kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আশ্রমের জমি ও আ. লীগ নেতার বাড়ি মনজুর দখলে

চাঁদা ‘সাম্রাজ্য’ রক্ষায় সহযোগীরা ফের মাঠে

ওমর ফারুক   

৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আশ্রমের জমি ও আ. লীগ নেতার বাড়ি মনজুর দখলে

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ময়নুল হক মনজুকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর নিয়ন্ত্রিত এলাকায় চাঁদাবাজি দুই দিন বন্ধ ছিল। কিন্তু গতকাল শনিবার থেকে আবার মাঠে নেমে পড়েছে তাঁর সহযোগীরা। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা রাজধানী সুপার মার্কেটে মহড়া দিয়েছে। মার্কেট এলাকার ফুটপাতসহ যেসব জায়গা থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হতো, সেগুলো থেকে টাকা ওঠানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

এদিকে টিকাটুলী এলাকার শ্রীশ্রী স্বামী ভোলানন্দগিরি আশ্রম ট্রাস্টের দেবোত্তর সম্পত্তি মনজু দখল করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেই সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য গতকাল ট্রাস্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চেষ্টা চালান। এ সময় মনজুর এক ভাই দলবল নিয়ে এসে তাঁদের বাধা দেন। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

এ ছাড়া কাউন্সিলর মনজুর বিরুদ্ধে হাটখোলা রোডে এক ব্যক্তির বাড়ি দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। জানা যায়, জমির মালিক মারা যাওয়ার পর তাঁর লাশ দাফনের জন্য বাসা থেকে বের করে নিয়ে যাওয়ার পরপরই বাড়িটি দখল করেন মনজু।

গত বৃহস্পতিবার র‌্যাব-৩ গ্রেপ্তার করে ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা মনজুকে। অস্ত্র ও মাদকের মামলায় তাঁকে ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

মনজুকে গ্রেপ্তারের পর রাজধানী সুপার মার্কেট, হাটখোলা রোডসহ আশপাশের এলাকায় তাঁর চাঁদাবাজি ও দখলের চিত্র বেরিয়ে আসতে থাকে। তাঁর সহযোগীরাও গাঢাকা দেয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল সকাল থেকে মনজুর সহযোগী আঙুল কাটা রুহুল, জেমস, আবদুল মান্নান, মোবারক মুন্সি রাজধানী সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ীদের কাছে গিয়ে বলেছেন, ‘খুশি হয়ে লাভ নেই। কয়েক দিনের মধ্যে মনজু জামিন নিয়ে এলাকায় ফিরে আসছেন। তখন দেখে নেওয়া হবে।’

রাজধানী সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী আবু আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁরা ভয়ের মধ্যে রয়েছেন, মনজু এসে আবার তাঁদের কোনো ক্ষতি করেন কি না। তিনি বলেন, মনজুর বিরুদ্ধে ওয়ারী থানায় যে মামলা হয়েছে, সেখানে তাঁর কয়েকজন সহযোগীর নামও আছে। কিন্তু যাদের নাম নেই, তারা এখন মার্কেটে এসে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, গতকাল দুপুর ১২টার দিকে মনজুর সহযোগীরা ওই মার্কেটে আসে এবং মহড়া দেয়। যে জেনারেটর দিয়ে বাড়তি আয় হয়, সেই জেনারেটরের খোঁজ নেয় তারা। ব্যবসায়ী সমিতির কার্যালয়ে না ঢুকলেও সেখানকার খোঁজ-খবরও নেয় তারা। মনজুর সহযোগীরা ব্যবসায়ীদের বলেছে যে তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে ওপরের মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। শিগগিরই মনজু বেরিয়ে আসবেন।

যেভাবে বাড়ি দখল করেন মনজু : রাজধানীর হাটখোলা রোডে ১১ কাঠা জমির মালিক ছিলেন আবদুল কাদের ভূঁইয়া। তাঁর ছেলে আবুল হোসেন হিরু ছিলেন সূত্রাপুর থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। কাদের ভূঁইয়ার মৃত্যুর পর আবুল হোসেন ও ভাই-বোনরা তাঁদের জমিতে ভবন করার জন্য আবাসন কম্পানি গ্লোব কনস্ট্রাকশনের সঙ্গে চুক্তি করেন। চুক্তি অনুযায়ী, ভবনের মোট ফ্ল্যাটের ৬০ শতাংশ পাবেন জমির মালিক। আর গ্লোব পাবে ৪০ শতাংশ। এমন চুক্তির পর ১৯ তলা ভবন করার কাজও শুরু হয়। ২০০৭ সাল পর্যন্ত চারতলা পর্যন্ত কাজ সম্পন্ন হয়। এর মধ্যেই ক্ষমতার পালাবদল ঘটে (এক-এগারো)। গ্লোব কনস্ট্রকশনের মালিককে গ্রেপ্তার করে টাস্কফোর্স। এরপর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ওই ভবনের চারতলার একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য টাকা জমা দিয়েছিলেন মনজু। ২০০৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর আবুল হোসেন হিরু মারা যান। সেদিনই তাঁর লাশ দাফনের জন্য বাসা থেকে নিয়ে যাওয়ার পর ভবনটি দখল করে নেন মনজু। ওই ভবনে তখন পর্যন্ত ১২টি ফ্ল্যাট ছিল। এর মধ্যে কয়েকটি বিক্রি করেন দেন আর বাকিগুলো ভাড়া দেন মনজু। আবুল হোসেন হিরুর ভাই-বোন ও সন্তানদের ভবনের কাছেও ভিড়তে দেননি তিনি। অথচ ভবনের হোল্ডিং ট্যাক্স দিয়ে যেতে হচ্ছে তাঁদের।

আবুল হোসেনের ছেলে মো. নাজমুল কাদের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার বাবার সঙ্গে মনজুর বাবার ভালো সম্পর্ক ছিল। বাবা মনজুকে স্নেহ করতেন। আর সেই তিনিই বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের সম্পত্তি দখল করলেন।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা ভবনটি ফিরে পেতে আইনি লড়াই করব।’

আশ্রমের জমি দখল : শুধু বাড়ি দখল নয়, ক্ষমতার জোরে কাউন্সিলর মনজু টিকাটুলীর ১২ কেএম দাস লেনের শ্রীশ্রী স্বামী ভোলানন্দগিরি আশ্রম ট্রাস্টের দেবোত্তর সম্পত্তির অনেকটা অংশ দখল করেন। সেখানে একটি ভবনও রয়েছে। এ সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য গতকাল সকালে ট্রাস্টের ৪০০-৫০০ সদস্য মিলে চেষ্টা চালান। এ সময় আওয়ামী লীগ নেতা মনজুর ভাই শাহীন তাঁর দলবল নিয়ে এসে বাধা দেন। এতে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।

বিকেলে আশ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। ওয়ারী থানার পুলিশ জানায়, তারা নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য সেখানে দায়িত্ব পালন করছে।

আশ্রমের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য শ্রীকান্ত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আশ্রমের সাত বিঘা জমি আছে। এর মধ্যে একটি পুকুর রয়েছে। পাশে রয়েছে একটি মন্দির। এ পুকুরে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হতো। কিন্তু একসময় সেই জায়গাটি মনজু দখল করে নেওয়ার পর আর প্রতিমা বিসর্জন করতে দেওয়া হয় না। মন্দিরে যেতে দেওয়া না। মনজু গ্রেপ্তার হওয়ার পর সম্পত্তি উদ্ধারের চেষ্টা করছি। আশ্রমের দখল করা সম্পত্তি দখলমুক্ত করতে প্রশাসনের সহযোগিতা চাই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা