kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

কসবায় ট্রেন দুর্ঘটনা

পঙ্গুতে চিকিৎসাধীন রোগীদের চোখে এখনো অন্ধকার

পা হারাতে পারেন একজন!

জহিরুল ইসলাম   

১৬ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পঙ্গুতে চিকিৎসাধীন রোগীদের চোখে এখনো অন্ধকার

দুপুরের আলোতেও তাঁদের চোখে যেন নিকষ কালো অন্ধকার! নিয়তির কাছে সজল চোখে হয়তো তাঁদের জানতে চাওয়া, আমাদের সঙ্গেই কেন? অসুস্থ শরীরে নিজের ব্যথা অনুভব করার সুযোগও নেই তাঁদের। কেউ হারিয়েছেন আদরের বোনকে, কেউ কন্যাশিশুকে; কারো কারো ভাই-বোন, মা, আত্মীয়-স্বজন চিকিৎসা নিচ্ছেন হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে (পঙ্গু হাসপাতাল) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের এই চিত্র মেলে।

ওই দুর্ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ১৩ জন। এ ছাড়া অবস্থার অবনতি হওয়ায় সুমি (২০) ও মিতু আক্তার (২৩) নামে দুজনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পঙ্গুতে চিকিৎসাধীন আবুল কালাম আজাদের অবস্থা অন্যদের চেয়ে বেশি গুরুতর। তাঁর পরিবারের প্রার্থনা, যাতে আজাদের পা কাটতে না হয়। তাঁর স্ত্রী বেনুয়া বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পাহানে কেমন রড লাগাইয়া রাখছে। ডাক্তার কইছে, বড় অপারেশন লাগবো। আল্লাহ যেন আমার স্বামীর পা দুইখান ঠিক রাহে। হুনছি, বেশি সমস্যা হইলে নাকি কাইটা ফালাইতে হয়।’

পঙ্গুতে ভর্তি রোগীদের বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক মো. আবদুল গনি মোল্লা বলেন, ‘চিকিৎসাধীন অনেকেরই ঠিক হতে সময় লাগবে। আবুল কালাম নামে ওই রোগীর অবস্থা অন্যদের চেয়ে খারাপ। তবে এখন পর্যন্ত পা কাটা বা অন্য কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ট্রেন দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার জন্য আমরা সাত সদস্যের একটা বোর্ড করে দিয়েছি। বোর্ডের সদস্যরা রোগীদের অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নেবে।’

পঙ্গু হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, চাঁদপুরের রোজিনা আক্তারের পরিবারের পাঁচ সদস্য একেকজন একেক ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন। রোজিনার চিকিৎসা চলছে দ্বিতীয় তলার মহিলা ওয়ার্ডের ৬৩ নম্বর বেডে। তাঁর পাশে কেউ নেই। সবাই আহত হওয়ায় হতাশায় সময় কাটছে তাঁদের। দুই শয্যা আগে ৬১ নম্বর বেডে চিকিৎসা চলছে রোজিনার ভাইয়ের স্ত্রী শাহীদা বেগমের। দুজনের সঙ্গে আছেন ভাতিজি ফাতেমা আক্তার (২০)। মোবাইল ফোনের পর্দায় কী দেখে যেন চোখ ভেজাচ্ছিলেন। সামনে যেতেই দেখা মিলল দুর্ঘটনায় নিহত ফারজানা আক্তারের (১৬) মা রোজিনা বেগমের। তিনি বলেন, ‘এই যে আমার মেয়ের ছবি।’ এরপরই শুরু করেন বিলাপ।

তিনি বলেন, ‘পুরা শরীর ব্যথা আছে, তয় বাবারে মনে ব্যথা থাকলে শইল্লে (শরীরে) ব্যথা দিয়ে কি হইব?। আমার জীবন চইল্লা গেছে, হেই কথা মনে হলে আর ব্যথা লাগে না। পোলা এক তলায় ভর্তি, মাইয়া নাই হইয়া গেছে, আত্মীয়-স্বজন একেকজন একেক জায়গায় মরার মতো পইড়া আছে। সব অন্ধকার লাগে। হেই রাইতের (ঘটনার রাত) অন্ধকার এখনো শেষ হয় নাই।’

একই ওয়ার্ডের ৫৩ নম্বর বেডে নাজমা আক্তার (৩০) শুয়ে অঝোরে চোখের পানি ঝরাচ্ছেন। তিনি হারিয়েছেন মেয়েকে। দুই পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে কাতরাচ্ছেন তিনি। বললেন, ‘পায়ে বেশি ব্যথা। দুই পা নাড়তে পারি না। আমার মেয়ে (সোহা) নাই! ছেলে নাফিজুল হকের (৪) হাতে ব্যান্ডেজ। স্বামীও (সোহেল) এই হাসপাতালে গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। জীবনে এমন অন্ধকার সময় আসবে, ভাবিনি কখনো।’

তৃতীয় তলায় গিয়ে পুরুষদের ওয়ার্ডে দেখা যায়, ৬৩ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছেন হবিগঞ্জের রাহান (১৩)। তাঁর দুই পায়ের হাড় ভেঙেছে। বাম পায়ে ভাঙা কাচ ঢুকেছে, যার জন্য ফের অপারেশন লাগবে। রাহানের বিপরীত পাশে ৬০ নম্বর শয্যায় চিকিৎসা নিচ্ছেন হবিগঞ্জ নারায়ণপুর এলাকার আবুল কালাম (৪৫)। দেখা যায়, ডান পায়ে রড লাগানো আর বাম পায়ে তার দিয়ে বেডের সঙ্গে টানা দেওয়া হয়েছে।

গত মঙ্গলবার রাত পৌনে ৩টার দিকে মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনে তূর্ণা নিশীথা ও উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। এতে ১৬ জন নিহত ও শতাধিক আহত হন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা