kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

জয়ের সূর্যে কাটল সংকটের মেঘ

সামীউর রহমান, দিল্লি থেকে   

৪ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জয়ের সূর্যে কাটল সংকটের মেঘ

কখনো কখনো মনে হয়, চোখের সামনে যেটা ঘটল সেটা আগেও কোথায় যেন দেখেছি। ফরাসি ভাষায় এই অনুভূতির নাম ‘দেজা ভ্যু’। রবিবার সন্ধ্যায়, রোহিত শর্মা ও মাহমুদ উল্লাহ রিয়াদকে যখন টস করতে একসঙ্গে দেখলাম, তখন মাথার ভেতর ফিরে ফিরে এলো ২০১৮ সালের নিদাহাস ট্রফির স্মৃতি। গোটা ম্যাচে আরো কতবার ফিরে ফিরে এলো বেঙ্গালুরু, কলম্বো কিংবা দুবাই। চমকে, আভিজাত্যে কিংবা সৌন্দর্যে; এই তিনটা শহরের চাইতে হয়তো পিছিয়েই থাকবে দিল্লি, পরিবেশের মানদণ্ডে তো রীতিমতো আতঙ্ক ছড়ানো। অথচ দূষিত এই শহরেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দল পেয়ে গেল সেই বহুল আকাঙ্ক্ষিত নীলপদ্ম। ভাঙল ভারতের কাছে হারের অচলায়তন। শুধু জাতীয় দলই নয়, বয়সভিত্তিক পর্যায়েও ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ মানেই যেন শেষ অঙ্কে হারের বিয়োগান্তক পরিণতি। মাহমুদ উল্লাহর ব্যাট থেকে ছুটে যাওয়া বলটা সীমানার ওপারে দীর্ঘদিনের জমানো আর্তনাদকেও যেন ছুড়ে ফেলল।

বিসিবি সভাপতির সহযাত্রী হয়ে একই বিমানে দিল্লি আসা। বিমান মাটি ছোঁয়ার পর বিমানবন্দরেই সাংবাদিকদের কিছু প্রশ্নের জবাব দেবেন, এমন একটা অনুরোধ রাখা হয়েছিল নাজমুল হাসানের কাছে। ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে অনুরোধটা রাখেননি। কাল প্রায় গোটা দিন টিম হোটেলে ধরনা দিয়ে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মুখ দেখালেন তিনি। অনেক কথার মধ্যে বলেছিলেন, ‘ভারতে এসে ভারতকে হারানো অলমোস্ট ইমপসিবল। কিন্তু একটা কথা বলি, ওদের দেশে এসে কেউ যদি ওদের হারাতে পারে, সেটা বাংলাদেশ।’ কে জানত, তাঁর কথাই পাঁচ ঘণ্টার মাথায় এমন সত্যি হয়ে ফলবে!

টস জিতে মাহমুদ উল্লাহ যখন বোলিং নিলেন, তখনই প্রেসবক্সে বিস্ময়ের গুঞ্জন! এ কী করলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক? দিল্লির আকাশ থেকে কাল ফিরে গেছে ৩২টা বিমান, ঘন কুয়াশার ঘোলা আকাশে রাতের বেলা বল দেখা কঠিন। তার ওপর ভারতের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ। রোহিত শর্মা, শিখর ধাওয়ানরা যদি বড় ইনিংস খেলে দেন তাহলে টি-টোয়েন্টির রোমাঞ্চ তো দেড় ঘণ্টাতেই শেষ! তবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে আগে ব্যাট করা ভারতীয় দলকে ২০ ওভার শেষে ১৪৮ রানেই আটকে দেয় বাংলাদেশ। শিখর ধাওয়ানের ৬৮ আর ঋষভ পান্টের ৩৮ রানই উল্লেখযোগ্য। সঙ্গে অষ্টম ব্যাটসম্যান হিসেবে নামা ওয়াশিংটন সুন্দর দুটো ছয়ের মারে ৫ বলে করে গেলেন ১৪ রান। ২০ ওভারে জয়ের জন্য চাই ১৪৯ রান। টি-টোয়েন্টির হিসাবে হয়তো খুব বেশি নয়, তবে দিল্লির এই মাঠে আইপিএল ম্যাচের গড় ইনিংস রান হিসাব করলে চ্যালেঞ্জিংই।

লিটন কুমার দাসকে টি-টোয়েন্টি দলে করা হয়েছে সহ-অধিনায়ক। ফেরার পথটা তিনিই দেখান, ৫ রান করে ক্যাচ দেন লোকেশ রাহুলের হাতে। এরপর অভিষিক্ত নাইম শেখের সঙ্গে সৌম্য সরকারের দ্বিতীয় উইকেটে ৪৬ রানের জুটিটা বেশ একটা আস্থার শুরু এনে দেয়। ছোট লক্ষ্য তাড়ায় শুরুতেই বেশ কিছু উইকেট না হারিয়ে ফেলাই কাজের। নাইম ও সৌম্য সেই কাজটিই করে দেন। ২৬ রানে নাইমের বিদায়ের পর ব্যাট করতে নামা মুশফিক তৃতীয় উইকেটে সৌম্যকে নিয়ে গড়েন ৬০ রানের মূল্যবান জুটি। ম্যাচের পর মুশফিক বারবার বলছিলেন একটা কথাই, তাঁরা দুজনই চেয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত থাকতে। শিখর ধাওয়ানের হাতে ক্যাচ দিয়ে ৩৯ রান করা সৌম্যের বিদায়ে আসেন মাহমুদ। তাঁর সঙ্গে মুশফিকের বোঝাপড়াটা মাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে পারিবারিক পর্যায়ে! অভ্যস্তভঙ্গিতে সিঙ্গেলস ডাবলস নিয়ে খেলে বাজে বলের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করেছেন দুজনই। অবশেষে তাঁদেরই হাত ধরে হারের দুষ্টচক্র ভাঙে দিল্লিতে। মুশফিক আর মাহমুদ যেন শাপমোচন করলেন ২০১৬-র বেঙ্গালুরুর। সেইবার ছয় মেরে জয় ছিনিয়ে আনার নেশায় দুজনই উইকেট বিলিয়ে দেন, বাংলাদেশ হারে অবিশ্বাস্যভাবে। এবার সেই দিনের শেষ ওভার করা হার্দিক পাণ্ডের ভাই ক্রুনাল পাণ্ডে মিড উইকেটে ছাড়লেন মুশফিকের ক্যাচ, বোলার ছিলেন যুজবেন্দ  চাহাল। ওখানেই যে পালটে গেল ম্যাচের রং। ঘরপোড়া গরু অবশ্য সিঁদুরে মেঘেই ডরায়, তাই একেবারে শেষের আগে মুশফিক-মাহমুদরা কোনো রকম আবেগের উচ্ছ্বাস দেখাননি। ১৯তম ওভারটা করতে এসেছিলেন খলিল আহমেদ। তাঁর ওভারের শেষ ৪ বলে টানা চারটে বাউন্ডারিতেই দূর হয়ে যায় টেনশনটা। জয়ের জন্য শেষ ৬ বলে দরকার মাত্র ৪ রান। অবশ্য বেঙ্গালুরুর কথা মনে পড়লে ভয় কাটে না! সেটা কাটিয়ে দেন শিভাম দুবে। কালই অভিষেক হয়েছে এই অলরাউন্ডারের। ব্যাট হাতে করেছেন ১, শেষ ওভারটায় বল তাঁর হাতে দিয়ে একটা জুয়াই খেলতে চেয়েছিলেন হয়তো রোহিত শর্মা। তিনি প্রথম বলটা ডট করে খানিকটা উত্তেজনা বাড়ালেও তৃতীয় বলে লেগস্টাম্পের বাইরে ওয়াইড দিয়ে খেলায় নিয়ে আসেন সমতা। পরের বলটাতেই মাহমুদের ডিপ উইকেট দিয়ে উড়িয়ে মারা ছক্কাতেই আসে টি-টোয়েন্টিতে ভারতের বিপক্ষে প্রথম জয়। যেটা আসতে পারত ২০১৬-র বেঙ্গালুরুতে, ২০১৮-র কলম্বোতেও। ২০১৫ সালে বাংলাদেশে ওয়ানডে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে ভারতকে হারানোর পর কালই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচে ভারতকে হারাল বাংলাদেশ।

অথচ ওয়াশিংটন সুন্দর যখন ৫ বলে ১৪ রান করে ফেলেন, শেষ ২ ওভারে আল আমিন ও শফিউল যখন ৩০ রান খরচ করে বসেন, তখন মনে হচ্ছিল আরো একটা বেদনাবিধুর কাব্য আর আক্ষেপের গল্পই হয়তো লিখতে হবে। শেষ পর্যন্ত সেটি হতে দিলেন না  মুশফিক-মাহমুদরাই। যাঁরা ছিলেন ট্র্যাজেডির কেন্দ্রীয় চরিত্র, সেই ভারতের মাঠেই দেখা গেল তাঁদের বীরত্বের বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশ ভারতকে হারাতে পারে। তাদের সেরা খেলোয়াড়দের ছাড়াই পারে। এই বিশ্বাসটাই দিল্লি জয় যেন সেটিই ঘোষণা করল আরেকবার। বারবার হৃদয়ভাঙার আগুনে পুড়ে যে বিশ্বাসই প্রায় নিঃশেষ হতে বসেছিল!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা