kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

জেলহত্যা দিবস আজ

মামলা শেষ হলেও বিচার শেষ হয়নি

আশরাফ-উল-আলম   

৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মামলা শেষ হলেও বিচার শেষ হয়নি

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর দেশে রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে শুরু হয়েছিল নানামুখী ষড়যন্ত্র। কাকে সরিয়ে কে ক্ষমতা দখল করবে তা নিয়ে চলছিল প্রতিযোগিতা। তারই একপর্যায়ে ওই বছরের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে। খন্দকার মোশতাক তখন রাষ্ট্রপতি। তিনি এবং তাঁকে ঘিরে থাকা ব্যক্তিরা মনে করেছিলেন, ওই চার নেতা থাকলে ক্ষমতার পালাবদল হয়ে যেতে পারে। ওই ধরনের শঙ্কা থেকেই জেলে চারজনকেই হত্যা করা হয়।

আজ সেই শোকাবহ ৩ নভেম্বর। ১৯৭৫ সালের এই দিনে জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে হত্যা করা হয়েছিল কারাগারের ভেতরে। নির্মম সেই হত্যাকাণ্ডের ৪৪ বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত বিচার শেষ হয়নি। সর্বোচ্চ আদালতে এই মামলা নিষ্পত্তি হয় ২০১৩ সালে। এর সাড়ে ছয় বছর পরও ১০ আসামি পলাতক। ওই হত্যাকাণ্ডের পেছনে যাঁরা কলকাঠি নেড়েছিলেন তাঁরাও পার পেয়ে যান রাজনৈতিক বিবেচনায়।

জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে আলাদা বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি বলেন, ঘাতকচক্রের উদ্দেশ্য ছিল দেশে অগণতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের উত্থানের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের চেতনা থেকে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে মুছে ফেলা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারাগারের অভ্যন্তরে এ ধরনের বর্বর হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন।

হত্যাকাণ্ডের ২৩ বছর পর মামলাটি সচল করেছিল তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার। ১৯৯৮ সালের ১৫ অক্টোবর ১৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল। ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত রায়ে তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন মোসলেম উদ্দিন, মারফত আলী শাহ ও আবুল হাশেম মৃধা। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন খন্দকার আবদুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এম এইচ এম বি নূর চৌধুরী, এ এম রাশেদ চৌধুরী, আবদুল মাজেদ, আহমদ শরিফুল হোসেন, মো. কিসমত হোসেন, নাজমুল হোসেন আনসার, সৈয়দ ফারুক রহমান, শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিন।

ডেথ রেফারেন্স এবং কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি আসামিদের আপিল শুনানি শেষে ২০০৮ সালে হাইকোর্ট মোসলেম উদ্দিনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া মারফত আলী ও হাশেম মৃধাকে খালাস দেওয়া হয়। এ ছাড়া খালাস দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া ফারুক রহমান, শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদকে। এরপর রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে ২০১৩ সালের ১৫ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের দেওয়া রায় বহাল রাখেন। অর্থাৎ তিনজনের মৃত্যুদণ্ড এবং ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়।

তবে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত সৈয়দ ফারুক রহমান, শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিনকে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ফাঁসি দেওয়া হয়।

জেলহত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিনজনসহ ১০ আসামি এখনো পলাতক। অন্যরা হলেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত খন্দকার আবদুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এম এইচ এম বি নূর চৌধুরী, এ এম রাশেদ চৌধুরী, আহমদ শরিফুল হোসেন, কিসমত হোসেন ও নাজমুল হোসেন আনসার। জানা গেছে, তাঁরা পাকিস্তান, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে আছেন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আবদুল মাজেদ দেশের বাইরে মারা গেছেন বলে জানা গেছে। সাজাপ্রাপ্ত বাকি আসামিরা এখনো শাস্তির মুখোমুখি না হয়ে পলাতক থাকায় মূলত এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার হয়নি বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।

জাতীয় নেতা শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামানের ছেলে খায়রুজ্জামান লিটন কলের কণ্ঠকে বলেন, ‘হ্যাঁ, মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। রায় হয়েছে। কিন্তু আমরা বিচার পাইনি। তবে এই মাটিতে একদিন খুনিদের বিচার হবেই। আমাদের দল যেহেতু ক্ষমতায়, একদিন না একদিন সরকার পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করবে। একদিন আমরা বিচার পাব বলেই আশা করি।’

এদিকে জেলহত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু। তিনি নিহতদের পরিবারের পক্ষে উচ্চ আদালতে মামলা পরিচালনা করেছিলেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। কয়েকজনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার অপরাধে। বাকি আসামিরা শুরু থেকে পলাতক। আসামিরা পলাতক থাকায় তাঁদের শাস্তির মুখোমুখি করা যায়নি। সে ক্ষেত্রে ওই পৈচাশিক ও নির্মম ঘটনায় নিহতদের স্বজনরা যদি বলেন বিচার পাননি, তাহলে বলা যায় যে বিচার এখনো শেষ হয়নি।’

রাজনৈতিক বিবেচনায় খালাস : রাজনৈতিক বিবেচনায় জেলহত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের খালাস দেওয়া হয় বলে অভিযোগ আছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এই মামলার তদন্ত হয়। তদন্তে ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে কে এম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ও তাহেরউদ্দিন ঠাকুরকে আসামি করা হয়েছিল। ২০০৪ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে প্রথম রায় দেন বিচারিক আদালত। তাতে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ষড়যন্ত্রকারী সম্পর্কে তেমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়।

যা ঘটেছিল সেদিন : ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর রাত দেড়টার দিকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে গিয়ে থেমেছিল একটি পিকআপ। তাতে ছিলেন কয়েকজন সেনা সদস্য। তখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আমিনুর রহমানকে ডাকেন আইজি প্রিজন। আমিনুর রহমান কারাগারের মূল ফটকে গিয়ে দেখেন পিকআপে সেনা সদস্যরা। তাঁরা একটি কাগজ দেন। কাগজে কী লেখা ছিল তা জানা যায়নি। এরপর আমিনুর রহমান কারাগারের ভেতরে ঢোকেন। সেখানে টেলিফোন বেজে ওঠে। রিসিভার তুললে অন্য প্রান্ত থেকে বলা হয় প্রেসিডেন্ট কথা বলবেন আইজি প্রিজনের সঙ্গে। আইজি প্রিজন গিয়ে ফোন ধরেন। তারপর তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট সাহেব ফোনে বলেছেন কারাগারের ফটকে আর্মি আছে। তারা যা করতে চায় তা করতে দাও।’

রাত ৩টার দিকে জাতীয় চার নেতাকে একত্রিত করার আদেশ আসে। আইজি প্রিজনই চার নেতার নাম একটি কাগজে লিখে আমিনুর রহমানকে দিয়েছিলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন একটি কক্ষে। তাজউদ্দীন আহমদ তখন কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন। চারজনকে একত্রিত করার পর হঠাৎ ব্রাশফায়ার হয়। সব শেষ।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা