kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

প্রতিনিয়ত বিপদের শঙ্কায় ৮০%

বিশেষ প্রতিনিধি   

১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রতিনিয়ত বিপদের শঙ্কায় ৮০%

রাজধানীর সিপাহীবাগ আদর্শবাগের একটি আবাসিক ভবনে গত আড়াই বছরে চারবার চুরি সংঘটিত হয়েছে। প্রথমবার গ্যারেজ থেকে মোটরসাইকেল চুরি হয়েছে। রাস্তার সিসিটিভির ফুটেজে তা ধরাও পড়েছে। এরপর তৃতীয় তলা, তারপর দ্বিতীয় তলায় চুরির ঘটনা ঘটেছে। তিনটি ঘটনায় থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছে; সংশ্লিষ্ট থানা মামলা হিসেবে নিয়েছে একটি ঘটনা, তাও ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার হস্তক্ষেপের পরে। কিন্তু মালামাল উদ্ধার কিংবা আসামি গ্রেপ্তারের ব্যাপারে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সম্প্রতি এই ভবনে আবারও চুরি হয়েছে। কিন্তু এবার আর থানায় জানানোর কথা ভাবেননি কেউ। এই ভবনে তথ্য সংগ্রহকালে বাসিন্দারা জানান, রাতে তাঁরা ভালোভাবে ঘুমাতে পারেন না; আতঙ্কে থাকেন কখন আবার চোর ঢুকে পড়ে। তাঁরা আরো জানিয়েছেন, রিকশায় খিলগাঁও রেলগেট দিয়ে আসার সময় একাধিকবার ছিনতাইয়ের কবলে পড়েছেন। এখন সে রাস্তা দিয়ে গেলেই ভয়ে থাকেন, কখন আবার ছিনতাইকারীর মুখোমুখি হতে হয়।

সিলেটের একটি গ্রামে গত ১ মার্চ পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে রাতের আঁধারে একটি বাড়ির দরজায় তালা লাগিয়ে বাইরে থেকে পেট্রল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। টের পেয়ে বাড়ির বাসিন্দারা জেগে উঠলে প্রাণে রক্ষা পান। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়। পুলিশ তদন্ত করে কিন্তু আসামি ধরার কিংবা নিরাপত্তা দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। উল্টো অভিযোগকারীরাই নিজেরা আগুন লাগিয়েছেন কি না তা খুঁজতে থাকে। অভিযোগকারীদের ধারণা, এ ঘটনার জন্য তারা থানায় কোনো খরচাপাতি দেননি বলেই এমনটি হতে পারে। এ ঘটনার পর থেকে ওই পরিবারের বাসিন্দারা আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন, আবার কখন কী ঘটে!

আমাদের জরিপ অনুসন্ধানে এ রকম অনেক ঘটনা পাওয়া গেছে, যেগুলোর রেশ ধরে মানুষ বিপদের শঙ্কায় দিনাতিপাত করছে।

জরিপে আমাদের একটি প্রশ্ন ছিল—আপনার মধ্যে সমস্যা/বিপদের শঙ্কা কাজ করে কি? এর জবাবে হ্যাঁ বলেছেন ৮০.২ শতাংশ, না বলেছেন ১৯.৮ শতাংশ। অর্থাৎ এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন দেশের বেশির ভাগ মানুষ।

যাঁরা একবার বিপদের মুখোমুখি হয়েছেন; ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন; আবার বিপদ থেকে উদ্ধারও পাননি, তাদের প্রায় সবাই বলেছেন যেকোনো মুহূর্তে বিপদে পড়ার শঙ্কার কথা।

এই বিষয়টিকে বিশেষজ্ঞরা কিভাবে দেখছেন?

ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, ‘মানুষ বিপদে পড়ছে; বিপদ থেকে উদ্ধার পাচ্ছে না; পুলিশের কাছেও যাচ্ছে না; যেকোনো সময় বিপদের শঙ্কা বোধ করছে। এই কয়েকটি বড় বিষয় আমাদের সমাজের সার্বিক বাস্তবতা তুলে ধরছে। সামাজিক ব্যবস্থায় ভীতিকর পরিবেশটাই একটা বড় সমস্যা। ক্ষমতার অপব্যবহারজনিত একটা সার্বক্ষণিক বিপদের পরিবেশ তৈরি হয়ে থাকে। সাম্প্রতিককালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভীতিকর পরিবেশের উদাহরণ তো আমরা দেখতে পাচ্ছি। জুয়া-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান থেকে দেখতে পাচ্ছি, চাঁদাবাজির মাধ্যমে তারা সমাজে একটি অন্য পরিবেশ তৈরি করে রেখেছিল।’

নাগরিক আন্দোলনের নেতা সৈয়দ আবুল মকসুদের মতে, সমাজে আইনের শাসনের অভাব থেকেই নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হচ্ছে। দলীয় রাজনীতির ক্ষতিকর প্রভাব থেকেই এই অবস্থা। সাধারণ মানুষ বিপন্ন বোধ করছে। বিপদে পড়ে বিচার পেলে এ অবস্থা হতো না। রাষ্ট্রে যদি আইনের শাসন থাকতো তাহলে মানুষের নিরাপত্তাহীনতা কম হতো।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লবের মতে, এটা এক ধরনের অসহায়ত্বের প্রকাশ। এই অসহায়ত্ব বেশি দিন থাকলে, দীর্ঘ সময় ধরে মনের মধ্যে বিরাজ করলে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। এটা সমাজের সুস্থতার লক্ষণ নয়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ কিভাবে সম্ভব?

এ প্রসঙ্গে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘কিছু আকস্মিক বিপদ সম্পর্কে হয়তো সচেতন হওয়া সম্ভব। যেমন—একা চলব না; বিপজ্জনক সময় এড়িয়ে চলব অথবা বিপদে পড়ে গেলে পুলিশের ৯৯৯ ব্যবহার করব। কিন্তু যেখানে পরিবেশটাই হচ্ছে সমস্যা—ভীতিকর পরিবেশ, সেখানে সমস্যার মূলে যেতে হবে। আইনের শাসনটাকে আরো শক্তিশালী করা দরকার। বিশেষ করে ক্ষমতার অপব্যবহারের জায়গাগুলোতে নজর দেওয়া প্রয়োজন। ভীতিকর পরিবেশ থেকে মুক্তির জন্য রাজনৈতিক সুশাসনটা জরুরি।

সৈয়দ আবুল মকসুদের মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি। আইনের শাসন থাকলে সরকারি কর্মচারী, জনপ্রতিনিধিরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য। গ্রাম আদালতেও বিচার পাওয়া যাবে। পুলিশও মোটামুটি স্বাধীনভাবে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করবে। ফলে অপরাধপ্রবণতাও কমে আসবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা