর পানিতে ধুয়ে রোদে শুকানো হয়। এসব পেঁয়াজ আরো কিছু ভালো পেঁয়াজের সঙ্গে মিশিয়ে কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকা দরে নগরীর বিভিন্ন হোটেলে সরবরাহ করা হচ্ছে।

পেঁয়াজ পচে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জ কাঁচা পণ্য আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, আড়তগুলোতে প্রতিদিনই পচা পেঁয়াজ ফেলে দেওয়া হয়। কারণ পচা পেঁয়াজ খাওয়া যায় না। বৃহস্পতিবার রাতে অনেক বস্তা ফেলে দেওয়া হলেও কিছু বস্তা আড়তের সামনে রয়ে যায়। গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ট্রাক নিয়ে সেগুলো সরিয়ে নেন।

তিনি বলেন, পেঁয়াজের দামে রেকর্ড হওয়ার পর থেকে কেউ কেউ বস্তাভর্তি পচা পেঁয়াজ নামমাত্র দামে কিনে নিয়ে যায়; সেখান থেকে কম পচা পেঁয়াজ বাছাই করে বিক্রি করে। কিন্তু আড়তে তো সেটা সম্ভব নয়। আড়তে পচা পেঁয়াজ থাকলেই খুচরা বিক্রেতারা দাম কম হলেও সেগুলো কেনেন না।

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাই থেকে প্রতিদিন এসব পচা পেঁয়াজ এবং অন্য আবর্জনা সরিয়ে নিয়ে যায় সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। সেদিন কী হয়েছিল জানতে চাইলে ৩৫ নম্বর বক্সিরহাট ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাজি নুরুল হক বলেন, ‘আমাদের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা প্রতিদিনই আবর্জনা পরিষ্কার করেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে পচা বস্তার পরিমাণ বেশি হওয়ায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় খাতুনগঞ্জ থেকে আড়তদাররা ফোন করেন আমাকে। আমি তাৎক্ষণিক তিনটি ট্রাক পাঠিয়ে সেগুলো রাতেই সিটি করপোরেশনের আবর্জনার ভাগাড় আরেফিন নগরে পাঠিয়ে দিই।’ 

বৃহস্পতিবার পচে যাওয়ার পরিমাণ বেশি হয়েছে কেন জানতে চাইলে হামিদ উল্লাহ মার্কেটের আড়তদার আবসার উদ্দিন বলছেন, রেকর্ড দামে এখন পেঁয়াজ খুচরা দোকানে বিক্রি হচ্ছে। কেউ একটি পেঁয়াজ ইচ্ছা করে পচিয়ে ফেলবে সেটা কল্পনাই করা যায় না। মূলত মিয়ানমার থেকে আসা পেঁয়াজ এক মাস ধরেই পচা পড়ছে। এক বস্তায় ২০-২৫ শতাংশ পেঁয়াজই পচা থাকছে। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ের কারণে কয়েক দিন এই পচে যাওয়ার পরিমাণ বেশি হয়েছে।

এদিকে দুই দিন ধরে কর্ণফুলী নদীর ফিরিঙ্গিবাজার এলাকা, চাক্তাই এলাকায় বেশ কিছু পেঁয়াজ রোদে শুকাতে দেখা গেছে। বস্তাভর্তি পচা পেঁয়াজ খুলে একদল লোক নদীর পানিতে প্রথমে সেগুলো ধুয়ে নিচ্ছে। সেখান থেকে কম পচা পেঁয়াজ বাছাই করে দুই দিন রোদে শুকাতে দিচ্ছে। দুর্গন্ধ চলে যাওয়ার পর সেগুলো নগরীর হোটেলগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে । আবার অনেকেই ভ্যান গাড়িতেও বিক্রি করছে।

পেঁয়াজ ধোঁয়ার কাজে নিয়োজিত শিশুশ্রমিক আনিস বলে, ‘প্রতিদিন প্রতি বস্তা পেঁয়াজ পানিতে ধুয়ে দিলে ৫০ টাকা পাই। এরপর মাটিতে রেখেই রোদে শুকানো হয়। পরে আবার বস্তাভর্তি করে নিয়ে যায় আমার মালিক। কিন্তু কোথায় সেগুলো নেওয়া হয় সেটা জানি না।’

ব্যবসায়ীরা জানান, মিয়ানমার থেকে শুক্রবার ১৬৮ টন পেঁয়াজ খাতুনগঞ্জে এসেছে। গতকাল দুপুর পর্যন্ত এসেছে ৭০ টন। শনিবার খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি মিয়ানমারের ভালো পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছিল ২২০ টাকায়। কিছুটা নিম্নমানের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা