kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মান হারালে এমপিও বাতিল : প্রধানমন্ত্রী

চার শর্তে এমপিও পেল ২৭৩০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

বছরে ব্যয় বাড়ল ৮৮১ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চার শর্তে এমপিও পেল ২৭৩০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

দীর্ঘ সাড়ে ৯ বছর অপেক্ষার পর চার শর্তে এমপিও পেল দুই হাজার ৭৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গতকাল বুধবার গণভবনে অনুষ্ঠানে এমপিওভুক্তির এই ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ১ জুলাই থেকে অর্থাৎ অর্থবছরের শুরু থেকেই এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।

সর্বশেষ ২০১০ সালে এক হাজার ৬২৬টি প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে এমপিও দেওয়া হয়। এর পর থেকে এমপিওভুক্তির দাবিতে চলছিল শিক্ষকদের আন্দোলন। এমনকি জাতীয় সংসদেও এমপিরা এই দাবিতে ছিলেন সরব। গতকালের ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সবচেয়ে বেশিসংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে এমপিওভুক্ত করার রেকর্ড করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথাযথ নীতিমালা মেনে চলার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা নীতিমালা অনুযায়ী সব নির্দেশনা পূরণ করতে পেরেছেন বলে এমপিওভুক্ত হয়েছেন। কাজেই এটা ধরে রাখতে হবে। কেউ যদি এটা ধরে রাখতে ব্যর্থ হন, সাথে সাথে তাঁর এমপিওভুক্তি বাতিল হবে। কারণ এমপিওভুক্তি হয়ে গেছে, বেতন তো পাবই, ক্লাস করানোর দরকার কী, পড়ানোর দরকার কী, এ চিন্তা করলে কিন্তু চলবে না।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি আজকে নতুন করে দুই হাজার ৭৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করলাম। একটি নীতিমালা করে নিয়ে যাচাই-বাছাই করে তার পরে এই তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের কথা হচ্ছে আমাদের নীতিমালার যে নির্দেশনাগুলো রয়েছে, যাঁরা সেই নির্দেশনাগুলো পূরণ করতে পারবেন এবং সেই স্কুলগুলো যেগুলোর আসলে প্রয়োজন আছে সেটা বিবেচনা করেই আমরা এমপিওভুক্ত করব। কাজেই যাঁরাই এমপিওভুক্তি চান তাঁদের এই নির্দেশনা মানতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবাইকে মনে রাখতে হবে, আমরা করে দিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু ওই নীতিমালাগুলো পূরণ করতে হবে এবং সেটা অব্যাহত রাখতে হবে। যদি এমপিওভুক্তির এই সুযোগটাকে অব্যাহত রাখতে চান।’

জানা যায়, এমপিও পাওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্কুল ও কলেজের সংখ্যা এক হাজার ৬৫১টি, মাদরাসার সংখ্যা ৫৫৭টি এবং কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫২২টি। সম্পূর্ণ নতুন স্কুল-কলেজ এমপিওভুক্ত হচ্ছে ৬৮০টি এবং প্রতিষ্ঠানের নতুন স্তর এমপিওভুক্ত হচ্ছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯৭১টি। নতুন এই এমপিওভুক্তির কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগে মোট ৮৮১ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ল। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে প্রায় ৪৫১টি কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগে ৪৩০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ল। বর্তমানে এমপিওভুক্ত ২৮ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা বছরে ব্যয় হয়ে থাকে বলে জানা গেছে।

১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এমপিওভুক্তি নিয়ে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, ‘আগে যারা এমপিওভুক্ত ছিল তাদের বেতনের টাকাটা সরাসরি ওই প্রতিষ্ঠানে চলে যেত। যার ফলে অনেক সময় তাদের কাছ থেকে একটা নালিশ আসত, তারা ঠিকমতো বেতন পায় না।’ তিনি বলেন, ‘তখন আমরা ঠিক করি, যার যার বেতন তার তার কাছে সরাসরি চলে যাবে এবং প্রতি মাসে একটা পেমেন্ট অর্ডারের মাধ্যমে যার নামে তার টাকা চেকে পৌঁছে যাবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা করে একটা সুবিধা হলো যে দেখা গেল প্রায় ৬০ হাজার ভুয়া শিক্ষক ছিল, যাদের নামে টাকা যেত। যখন আমরা প্রতিজনের নামে মাসিক পে-অর্ডারের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে শুরু করলাম তখন এই ৬০ হাজার শিক্ষকের আর কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না।’

যত্রতত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে শিক্ষার সঠিক মানটা আর বজায় থাকে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রচণ্ড একটা দাবি ছিল এমপিওভুক্ত করার, আর এ জন্য শিক্ষকরা আন্দোলনও করেছেন। তখন আমরা বলেছি আমরা সবই করব; কিন্তু একটা নীতিমালার ভিত্তিতে করব।’

তিনি বলেন, ‘শিক্ষাকে আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিই বলেই একটি নীতিমালার ভিত্তিতে এমপিওভুক্তি করতে চেয়েছে সরকার। যাতে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। তবে এই নীতিমালা ঠিক করে একে যাচাই-বাছাই করে তালিকাটা করতে একটু সময় লেগে যায়।’ তিনি বলেন, ‘শুধু উচ্চশিক্ষা নিয়ে, ডিগ্রি নিয়ে তো লাভ নেই। তাকে তো কিছু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। কিছু করে খেতে হবে। সেটার ব্যবস্থা যাতে করতে পারি, যা দেশে-বিদেশে যেখানেই হোক। সেটাকেই আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। সেভাবেই আমরা করে যাচ্ছি। সরকার দেশের বাজেট বৃদ্ধি করে শিক্ষা খাতে সর্বাধিক ব্যয় বরাদ্দ করেছে। যাতে শিক্ষাকে আধুনিক এবং বিজ্ঞানসম্মত করে যুগের চাহিদা মোতাবেক প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলা যায়।’

শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসেইন অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।

এমপিওভুক্তিতে চার শর্ত : নতুন এমপিওভুক্তদের চারটি শর্ত দেওয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছে—এমপিও নীতিমালা ও জনবল কাঠামো-২০১৮ অনুযায়ী আরোপিত শর্ত পূরণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা নিয়োগকালীন বিধি-বিধান ও সংশ্লিষ্ট পরিপত্র মোতাবেক প্রযোজ্য হবে। নিবন্ধন প্রথা চালু হওয়ার আগে বিধিসম্মতভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীরা এমপিওভুক্তির সুযোগ পাবেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নিয়োগপ্রাপ্তদের অবশ্যই নিবন্ধন সনদ লাগবে। যেসব প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য বিবেচিত হয়েছে তার মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠান নীতিমালা অনুযায়ী কাম্য যোগ্যতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে সেসব প্রতিষ্ঠানের এমপিও স্থগিত করা হবে এবং পরবর্তী সময়ে কাম্য যোগ্যতা অর্জন করলে এমপিও ফের অবমুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা হবে। যেসব তথ্যাদির আলোকে প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে কোনো তথ্য ভুল বা অসত্য প্রমাণিত হলে তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রদানকৃত তথ্যের সঠিকতা সাপেক্ষে প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে এমপিওভুক্তির আদেশ কার্যকর করা হবে।

কোন ধরনের কতটি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত : দুই হাজার ৭৩০টি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪৩৯টি নিম্ন মাধ্যমিক (ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি) বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় (ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি) ১০৮টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণি স্তরের প্রতিষ্ঠান ৮৮৭টি, ৯৩টি কলেজ, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৬৮টি, কলেজ (একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি) ৯৩টি এবং ডিগ্রি কলেজ ৫৬টি। এ ছাড়া কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের অধীন মাদরাসা রয়েছে ৫৫৭টি। এর মধ্যে দাখিল স্তরের মাদরাসা ৩৫৮টি, আলিম স্তরের ১২৮টি, ফাজিল স্তরের ৪২টি ও কামিল স্তরের ২৯টি মাদরাসা রয়েছে। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৫২২টি। এর মধ্যে কৃষি ৬২টি, ভোকেশনাল (স্বতন্ত্র) ৪৮টি, ভোকেশনাল (হাই স্কুল সংযুক্ত) ১২৯টি, বিএম (স্বতন্ত্র) ১৭৫টি এবং বিএম (কলেজের সঙ্গে যুক্ত) ১০৮টি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা