kalerkantho

সোমবার । ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ১ পোষ ১৪২৬। ১৮ রবিউস সানি                         

হাবীবুল্লাহ্ বাহার কলেজ

সংকটেও ছাত্রলীগের দখলে ৪ শ্রেণিকক্ষ

শরীফুল আলম সুমন ও তানজিদ বসুনিয়া    

৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সংকটেও ছাত্রলীগের দখলে ৪ শ্রেণিকক্ষ

রাজধানীর হাবীবুল্লাহ্ বাহার কলেজে শ্রেণিকক্ষের সংকট প্রকট। এ কারণে নিয়মিত ক্লাস নিতে পারেন না শিক্ষকরা। আবার অফিসকক্ষের অভাবে বেশ কয়েকজন শিক্ষক মিলে বসেন একটি কক্ষে। এসব টানাটানির মধ্যেও কলেজ শাখা ছাত্রলীগের তিনজন নেতা কলেজটির নিচতলায় চারটি শ্রেণিকক্ষ দখল করে নিয়েছেন। সেই কক্ষগুলোকে নিজেদের অফিস বানিয়েছেন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। এসব কক্ষে বসেই তাঁরা রাজনীতি ও ব্যবসার কাজ সারছেন। এমনকি দীর্ঘ রাত পর্যন্ত ওই কক্ষগুলোতে চলে নিয়মিত আড্ডা।

কলেজের পুরাতন ভবনের নিচতলায় ১১৪ নম্বর শ্রেণিকক্ষটি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সৈকত চৌধুরী, ১১৫ নম্বর শ্রেণিকক্ষটি সিনিয়র সহসভাপতি এবং ১১৬ নম্বর কক্ষটি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মাহফুজ আহমেদ সুমন দখল করে নিজেদের অফিস বানিয়েছেন। এর বাইরে আরেকটি কক্ষও দখল করে রেখেছেন সংগঠনের নেতারা। সেখানে বসে নেতাকর্মীরা আড্ডা দেন। ওই কক্ষে কিছু মালপত্রও রেখেছেন তাঁরা।  

ওই কক্ষগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, সভাপতির বসার জন্য আলাদা চেয়ার ও টেবিল রাখা আছে। চেয়ারের ওপর পাতা বাহারি রঙ্গের তোয়ালে। টেবিলের সামনে সারিবদ্ধ চেয়ার। পাশে সোফা। একই অবস্থা সাধারণ সম্পাদকের রুমেরও। সিনিয়র সহসভাপতির কক্ষে বসে রাজনীতি, টেন্ডারবাজি, ব্যাবসায়িক অন্য কাজকর্ম পরিচালনা করেন তাঁরা।

অনার্স তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ক্লাস সংকটের কারণে আমাদের যেখানে মাঝে মাঝেই ক্লাস বাতিল হয়ে যায়, বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে চারটি কক্ষ ছাত্রলীগ নেতাদের ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে একটি কক্ষ সাধারণ শিক্ষার্থীদের কমনরুম বলা হলেও সেখানে আমরা যেতে পারি না। ওই কক্ষে সব সময় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আড্ডা দেন।’

এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবদুল জব্বার মিয়া কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

১২ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য কলেজটির নেই পরিবহনব্যবস্থা। ফলে শিক্ষার্থীদের কলেজে আসা-যাওয়া করতে হয় গণপরিবহনে। পরিবহন বলতে আছে একটি মাত্র মাইক্রো। সেটিতে করে কলেজটির অধ্যক্ষসহ কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষক আসা-যাওয়া করেন। শিক্ষার্থীরা বহুবার পরিবহনের দাবি জানালেও কোনো লাভ হয়নি।

অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী খলিলুর রহমান বলেন, ‘গাজীপুর থেকে আমরা অনেক শিক্ষার্থী এই কলেজে নিয়মিত যাওয়া-আসা করি। লোকাল বাসে যাওয়া-আসা করতে অনেক সময় ক্লাস মিস হয়ে যায়। বাইরের বাসে যে রকম ভাড়া রাখা হয়, সে রকম ভাড়া নিয়েও যদি আমাদের জন্য পরিবহনের ব্যবস্থা করা হতো তাহলে শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই ভালো হয়।’

এত শিক্ষার্থী থাকার পরও কলেজটিতে নেই কোনো ক্যান্টিন। কয়েক বছর আগে ছোট একটি রুমে ক্যান্টিনের ব্যবস্থা করা হলেও পরে সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর বহুবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা বাস্তবায়ন করেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ।

অর্থনীতি বিভাগের স্নাতক (সম্মান) শিক্ষার্থী রামিসা আনান বলেন, ‘দূরে বাসা হওয়ার কারণে সকালের ক্লাস ধরতে প্রায়ই না খেয়ে আসতে হয়। কিন্তু কলেজে এসে নাশতা করার কোনো উপায় নেই। শিক্ষার্থীদের এই সমস্যাগুলো কলেজ প্রশাসনের বোঝা উচিত।’

বর্তমানে কলেজটিতে শিক্ষক রয়েছেন ১৪৮ জন। ১২ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য শ্রেণিকক্ষ রয়েছে ৪০টি। পর্যাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থী থাকার পরও ক্লাসরুম সংকটের কারণে প্রায়ই বাতিল হয় ক্লাস। এ ছাড়া উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা, সরকারি-বেসরকারি নিয়োগ পরীক্ষা, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষার কারণে বছরের প্রায় ছয় মাস বন্ধ থাকে কলেজের পাঠদান। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে অনেক হতাশা।

অ্যাকাউন্টিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্রী বলেন, ‘নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় শিক্ষকরা দায়সারাভাবে সিলেবাস শেষ করেন। এ কারণে আমরা ভালো ফল করতে পারছি না।’

১২ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য কলেজটির পুরাতন ভবনের চতুর্থ তলায় রয়েছে একটি লাইব্রেরি। যেখানে মাত্র ৫০ জন শিক্ষার্থীর বসার ব্যবস্থা রয়েছে। অ্যাকাউন্টিং বিভাগের শিক্ষার্থী আসিফ ইকবাল রনক বলেন, ‘লাইব্রেরিতে গিয়ে সিট না পেয়ে বেশির ভাগ সময় ফিরে আসতে হয়।’

২০১৯ সালে এই কলেজ থেকে ৪৩৪ জন শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেন ২৬০ জন। পাসের হার ৬০.৪৭ শতাংশ। জিপিএ ৫ পায়নি একজন শিক্ষার্থীও। ২০১৮ সালে ২২৪ জন শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ১২৯ জন। পাসের হার ছিল ৫৭.৫৯ শতাংশ।

তবে কলেজটির স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শ্রেণির ফল মোটামুটি ভালো। ২০১৭ সালে স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৮৮.৮২ শতাংশ। ২০১৬ সালের স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৭৭.৯৩ শতাংশ।

কলেজের অধ্যক্ষ আবদুল জব্বার মিয়া বলেন, ‘আমাদের নতুন ভবন তৈরি হচ্ছে। সেটা হয়ে গেলে ক্লাসরুমের সংকট কেটে যাবে। আমাদের অনার্স-মাস্টার্সের ফল ভালো। তবে উচ্চ মাধ্যমিকে অত ভালো নয়। কারণ উচ্চ মাধ্যমিকে আমাদের কলেজে মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয় না। তার পরও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। এ ছাড়া নতুন ভবন হলে ক্যান্টিনও করা হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা