kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

‘ভাঙা ঘরে’ আলোর খোঁজে

সামীউর রহমান, ইন্দোর থেকে   

১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



‘ভাঙা ঘরে’ আলোর খোঁজে

দুই দশক আগের এক নভেম্বরেও মুখোমুখি হয়েছিল আজকের দুই প্রতিপক্ষ। সেদিন যে দুজন টস করতে নেমেছিলেন; আজ তাঁদের একজন ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি, অন্যজন বাংলাদেশের সংসদ সদস্য। জ্যেষ্ঠ সহকর্মীদের অনেকের ফেসবুক পেজে উঁকি দিচ্ছে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের স্মৃতি। কেউ ছবি দিচ্ছেন সেই ম্যাচের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ডের, বছর কুড়ি আগের সেই ছবিতে যাঁদের তারুণ্যের সতেজতা আজ তাঁদের চেহারায় অভিজ্ঞতা আর বয়সের ছাপ। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ যেন আটকে আছে সেই শৈশবেই! টিনএজ বয়স কাটিয়ে কুড়িতে পা দিয়েও, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে নিজেদের প্রথম ম্যাচটি খেলতে নামার আগেও ঠিক অভিষেক টেস্টের মতোই যেন অপ্রস্তুত বাংলাদেশ। সেদিন নাঈমুর রহমানের টেস্ট অধিনায়ক হিসেবেও হয়েছিল অভিষেক, আজ মমিনুল হকও যেকোনো ধরনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথমবার নামবেন টস করতে। গত দুই দশকে ভারত টেস্টের মাঝারি সারির দল থেকে উঠেছে শীর্ষে, অন্যদিকে বাংলাদেশ সীমিত ওভারের সাফল্যে বুঁদ হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটকে ক্রমশ উপেক্ষা করে করে আজও থেকে গেছে অপরিণতই।

টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তির ২০ বছর পূর্তির অল্প কিছুদিন আগে ধর্মঘটে যাওয়া ক্রিকেটারদের ১১ দফা দাবির গুরুত্বপূর্ণ একটি দাবি ছিল ঘরোয়া ক্রিকেটের ম্যাচ ফি বাড়ানো এবং সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম ম্যাচ খেলার আগে পুরো দল নিয়ে মাত্র দুটি দিন অনুশীলন করার সুযোগ পেয়েছেন মমিনুল হক, খেলার সুযোগ হয়নি স্থানীয় কোনো দলের বিপক্ষে একটি প্রস্তুতি ম্যাচও। দেশের অপরিণত প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় দু-তিনটি ম্যাচ খেলে এসেও ভারতের মাটিতে বিশ্বের এক নম্বর দলকে হারানোর দুঃসাহসী উচ্চারণ করতে হয় তাঁকে, “আমার মনে হয় না প্রস্তুতির কোনো ঘাটতি আছে। টেস্ট দলে যে আটজন খেলতে এসেছে (বাকিরা টি-টোয়েন্টি দলের অংশ হিসেবে এসেছেন আগেই) তারা সবাই অনেকগুলো চার দিনের ম্যাচ খেলে এসেছে। জাতীয় লিগে খেলেছে, এর আগে ‘এ’ দলের হয়ে খেলেছে। এমনকি আমি নিজেই গত পাঁচ-ছয় মাসে চার দিনের ম্যাচ খেলেছি। মুশফিক, রিয়াদ (মাহমুদ উল্লাহ) ভাইরাও খেলার মধ্যে আছেন। মানিয়ে নিতে কোনো সমস্যা হবে বলে আমি মনে করি না। সবাই খেলার মধ্যেই ছিল তাই ভালোভাবেই খাপ খাওয়াতে পারবে।” টেস্ট সিরিজের আগে না খেললেও মমিনুলের নেতৃত্বে বিসিবি একাদশ নামের একটি দল অবশ্য ভারতে মাসখানেক আগে একটি আমন্ত্রণমূলক টুর্নামেন্টে চারটি বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচ খেলে গিয়েছে। এ ছাড়া ‘এ’ দলের হয়ে শ্রীলঙ্কা সফরের দুটি ম্যাচও আছে মমিনুলের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে। উপমহাদেশের ভেতরেই খেলা, তাই ভারত ও শ্রীলঙ্কা সফরের সঙ্গে দেশে জাতীয় লিগের ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতার ওপরেই নির্ভর করছেন মমিনুল।

সাকিব আল হাসান নেই নিষেধাজ্ঞায়, তামিম ইকবাল নেই ব্যক্তিগত কারণে। দলের সেরা দুই ক্রিকেটারের অভাবটা স্বীকার করে নিয়েও পরিস্থিতিটাকে নিজেরসহ অন্যদের জন্যও দেখছেন একটা সুযোগ হিসেবে, ‘আমার তো মনে হয় দুজনের জায়গায় আসলে তিনজন খেলোয়াড় নাই। সাকিব ভাই তো একজনের মধ্যে দুজন, সঙ্গে তামিম ভাইও নাই। একটু চ্যালেঞ্জিং হবে, তবে যারা নেই তাদের নিয়ে পড়ে থাকলে তো হবে না। যারা আছে তারা সবাই অনেক বেশি মনোযোগী, আমার মনে হয় সবাই এখন অনেক বেশি দায়িত্ব নিয়ে খেলবে। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপকে সবাই একটা সুযোগ হিসেবে দেখছে, সবাই পারফরম করতে মুখিয়ে আছে।’ দলের সেরা দুজনকে ছাড়া খেলাটা যেমন বাকিদের জন্য সুযোগ, তেমনি ভারতের মাটিতে পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলাটাও একটা বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন মমিনুল, ‘আমি অতীত বা ভবিষ্যৎ নয়, সব সময় বর্তমান নিয়েই চিন্তা করি। আমরা সুযোগ পেয়েছি এখানে দুটি টেস্ট খেলার, খুব ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টা করছি। আশা করছি এখানে আমরা ভালো ক্রিকেট খেলব।’

বাংলাদেশের কাছে খেলতে পারাটাই সুযোগ, অন্যদিকে বিরাট কোহলির কাছে এই সিরিজ বাকি বিশ্বকে একটা বার্তা দেওয়ার মঞ্চ, ‘আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি তো বলব আমাদের পেস বোলিং আক্রমণ বিশ্বের সেরা। এই ছেলেদের এটা প্রাপ্য। আমি যখন অধিনায়ক হই, তখন এটা নিয়েই সবচেয়ে বেশি কথা হয়েছিল টিম ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে। ব্যাটিং বা স্পিন বোলিং—এই দুটো নিয়ে কোনো ভাবনাই ছিল না। আমার মাথায় একটাই জিনিস ছিল, পেস বোলিং। জহির খানসহ অন্য সব অভিজ্ঞরা চলে যাওয়ার পর নতুনদের নিয়ে কী করে একটা শক্তিশালী পেস বোলিং আক্রমণ তৈরি করা যায় সেটাই ছিল ভাবনায়। শুধু ভেবেছি কী করে প্রতিপক্ষের ২০ উইকেট তুলে নেওয়ার মতো বারুদ নিজেদের ভেতর জমা করা যায়। মাঝে মাঝে এই বিশ্বাসটা উইকেটের চাইতেও বেশি কাজে দেয়।’

ম্যাড়মেড়ে ভারতীয় দলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলি, যার ধারাবাহিকতায় মহেন্দ্র সিং ধোনি যুগ পার হয়ে ভারতীয় ক্রিকেট এখন বিরাট যুগে। শুধু স্পিন আর ব্যাটিং নয়, গতির জোরেও তারা গুঁড়িয়ে দিতে চায় প্রতিপক্ষকে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সেটাই দেখিয়েছে ভারত, এবারে সামনে বাংলাদেশ। যে দলটা টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার ২০ বছর পর শুধু মানসিকভাবেই পরিপক্ব হয়েছে বলে মনে করেন মমিনুল, ‘আমার মনে হয় গত ২০ বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে, মানসিকভাবে আমরা অনেক বেড়ে উঠেছি। আরো ভালো করার তাগিদ এসেছে নিজেদের মাঝে, সবাই আরো বেশি সিরিয়াস হয়েছে।’ মমিনুলের ভাষ্যমতে মানসিকতার বদল হয়তো হয়েছে, তবে দক্ষতার মান নিম্নগামী। কোনো রকম টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা ছাড়াই, অভিষেক টেস্টের প্রথম ইনিংসে ভারতের বিপক্ষে ৪০০ রান করেছিল বাংলাদেশ। ২০ বছরে গঙ্গায় পদ্মায় অনেক পানি গড়ালেও এরপর খেলা আরো ৮টি টেস্টে মোট ১৬ ইনিংস মিলিয়েও সেই চার শ পার করতে পারেনি বাংলাদেশ। অভিষেক টেস্টের প্রথম ইনিংসে ভারতের বিপক্ষে নাঈমুরের ১৩২ রানে ৬ উইকেট এখনো রয়ে গেছে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের সেরা বোলিংয়ের নজির। পরবর্তী প্রজন্মে বিশ্বসেরার তকমা এঁটেও কেউ সেদিনের অভিষিক্ত নাঈমুরকে ছাপিয়ে যেতে পারেননি।

তার দুই দশক পর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের মতো মর্যাদার আসরে বাংলাদেশের ‘অভিষেক’ও হচ্ছে সেই একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে। মাঝের সময়টা খোলনলচে পাল্টে ভারত এখন টেস্ট র্যাংকিংয়ের চূড়ায়। আর বাংলাদেশ সেই শৈশবের গণ্ডিতেই হামাগুড়ি খাচ্ছে! যদিও ২০ বছরে দালান হয়েছে, ব্যাংক ব্যালান্স বেড়েছে, বেড়েছে ঠাটবাটও। কিন্তু দুটি দলের পার্থক্য দুই দশক আগে যা ছিল, এখন তার চেয়েও বেশি। এ রকম অবস্থায়, ভদ্রতা করেই মমিনুলকে বলতে হচ্ছে, ‘আমার কাছে মনে হয় আমাদের কোনো চাপ নেই, কারণ আমাদের নিজেদেরই ওরকম কোনো প্রত্যাশা নেই। আমরাও জানি, আপনারাও জানেন, সবাই জানে। আমাদের ওরকম চাপ নেই যে জিততেই হবে।’

এই একটি জায়গায় ২০০০ সালের নাঈমুর আর ২০১৯ সালের মমিনুল একই সমতলে—সেদিন প্রত্যাশার চাপ ছিল না, আজও নেই। অপ্রস্তুতও দুই দল। তবে ইতিহাসে নাম লেখানোর হাতছানিও আছে। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে নিজেদের প্রথম ম্যাচ বলে কথা। কে জানে, নাঈমুরের দলের মতো মমিনুলের দলেরও কেউ হয়তো আলো ছড়াবেন তাঁদের ভাঙা ঘরে!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা