kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

আইসিসির দৃষ্টি মিয়ানমার সীমান্তে

জেনোসাইডসহ সব অপরাধ তদন্ত হবে

আইসিসি সদস্য অন্য রাষ্ট্রগুলোতেও অনুসন্ধান চালানোর সুযোগ

মেহেদী হাসান   

১৬ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জেনোসাইডসহ সব অপরাধ তদন্ত হবে

রোহিঙ্গাদের ওপর শুধু মানবতাবিরোধী অপরাধই নয়, রোম সংবিধির পঞ্চম অনুচ্ছেদে বর্ণিত অন্যান্য অপরাধ যেমন জেনোসাইড, যুদ্ধাপরাধ ও আগ্রাসনের তদন্তের অনুমতি দিয়েছে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (আইসিসি)। রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত হয়ে শুধু বাংলাদেশে আশ্রয় নয়, আইসিসির অন্য কোনো সদস্য রাষ্ট্রেও আশ্রয় নিতে বাধ্য হওয়ার মধ্য দিয়ে আইসিসিতে বর্ণিত অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকলে আইসিসির কৌঁসুলি প্রয়োজনে সেগুলোর তদন্ত করতে পারবেন। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আইসিসির কৌঁসুলিকে তদন্ত শুরুর অনুমতি দেওয়া সংক্রান্ত ৫৮ পৃষ্ঠার আদেশ ঘেঁটে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। 

আদেশে বলা হয়েছে, ‘যে পরিস্থিতির ভিত্তিতে আইসিসি তদন্ত শুরুর আদেশ দিয়েছে তার সঙ্গে সঙ্গে আইসিসির অন্য কোনো সদস্য রাষ্ট্র বা রোম সংবিধির ১২(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইসিসির সদস্য না হয়েও বিচারিক এখতিয়ার স্বীকারকারী কোনো রাষ্ট্রের কোনো অংশে এ ধরনের অপরাধের উপযুক্ত সম্পৃক্ততা থাকলে সেগুলোরও তদন্ত করা যাবে।’

আদালতের আদেশে আরো বলা হয়েছে, ‘আদালত আশা করে যে আইসিসির কৌঁসুলি বর্তমান পরিস্থিতিতে তার আবেদনে বর্ণিত ঘটনাগুলো তদন্তের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখবেন না। বরং তথ্য-প্রমাণ সাপেক্ষে অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধ বা আইসিসির রোম সংবিধির পঞ্চম অনুচ্ছেদে বর্ণিত অপরাধগুলোর ব্যাপারেও তদন্ত বিস্তৃত করতে পারবেন।’

আদালত তাঁর আদেশে বলেছেন, আইসিসির কৌঁসুলিকে এ ক্ষেত্রে বরং তদন্তের এখতিয়ার সীমাবদ্ধ  করে দেওয়াই অসংগতিপূর্ণ হবে। শুধু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিপীড়নই নয়, অতীতে নিপীড়নের অভিযোগগুলোর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির যোগসূত্র থাকলে সেগুলোরও তদন্ত করা যাবে।

আদেশের শেষাংশে আইসিসির কৌঁসুলিকে আদালত ভবিষ্যতে সম্ভাব্য বিচারের সময় সাক্ষ্য না পাওয়ার আশঙ্কা থাকলে এখনই সেগুলো সংরক্ষণের নির্দেশনা দিয়েছেন।

আইসিসির কৌঁসুলি ফাটু বেনসুডা গত বৃহস্পতিবার রাতে এক বিবৃতিতে তদন্ত শুরুর অনুমতিকে মিয়ানমারসহ বিশ্বের অন্যান্য স্থানে নিপীড়িতদের জন্য এক ইতিবাচক বার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এদিকে আইসিসির গত বৃহস্পতিবার এক রায়ে অনেকটাই পাল্টে গেছে পুরো দৃশ্যপট। আইসিসির ‘প্রিলিমিনারি ইনভেস্টিগেশন’ (প্রাক-অনুসন্ধান) তালিকা থেকে ‘সিচুয়েশনস আন্ডার ইনভেস্টিগেশন’ (চলমান তদন্ত পরিস্থিতি) তালিকায় চলে এসেছে ‘সিচুয়েশনস ইন বাংলাদেশ/মিয়ানমার’ (বাংলাদেশ/মিয়ানমার পরিস্থিতি)। আইসিসির অনুসন্ধান মানচিত্রে অনুসন্ধান এলাকা হিসেবে আইসিসির সদস্য রাষ্ট্র বাংলাদেশকে দেখালেও কৌঁসুলির দপ্তরের দৃষ্টি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দিকে। মিয়ানমার আইসিসির সদস্য না হওয়ায় এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমার পরিস্থিতি অনুসন্ধানের দায়িত্ব আইসিসিকে না দেওয়ায় প্রাথমিকভাবে ওই দেশটির ওপর আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার নেই। কিন্তু মিয়ানমার থেকে গণবাস্তুচ্যুতিসহ মানবতাবিরোধীসহ গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের শিকার হয়ে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার আইসিসির সদস্য রাষ্ট্র বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হওয়ায় আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে গত সপ্তাহটি ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ৫৭টি মুসলিম দেশের জোট ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) রোহিঙ্গা জেনোসাইডের দায়ে রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমারকে জবাবদিহি করাতে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিজে মামলা করেছে। আর্জেন্টিনার একটি আদালতে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর সু চিসহ শীর্ষ জেনারেলদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এরপর আইসিসি রোহিঙ্গা নিপীড়নের তদন্ত শুরুর অনুমতি দিয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে (মানবাধিকারবিষয়ক) ১৪০-৯ ভোটে রোহিঙ্গা নিপীড়নের নিন্দা ও নিপীড়নের বিচারের আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। বরাবরের মতো এবারও প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে মিয়ানমার, চীন, রাশিয়া, বেলারুশ, কম্বোডিয়া, লাওস ও ফিলিপাইন। অন্যদিকে ভারত, জাপান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুরসহ মোট ৩২টি দেশ প্রস্তাবের ‘পক্ষে’ বা ‘বিপক্ষে’ কোনো অবস্থান না নিয়ে ‘অ্যাবস্টেইন’ ভোট দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা বলেছেন, ওই দেশগুলোর বেশির ভাগ ‘কান্ট্রি স্পেসিফিক’ (সুনির্দিষ্ট দেশের নামে) প্রস্তাবের বিরোধিতা করার নীতি আছে। তবে প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া বা ‘অ্যাবস্টেইন’ ভোট দেওয়ার অর্থ এই নয় যে তারা রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চায় না।

এদিকে আইসিসির প্রাক-বিচারিক আদালত-৩ গত বৃহস্পতিবার আলাদা এক আদেশে মিয়ানমারের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করা তিন ব্যক্তি ও সংগঠনের আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁরা আইসিসির কাছে আবেদনে বলেছিলেন, রোহিঙ্গা পরিস্থিতি জটিল। এ বিষয়ে অনুসন্ধানের অনুমতি দেওয়ার আগে পরিস্থিতি সঠিকভাবে বোঝাতে তাঁরা ‘অ্যামিকাস কিউরি’ (বন্ধু আইনজীবী) হিসেবে আদালতকে সহযোগিতা করতে চান। তাঁরা কার্যত রোহিঙ্গাদের গণবাস্তুচ্যুতির কারণ অনুসন্ধান শুরু করতে আইসিসির কৌঁসুলির আবেদনের বিরোধিতা করেছিলেন।

প্রাক-বিচারিক আদালত-৩ মিয়ানমারের ওই তিন আবেদন খারিজ করে দিয়ে বলেছেন, আবেদনে যেসব যুক্তি দেওয়া হয়েছে তা আদালতকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করে না।

আইসিসির মুখপাত্র ফাদি এল আবদাল্লাহ গতকাল শুক্রবার এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, আইসিসি শুধু ব্যক্তিবিশেষের বিচার করতে পারবে। কোনো সদস্য রাষ্ট্র আইসিসির রোম সংবিধিতে বর্ণিত অপরাধের বিচারে অনিচ্ছুক বা ব্যর্থ হলে আইসিসি তার বিচারের উদ্যোগ নিতে পারে।

আইসিসির মুখপাত্র বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধের অনুসন্ধান চালানোর অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে আইসিসির প্রাক-বিচারিক আদালত-৩-এর বিচারকরা নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের এবং তাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো বক্তব্য আমলে নিয়েছেন।

আইসিসির গত বৃহস্পতিবারের আদেশে উল্লেখ আছে, আদালত মোট ৩৩৯টি বক্তব্য পেয়েছেন। এর মধ্যে ৩১১টি ছিল লিখিত আকারে। বাকি ২৮টি ছিল ভিডিও ফরম্যাটে।

জানা গেছে, আইসিসির কৌঁসুলি ফাটু বেনসুডাও শিগগিরই বাংলাদেশে আসছেন। আইসিসির কৌঁসুলির দপ্তর বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক অফিস খুলছে। এ ছাড়া সাক্ষী সুরক্ষাসহ বেশ কিছু ইস্যুতে তারা বাংলাদেশের সহযোগিতা চাইতে পারে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা