kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ক্ষমতার জোরে ফুলেফেঁপে রশিদ শিকদার!

অভিযোগ আছে আ. লীগের এই নেতা ক্যাসিনোকাণ্ডেও জড়িত ছিলেন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ক্ষমতার জোরে ফুলেফেঁপে রশিদ শিকদার!

বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সহসভাপতি, হকির অন্যতম বড় দল উষা ক্রীড়াচক্রের সাধারণ সম্পাদক ও মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রশিদ শিকদার ফুলেফেঁপে উঠেছেন ক্ষমতাসীন দলটির ক্ষমতা ব্যবহার করে।

অভিযোগ আছে, সাম্প্রতিককালের আলোচিত ক্যাসিনোকাণ্ডেও সংশ্লিষ্টতা ছিল রশিদ শিকদারের। ঢাকায় ক্যাসিনোকাণ্ডের হোতা যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের ঘনিষ্ঠ এই আওয়ামী লীগ নেতা পুরান ঢাকার ওই ক্লাবে ক্যাসিনো পরিচালনা করতেন। তাঁর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন যুবলীগের আরেক বহিষ্কৃত নেতা মোমিনুল হক সাঈদ, যিনি হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক।

সম্প্রতি প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা রশিদের দুর্নীতি, লুটপাট, জমি দখল ও অবৈধভাবে পদ্মা নদী থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে একাধিক অভিযোগ দিয়েছেন এলাকার লোকরা। এ ছাড়া তাঁর ‘সন্ত্রাসী বাহিনীর’ কবল থেকে মুক্তি পেতে এলাকাবাসীর আবেদন গেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও।

বাবা বিএনপির নেতা ছিলেন, পরে আওয়ামী লীগে

এলাকার লোকজন জানায়, রশিদ শিকদারের বাবা নূর হোসেন স্থানীয় বিএনপির নেতা ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। বাবার সঙ্গে রশিদও দল বদল করে আওয়ামী লীগে আসেন।

এদের গোটা পরিবার ছিল প্রচণ্ড আওয়ামী লীগবিরোধী

লৌজং উপজেলার একজন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এদের গোটা পরিবার ছিল প্রচণ্ড আওয়ামী লীগবিরোধী। দলের কর্মীরা বিভিন্ন সময় তাদের হাতে নিগৃহীত হয়েছে। এখন আওয়ামী লীগে এসেও তারা প্রভাবশালী। দলের ত্যাগী কর্মীরা সারা জীবন ওদের কাছে জিম্মি হয়েই থাকল।’

জানা যায়, চলতি বছর ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের নির্বাচন হয়। নির্বাচনে সহসভাপতি পদে নির্বাচিত হন আবদুল রশিদ শিকদার। সাধারণ সম্পাদক হন মোমিনুল হক সাঈদ। দীর্ঘদিন ধরে হকি ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, দেশের হয়ে জাতীয় দলে খেলেছেন—এমন অনেককে বাদ দিয়ে মোমিনুল হক সাঈদ তাঁর ঘনিষ্ঠ রশিদ শিকদারকে সহসভাপতি হিসেবে বেছে নেন এবং তাঁর মাধ্যমেই উষা ক্রীড়াচক্রের টেন্টে ক্যাসিনো বাণিজ্য শুরু করেন।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ক্লাবপাড়া মতিঝিলে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু করে র‌্যাব। এর পরপরই রশিদ শিকদার তাঁর ক্লাব থেকে ক্যাসিনো সামগ্রী সরিয়ে ফেলেন। সে কারণে অভিযান চালালেও উষা ক্রীড়াচক্রের টেন্টে ক্যাসিনোসামগ্রী পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রশিদ শিকদারের বাবা নূর হোসেন ছিলেন লৌহজং উপজেলা বিএনপির সদস্য। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি ছেড়ে এই দলে যোগ দেন তিনি। আওয়ামী লীগে যোগদানের পর দলীয় সমর্থনে লৌজং উপজেলার বৌলতলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন নূর হোসেন। তাঁর মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে দলের সমর্থনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ছেলে রশিদ শিকদার। এরপর থেকেই দ্রুত উত্থান ঘটতে থাকে রশিদ শিকদারের। ওই সময় তিনি লৌজং উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদ পদ পেয়ে যান। মুন্সীগঞ্জের এক আওয়ামী লীগ নেতার সুনজরে থাকায় পরে সাধারণ সম্পাদকের পদও তাঁর দখলে আসে। আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে আবারও বৌলতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হন। অবশ্য বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হননি রশিদ শিকদার। তবে ওই পদে আওয়ামী লীগের কাউকে বসতে দেননি। দলের ক্ষমতা ব্যবহার করে চেয়ারম্যান করেন তাঁর চাচা আবদুল মালেক শিকদারকে, যিনি লৌজং উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

জানা যায়, কয়েক বছর ধরে তিনটি বড় প্রকল্পে কয়েক শ কোটি টাকার বালু সরবরাহের ঠিকাদারি করছেন রশিদ শিকদার। ওই প্রকল্পগুলো হচ্ছে জসালদিয়া পানি শোধনাগার, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেস ওয়ে ও পদ্মা সেতুতে রেল সড়ক প্রকল্পে বালু ভরাটের কাজ। ওই প্রকল্পগুলোতে তিনি বালু সরবরাহ করেছেন পদ্মা নদী থেকে বালু তুলে। যদিও তিনি জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে কোনো বালুমহাল ইজারা নেননি।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, ক্ষমতার জোরে রশিদ শিকদার পদ্মা থেকে অবৈধভাবে বালু তুলে বিক্রি করেছেন। বালু তোলা ও বহনের জন্য তাঁর রয়েছে অর্ধশত ড্রেজার ও বাল্কহেড। রশিদ শিকদার বিগত কয়েক বছরে যে পরিমাণ বালু পদ্মা নদী থেকে উত্তোলন করেছেন জেলা প্রশাসনকে প্রতি ঘনফুট পঁচিশ পয়সা করে রয়ালটি দিলে তার পরিমাণ দাঁড়াত অন্তত ২৫ কোটি টাকা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রশিদ শিকদার বালু উত্তোলন করে রেখেছেন শিমুলিয়া ঘাট এলাকায়। বিস্তৃত এলাকা জুড়ে বালু রাখায় পদ্মায় পানি নামার চারটি খালের মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। যে কারণে বৃষ্টির সময় ওই এলাকার কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।

এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, পদ্মা নদীর পার ঘেঁষে ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার কারণে নদীভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ভাঙন শুরু হলে পদ্মায় বিলীন হয়ে যেতে পারে কয়েক হাজার একর কৃষিজমি ও কয়েকটি গ্রাম।

অভিযোগ আছে, এলাকার অনেক মানুষের জমি জোর করে দখলে নিয়ে বালু মজুদ করে রেখেছেন রশিদ শিকদার। এ কারণে ওই সব জমিতে পরবর্তী সময়ে আর ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হবে না। জমি দখল করে বালু মজুদ করা হলেও ভুক্তভোগীরা রশিদ শিকদারের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না। কারণ তাঁর রয়েছে ‘সন্ত্রাসী বাহিনী’।

পদ্মা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, অন্যের জমি দখল, ক্যাসিনো বাণিজ্যসহ নানা অপকর্মের মাধ্যমে বিপুল বিত্ত-ভৈববের মালিক হয়েছেন রশিদ শিকদার। নিজ এলাকা লৌজংয়ের মাইজগাঁ গ্রামে গড়ে তুলেছেন বড় আকারের গরুর খামার, হাঁস-মুরগির খামার, মাছের হ্যাচারি ও ঘের। করেছেন বাগানবাড়ি।

সেতুতে কিছু কাজ করি

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আবদুর রশিদ শিকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি কোনো প্রকল্পে বালু সরবরাহ করি না। আমি মূল পদ্মা সেতুতে কিছু কাজ করি। আমি পদ্মা নদী থেকে বালু উত্তোলন করি না। তবে আমার কিছু ইকুইপমেন্ট ভাড়া দেওয়া আছে।’

অন্যের জমি দখল করে বালু রাখার বিষয়ে লৌহজং আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, ‘বালু মজুদ আছে ঠিকই, তবে ওই সব বালু আমার নয়।’ হাঁস-মুরগি-গরুর খামার, মাছ চাষ, বাগানবাড়ি সম্পর্কে জানতে চাইলে রশিদ শিকদার বলেন, ‘এগুলো আছে। তবে সবই আমার বাবার বাড়ি কেন্দ্র করে। পৈতৃক ভিটায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি ক্যাসিনোসহ কোনো প্রকার অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত নই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা