kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ধানমণ্ডির ফ্ল্যাটে দুই নারীকে হত্যা

একজন শিল্পপতির শাশুড়ি, অন্যজন গৃহকর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ধানমণ্ডির ফ্ল্যাটে দুই নারীকে হত্যা

আফরোজা বেগম

রাজধানীর ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে এক শিল্পপতির শাশুড়ি ও তাঁর গৃহকর্মীর গলা কাটা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ধানমণ্ডির ২৮ নম্বর রোডের (নতুন ১৫ নম্বর) ২১ নম্বর বাড়ির লবেলিয়া নামের ভবনটির চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট থেকে লাশ দুটি উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার আব্দুল্লাহ হিল কাফি। তিনি বলেন, ‘ফ্ল্যাটের দুটি কক্ষ থেকে লাশ দুটি উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ঘাতকরা ওই দুজনকে জবাই করে হত্যা করেছে। হত্যার কারণ এখনো পরিষ্কার নয়, তবে ওই বাসা থেকে স্বর্ণালংকারসহ কিছু মালামাল খোয়া যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, বাসার মালামাল লুট করতেই এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে।’

নিহতরা হলেন আফরোজা বেগম (৬৫) ও তাঁর গৃহকর্মী দিতি (১৯)। আফরোজা বেগম শিল্পপতি মনির উদ্দিন তারিমের শাশুড়ি। ওই ফ্ল্যাটে আফরোজা বেগম গৃহকর্মী দিতিকে নিয়ে থাকতেন। ভবনটির পঞ্চম তলায় মনির উদ্দিন তারিম সপরিবারে থাকেন। একজন নতুন গৃহকর্মী ওই বাসায় গতকাল শুক্রবারই কাজে যোগ দেয়। ঘটনার পর থেকে সে পলাতক। পুলিশের ধারণা, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নতুন ওই গৃহকর্মীর যোগসাজশ থাকতে পারে। এ ঘটনায় শিল্পপতি মনিরের দেহরক্ষী বাচ্চু ও ভবনটির ইলেকট্রিশিয়ান বেলায়েতকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পুলিশ।  

নিহত আফরোজা বেগমের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে। ওই ভবনে পাঁচটি ফ্ল্যাট রয়েছে গার্মেন্ট ব্যবসায়ী (টিমটেক্স গ্রুপ ও ক্রিয়েটিভ গ্রুপের এমডি) মনির উদ্দিন তারিমের। এর মধ্যে দুটিতে তিনি নিজের পরিবার নিয়ে থাকেন। দুটি ভাড়া দিয়েছেন আর চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন তাঁর শাশুড়ি ও তাঁর গৃহকর্মী। মনির উদ্দিন গার্মেন্ট মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর একজন পরিচালক।

বাড়িটির নিরাপত্তাকর্মী নুরুজ্জামান জানান, চারতলার ফ্ল্যাটে থাকতেন আফরোজা ও গৃহপরিচারিকা দিতি। ওপরের ফ্ল্যাটে থাকতেন তাঁর মেয়ে দিলরুবা সুলতানা ও জামাই মনির উদ্দিন তারিম। গতকাল বিকেল ৩টায় শিল্পপতি মনিরের দেহরক্ষী বাচ্চু এক নারী গৃহকর্মীকে নিয়ে ওই বাসায় আসেন। ঘরের কাজ করার কথা বলে বাচ্চু তাকে নিয়ে ওপরে যান। এরপর সন্ধ্যা ৬টার দিকে বাচ্চু একবার লুঙ্গি পরে নিচে নামেন। এর কিছুক্ষণ পর ওই নারী গৃহকর্মী চলে যায়। তারপর বাচ্চুও প্যান্ট-শার্ট পরে চলে যান। এর কিছুক্ষণ পর ওপর থেকে একটি ছেলে তাঁকে ফোন করে জানায় খালাম্মা মারা গেছেন।

ওই নিরাপত্তাকর্মী আরো বলেন, ‘নতুন গৃহকর্মী যখন বাসা থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল, তখন তাকে যেতে দেব কি না জানতে আমি ইন্টারকমে আফরোজা বেগমের বাসায় ফোন দিই। কিন্তু ওই বাসার ইন্টারকম নষ্ট ছিল। পরে তাঁর মেয়ের ইন্টারকমে ফোন দিলে কেউ রিসিভ করেননি। এরপর গৃহকর্মী বেতন কম তাই কাজ করবে না জানিয়ে চলে যায়। তার হাতে কোনো ব্যাগ ছিল না। আসার সময়ও কোনো ব্যাগ ছিল না।’

আফরোজা বেগমের গাড়িচালক অলি বলেন, ‘আমি বাসায় ছিলাম না, বাইরে ছিলাম। বাসা থেকে খবর দেওয়ার পর এসে দেখি এই অবস্থা। তাঁদের দুজনের লাশ দুটি কক্ষে পড়ে ছিল।’

আফরোজা বেগমের মেয়ে দিলরুবার গৃহকর্মী রিয়াজ বলেন, ‘আফরোজা বেগম ফোন ধরছিলেন না তাই দিলরুবা ম্যাডাম আমাকে পাঁচতলা থেকে চারতলায় গিয়ে দেখে আসতে বলেন। আমি গিয়ে দেখি, আফরোজা বেগম ফ্লোরে পড়ে আছেন, রক্তমাখা। আমি দৌড়ে ওপরে গিয়ে বিষয়টি জানাই। তখন বাসার অন্য গৃহকর্মী আপেল ও দিলরুবা ম্যাডামও চারতলায় আসেন। তাঁরা নতুন গৃহকর্মীকে খুঁজছিলেন, কিন্তু কোথাও তাকে পাওয়া যায়নি। দরজা খোলা ছিল। তিনতলা পর্যন্ত ফ্লোরে রক্তমাখা পায়ের ছাপ দেখতে পাওয়া যায়।’

আফরোজা বেগমের জামাই শিল্পপতি মনির উদ্দিন তারিম বলেন, ‘বাসা থেকে মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালংকার খোয়া গেছে।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার আব্দুল্লাহ হিল কাফি বলেন, বাড়িটির সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ জব্দ করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই করে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে।

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, নিহত আফরোজা বেগমের স্বামী আশরাফ হোসেন অনেক আগে মারা গেছেন। তিনি একজন ঠিকাদার ছিলেন। তাঁদের তিন মেয়ের মধ্যে ছোট মেয়ে স্বামীসহ ওই ভবনের পঞ্চম তলায় থাকেন। অন্য দুই মেয়ের মধ্যে একজন কানাডা, অন্যজন অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী। 

ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখা গেছে, একজনের লাশ সোফার কাছে পড়ে ছিল। আরেকজনের লাশ ছিল পাশের ঘরের মেঝের ওপর। দুজনেরই গলা কাটা। বাসার আলমারি ভাঙা দেখতে পাওয়া গেছে।

ঘরের আসবাবপত্র তছনছ হওয়ার আলামত দেখার কথা জানিয়ে ধানমণ্ডি থানার ওসি আব্দুল লতিফ বলেন, ‘কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে তা আমরা তদন্ত করে দেখছি। ঘটনার সঠিক তথ্য জানার চেষ্টা চলছে।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ভবনটির চতুর্থ তলা থেকে লিফট দিয়ে নামার পথে স্থানে স্থানে রক্তের দাগ। ধারণা করা হচ্ছে, ঘাতক পালিয়ে যাওয়ার সময় তার শরীরে লেগে থাকা রক্ত থেকে ওই দাগের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানায়, ওই বাসা থেকে কোনো কিছু লুট করতে গিয়ে তাঁদের হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। আর পারিবারিক কোনো কারণে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে কি না তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে ঘটনার পর সিআইডির ক্রাইম সিন আলামত সংগ্রহ করার জন্য ওই ফ্ল্যাটে যায়। তারা ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে জানিয়ে ধানমণ্ডি থানার ওসি বলেন, ‘আমরা আশপাশের কয়েকজনের ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে আসি। বাসায় ঢুকে দরজা ভেঙে দুই রুম থেকে দুজনের মরদেহ উদ্ধার করি। রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত লাশ দুটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জান্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছিল। মামলা প্রক্রিয়াধীন।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা