kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বাবরি মসজিদ মামলার রায়

বিতর্কিত জমিতে মন্দির, পৃথক স্থানে মসজিদ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক    

১০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিতর্কিত জমিতে মন্দির, পৃথক স্থানে মসজিদ

ভারতের অযোধ্যায় বহুল আলোচিত বাবরি মসজিদ মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিতর্কিত স্থানটিতে হিন্দু মন্দির নির্মাণের পক্ষে রায় দিয়েছেন। একই সঙ্গে মুসলমানদের মসজিদ নির্মাণের জন্য অযোধ্যায় পৃথক স্থানে পাঁচ একর জমি দেওয়ার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল শনিবার সকালে ভারতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে এ রায় প্রদান করেন।

রায়ে বলা হয়েছে, ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপের (আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া-এএসআই) দেওয়া প্রমাণ বলছে, বাবরি মসজিদ নির্মাণের আগে জমিটিতে একটি স্থাপনা ছিল এবং তা ইসলামী নিদর্শন ছিল না। তবে জমিটিতে আগে হিন্দু মন্দির ছিল সেটাও প্রমাণিত হয়নি। আর ১৯৯২ সালে মসজিদটি ভেঙে দেওয়াও ছিল আইনের শাসনের পরিপন্থী। তবে ভারতের সুন্নি ওয়াক্ফ বোর্ড এ রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

অযোধ্যা নগরীতে ১৪৪ ধারা জারি ও অতিরিক্ত নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েনসহ ভারতজুড়ে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে গতকাল এই রায় প্রকাশ করা হয়। রায় প্রকাশের পরপরই আদালতের বাইরে ‘জয় শ্রী রাম’ বলে স্লোগান দেয় রামভক্তরা, যদিও আগে থেকেই রায় উদ্‌যাপনে সব পক্ষের ওপরই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল প্রশাসন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রায়কে স্বাগত জানিয়ে তা কারো জন্যই জয় কিংবা পরাজয় নয় বলে মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে দেশবাসীকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানান।

রায় প্রদানকারী সাংবিধানিক বেঞ্চে প্রধান বিচারপতি ছাড়াও ছিলেন বিচারপতি এস এ বোবদে, ডি ওয়াই চন্দ্রচুড়, অশোক ভূষণ ও এস আব্দুল নাজির। রায় পড়ে শোনান প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ।

ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে রায়ে বিতর্কিত জমিটির বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মালিকানার দাবি খারিজ করে তা কেন্দ্রীয় সরকারের জিম্মায় দেওয়া হয়। আদেশে বলা হয়, সরকার একটি ট্রাস্ট গঠন করে সেখানে একটি মন্দির নির্মাণ করবে এবং আগামী তিন মাসের মধ্যে জমিটি ট্রাস্টের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। রায়ে সুন্নি ওয়াক্ফ বোর্ডকে বিকল্প পাঁচ একর জমি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এই সাংবিধানিক বেঞ্চ। নির্দেশে বলা হয়েছে, ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কোনো জায়গায় ওই জমির বন্দোবস্ত করতে হবে সরকারকে।

রায়ে উল্লেখ করা হয়, ওই জমিতে বাবরের সেনাপতি মির বাকিই যে মসজিদ তৈরি করেছিলেন, এর প্রমাণ রয়েছে। এ ছাড়া ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক খননে সেখানে বাবরি মসজিদ নির্মাণের আগে স্থাপনার অস্তিত্ব ছিল বলে প্রমাণ মিলেছে। তবে সেই কাঠামো থেকে এমনও দাবি করা যায় না যে সেগুলো মন্দিরের কাঠামো ছিল। একই সঙ্গে ১৬ শতকে মসজিদ নির্মাণের পর থেকে এর এক পাশে হিন্দুদের প্রার্থনার প্রমাণও পাওয়া গেছে। সুন্নি ওয়াক্ফ বোর্ডের দাবি খারিজ করে শীর্ষ আদালত বলেছেন, শুধু বিশ্বাসের ভিত্তিতে কোনো অধিকার দাবি করা যায় না। জমির মালিকানা আইনি ভিত্তিতেই ঠিক করা উচিত।

রায় প্রকাশের পরপরই প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মামলায় মুসলিম পক্ষের আইনজীবী জাফরইয়াব জিলানি বলেন, এ রায় অন্যায্য। তাঁরা রায় পর্যালোচনার জন্য আবেদন করার চিন্তা করছেন। হিন্দুদের পক্ষে লড়া আইনজীবী বরুণ কুমার সিনহা বলেন, এ রায় ঐতিহাসিক।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তি যা-ই হোক, শেষ পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বিতর্কিত সম্পত্তির একটি আইনি সমাধান হলো, যে বিতর্ক ভারতকে দ্বিখণ্ডিত, হতাশ ও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, আশা করা হচ্ছে এই রায় কিছুটা সাম্প্রদায়িক পুনর্মিলন ঘটাবে।

এ বিষয়ে ভারতীয় আইনজীবী সঞ্জয় হেজ বিবিসিকে বলেন, আইন মেনে দেওয়া এই রায় ‘বিচারিক কারুকার্য ও রাষ্ট্রাচারকে তুলে ধরলেও তা পরিত্রাণ এনে দিয়েছে, আর তা করা হয়েছে বাস্তবতার ভিত্তিতে। তবে জমিটি নিয়ে ভারতে যে গভীর ধর্মীয় বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে তা দূর করবে কি না তা সময়ই বলে দেবে।

১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরে বিতর্কিত জমিতে রামের মূর্তি স্থাপনের পর ফৈজাবাদ আদালতে বাবরি মসজিদের পক্ষে যিনি প্রথম মামলা দায়ের করেছিলেন, তাঁর নাম হাসিম আনসারি। ২০১৬ সালে তিনি মারা গেলে তাঁর ছেলে ইকবাল আনসারি মামলার বাদী হন। এই রামমন্দির ও বাবরি মসজিদের বিষয়টি ১৯৮০-এর দশকে ভারতে অন্যতম রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল। স্পর্শকাতর এ মামলা নিয়ে নানা টানাপড়েনের একপর্যায়ে ২০১০ সালে ভারতের এলাহাবাদ হাইকোর্ট জমিটি হিন্দু, সুন্নি ওয়াক্ফ বোর্ড ও নির্মোহী আখড়ার মধ্যে তিন ভাগে ভাগ করে দেন। তবে চূড়ান্ত রায়ে গতকাল সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, এটি জমি ভাগাভাগির কোনো মামলা নয়।

ভারত সরকারের বিবৃতি : রায় ঘোষণার পর ভারত সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এটি ভারতের একটি অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটি ছিল একটি আইনি বিষয় এবং ঐতিহাসিক ও দীর্ঘকালীন বিতর্ক। ভারতের সরকার দেশের সুনাম এবং সব সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি সব ধর্মীয় উপাসনালয়ের নিরাপত্তা দিতে বদ্ধপরিকর। তবে সুপ্রিম কোর্টের এ রায় এই নজির তৈরি করছে না যে দেশের অন্য স্থানেও একই দাবি করা যাবে, যাতে সংখ্যালঘুদের অধিকার খর্ব করা হয়।

কার কী প্রতিক্রিয়া : এই রায় প্রকাশের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টুইটারে বলেছেন, “সুপ্রিম কোর্টের রায় নানা করণে গুরুত্বপূর্ণ। বিবাদ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এটি আইনি গুরুত্বের প্রতীক। তিনি বলেন, এই রায়কে জয় বা পরাজয়ের ভিত্তিতে দেখা উচিত নয়। এটা ‘রাম ভক্তি’ বা ‘রহিম ভক্তি’ নয়, এখন সময় হলো ‘ভারত ভক্তির’ আদর্শ বাস্তবায়নের। আমি সব ভারতীয়র প্রতি শান্তি, সম্প্রীতি ও ঐক্য বজায় রাখার আবেদন জানাচ্ছি।”

ক্ষমতাসীন বিজেপির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, ‘আমি শ্রী রাম জন্মভূমির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানাই। আমি সব সম্প্রদায় ও ধর্মকে এ রায় মেনে নেওয়ার আহ্বান জানাই। ’

ভারতীয় কংগ্রেস এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘অযোধ্যা মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায়কে সম্মান জানাচ্ছে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। আমরা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতার মূল্যবোধ মেনে চলার আহ্বান জানাচ্ছি।’

কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেছেন, সবার উচিত এই রায়কে সম্মান করা এবং কয়েক শ বছরের প্রাচীন ঐক্য ও সম্প্রীতি ধরে রাখা।

হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় সমাজসেবক সংঘের প্রধান মোহন ভগবত বলেন, ‘আমরা এই রায়কে স্বাগত জানাই। কয়েক দশক ধরে এই মামলা চলেছে এবং শেষ পর্যন্ত এর সঠিক সমাপ্তি ঘটেছে। এটিকে কারো জয়-পরাজয় হিসেবে দেখা উচিত নয়।’

রায়ের গুরুত্বপূর্ণ দিক : রায়ে নির্মোহী আখড়ার মালিকানা এবং বাবরি মসজিদে শিয়া ওয়াক্ফ বোর্ডের দাবি খারিজ হয়েছে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মালিকানা বাতিল করে কেন্দ্রকে মন্দির নির্মাণের আদেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত বলেছেন, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ জমিটি নিয়ে সন্দেহ দূর করতে পারেনি। তবে একই সঙ্গে বাবরি মসজিদটি কোনো খালি জায়গায় নির্মিত হয়েছে তা বলা যাবে না। সূত্র : বিবিসি, এএফপি, আনন্দবাজার।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা