kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

‘বুড়া বয়সে যামু না কোনোহানে’

রফিকুল ইসলাম, বরগুনার মাঝখালী থেকে    

১০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘বুড়া বয়সে যামু না কোনোহানে’

গত রাত ৯টায় স্যাটেলাইট থেকে তোলা, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের অবস্থান। ছবি : আকু ওয়েদার

এই বুড়া বয়সে কোনোহানে যামু না, বইন্যায় যদি মরন আয় তয় ঘরে বইয়াই মরমু, ছেরেচ্ছাত খাইতে (দুর্ভোগ পোহাতে) কোনোহানে যামু না।’ এ কথা বলছিলেন বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের মাঝখালী গ্রামের বৃদ্ধা সেতারা বেগম। নাতিকে বরগুনা শহরে পৌঁছে দিতে কর্দমাক্ত পথ ধরে হাঁটছিলেন তিনি। সেতারা বেগম বলেন, ‘বাবা, ভাঙতে ভাঙতে এহন খালি পোতডু বাহি আছে, সবই তো বইন্যায় আর গাঙ্গে ভাইঙ্গা শ্যাষ, এহন বাহি আছে পড়ানডা যাওয়া। নাতিডারে ওর মা-বাপের দারে পাডাইয়া ঘরে হুইয়া থাকমু, বইন্যায় যদি ভাইস্যা যাই তো যামু, কোনোহানে আর যামু না।’

মাঝখালী গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরে বসবাস করে। গতকাল শনিবার ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিকেল ৪টা নাগাদ কাছের আশ্রয়কেন্দ্রে যায়নি কেউই। বিষখালীর কোল ঘেঁষে নদীসংলগ্ন একটি ঘরে গিয়ে একজন প্রসূতির সঙ্গে কথা হয়। আবদুর রহিমের স্ত্রী ফিরোজা বেগম বলেন, ‘জোয়ারের পানি বাড়লেই ঘরবাড়ি সব পানিতে তলাইয়া যায়, এহন আবার বইন্যা। কুম্মে যামু কি হরমু কইতে পারি না কিছু। গেউদ্দার বাফে যদি কোথাও লইয়্যা যায় তয় যামু আনে।’ তিনি জানান, এখানকার বাসিন্দাদের কেউ এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেননি। যদি সবাই যান, তবে তাঁরাও তখন আশ্রয় নিতে যাবেন।

সুপার সাইক্লোন বুলবুলের প্রভাবে বরগুনায় ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা বরগুনায় শুক্রবার থেকে বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছিল। নদী-তীরবর্তী বাঁধের আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে ঝড়ের আতঙ্ক বিরাজ করলেও ঘর ছেড়ে আশ্রয় নিতে চাইছে না অনেকে। ফলে ঝুঁকির মধ্যেই থাকছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দারা। বরগুনার বিষখালী ও পায়রা নদী-তীরবর্তী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও এর আশপাশে লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করে। তাদের বেশির ভাগই জেলে। ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কসংকেত জেনেছে অনেকেই। তবে কেউ কেউ ভুল সংকেত আবার কেউ এখনো সংকেতের কথা জানেই না।

প্রত্যন্ত এসব এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদী তীরের বাঁধের কাছাকাছি এবং বাইরের বাসিন্দাদের অনেকেই এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে যায়নি। এমনকি কেউ কেউ যাবে না বলেই ঠিক করেছে। আশ্রয়কেন্দ্র দূরে হওয়ায় এবং পর্যাপ্ত মানুষের আশ্রয়ের ব্যবস্থা না থাকায় অনেকে বাড়িতে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিল। অথচ এসব এলাকার বাসিন্দারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।

বিষখালীর পশ্চিমপারের কালমেঘা ও কুপদোন এলাকা। কালমেঘা বাজার থেকে এক কিলোমিটার এলাকায় নদী শাসন করে ব্লক দিয়ে স্থায়ী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ দেওয়া হয়েছে। তবে এর ঠিক দক্ষিণের অংশে দক্ষিণ কুপদোন এলাকার প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা নদীভাঙনে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের এক-তৃতীয়াংশ বিলীন। ওই এলাকার কয়েক হাজার পরিবার ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আতঙ্কে ছিল। নিজেদের জীবন বাঁচাতে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিলেও ফসলি জমি, বাড়িঘর, গাছপালা ও গবাদি পশুর ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কায় ছিল তারা। ওই এলাকার ইউপি সদস্য শাহীন মিয়া বলেন, ‘আমরা অনেক দুশ্চিন্তায় রয়েছি। এখানে দুই কিলোমিটারের মধ্যে কাছাকাছি আশ্রয়কেন্দ্র নেই। আমাদের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি স্থায়ীকরণ করা হলে এই দুশ্চিন্তা থাকত না।’

সদর উপজেলার নলটোনা, রায়ভোগ, কুমিরমারা, বালিয়াতলী, গোড়াপদ্মা, আয়লা-পাতাকাটা, গুলিশাখালীসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নদী-তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের চরম আতঙ্কে থাকতে দেখা যায়।

নলটোনা এলাকার বাসিন্দা সেলিম শাহনেওয়াজ জানান, নলী সাজিপাড়া ও নলটোনা এলাকার অন্তত দুই কিলেমিটার এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ। বিষখালীর ভাঙনে এসব বাঁধের প্রায় সম্পূর্ণ অংশ বিলীন। সামান্য যেটুকু টিকে আছে যেকোনো মুহূর্তে নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় বাঁধ না থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। তিনি বলেন, ‘অনেকবার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে এনেও কোনো সুফল পাইনি।’

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে আমরা সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছি। কেউ যাতে বাড়িতে অবস্থান না করে সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করি যথাসময়ে সবাই আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেবে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো তাদের জন্য পুরোপুরিভাবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা