kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মশা আবার বেড়েছে, শিথিল দমন কার্যক্রম!

এডিসের সঙ্গে কিউলেক্স মশারও ভয়

তৌফিক মারুফ   

২৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মশা আবার বেড়েছে, শিথিল দমন কার্যক্রম!

রাজধানীর মহাখালীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুসজ্জিত কক্ষের ভেতরই উড়ছে মশা। শুধু উড়ন্ত মশাই নয়, দেখা মেলে দেয়াল আঁকড়ে থাকা ভরপেট রক্ত নিয়ে থাকা মশারও। ওই মশার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বে থাকা সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার বলেন, ‘আমরা সারা দেশের মানুষকে সতর্ক করি, সচেতন করি; কিন্তু আমরা নিজেদেরও তো এ মশার উৎপাত থেকে রক্ষা করতে পারছি না। ইলেকট্রিক ব্যাট, কয়েল, স্প্রে—কোনো কিছুতেই পুরোপুরি দমানো যাচ্ছে না। এই যায় তো আবার আসে!’ আক্ষেপের সুরে তিনি আরো বলেন, ‘ভেতরের মশা শেষ হলেও বাইরে থেকে তো কোনো না কোনোভাবে আবার ঢুকছে। বাইরের মশা তাড়াব কী করে!’

গত রবিবার ওই কর্মকর্তার কথার সঙ্গে মিলে যায় মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়া এলাকার দোকানি মো. বেলাল হোসেনের কথা। তিনি বলেন, ‘মাঝখানে মশার উপদ্রব কিছুটা কম ছিল। আর ডেঙ্গু নিয়া যে হৈচৈ ছিল, তখন প্রতিদিন দেখতাম ওষুধ ছিটাইছে। কিন্তু ইদানীং আবার কাউরেও ওষুধ ছিটাইতে দেখি না। এখন তো আবার আগের মতোই দিনে-রাইতে মশার উৎপাতে অতিষ্ঠ হইয়া আছি। মশায় কামড় দিলেই মনে ভয় ধরে যায়—নাকি ডেঙ্গুতে ধরল।’

বাড্ডার ব্যবসায়ী সুরন্দ্রনাথের ভাষ্য, ‘ডেঙ্গুতে এতগুলা মানুষ মারা গেল, এত ঢাকঢোল পিটানো হইল, এর পরও কেন এত মশা সেটা বুঝে উঠতে পারছি না। মশা কি কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যায় না?’

দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে মশা নিধন বা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রমও ঝিমিয়ে পড়েছে। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে মশা নিধনে যে আয়োজন ছিল তার কিছুই দেখা যাচ্ছে না চলতি মাসে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে।

এদিকে শীতের আগমনী বার্তায় সারা দেশেই মশার উপদ্রবও আবার বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু এডিস বা ডেঙ্গু নিয়ে ভাবলেই চলবে না, এখন কিউলেক্স নিয়েও সমানভাবে ভাবতে হবে। কারণ কিউলেক্স থেকেও জাপানিজ এনসেফালাইটিসের মতো মারাত্মক রোগ হয়ে থাকে, যা বাংলাদেশে আছে কয়েক বছর ধরেই।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মমিনুর রহমান মামুন মশা নিধন কার্যক্রম শিথিল হওয়ার প্রশ্নে কালের কণ্ঠকে বলেন, কার্যক্রম শিথিল হয়নি, এখনো প্রতিদিনই কাজ চলছে। তবে ‘ঘটা করে অভিযান’ কিছুটা ধীরগতিতে এগোচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এখন যেহেতু এডিসের দাপট একটু কম, তাই আমরা কিউলেক্স মশার অবস্থা দেখে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এরই মধ্যে সার্ভে শুরু করেছি। শিগগিরই এর ফলাফল পাওয়া যাবে।’

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শরীফ আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত মাসে যেভাবে বহুমুখী অভিযান কিংবা সচেতনতা কার্যক্রম দৃশ্যমান ছিল সেটা কিছুটা শিথিল হয়েছে। তবে মশা নিধনে ওষুধ প্রয়োগ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মতো মূল যে কাজ, সেগুলো নিয়মিতভাবেই চলছে। আমাদের কীটনাশকও এখন পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকায় আমরা সার্ভে করেই দেখেছি শীতকালে মাত্র ১-২ শতাংশ থাকে এডিস মশা, বাকি ৯৮-৯৯ শতাংশই থাকে কিউলেক্স মশা। অন্য সময়ে কিছুটা হেরফের হলেও বেশির ভাগই কিউলেক্সের রাজত্ব বা উৎপাত থাকে। তাই এ মশার ব্যাপারেও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রথমত, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কমলেও এটা এখন একদম বন্ধ হয়ে যাবে তেমনটা ভাবা যাবে না। কম মাত্রায় সারা বছরই চলতে থাকবে। শীতের দিনে তুলনামূলক খুবই কম দেখা যাবে ডেঙ্গু। আবার এডিস মশার উপদ্রবও শীতে কম থাকে। এডিসের সঙ্গে কিউলেক্স মশার যন্ত্রণাও কম নয়।

কিউলেক্স মশার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে : ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, “শুধু এডিস নিয়ে ভাবলে চলবে না, আমাদের কিন্তু কিউলেক্স মশার ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এটা থেকেও জাপানিজ এনসেফালাইটিসসহ (জেই) আরো কয়েকটি রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে থাকে। বিশেষ করে আমাদের দেশে কয়েক বছর ধরেই ‘জেই’ আছে। ফাইলেরিয়াও আছে। এ ছাড়া ওয়েস্টার্ন ভাইরাসও ছড়ায় এই কিউলেক্সের মাধ্যমে। তবে ফাইলেরিয়া এখন মাত্র উত্তরের কয়েকটি এলাকায় সীমাবদ্ধ। কিন্তু জেইর ঝুঁকি সব জেলায়ই আছে।” তিনি বলেন, ‘এ বছর এখন পর্যন্ত আইইডিসিআরে স্যাম্পল পরীক্ষায় ৪৯ জন জেই আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মিলেছে। এর বাইরে আরো রোগী থাকতে পারে। এবারে মৃত্যুর কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে নেই। ডেঙ্গুর সঙ্গে জেইর উপসর্গে অনেকটা মিল আছে, আবার ভিন্নতাও আছে। বিশেষ করে কিউলেক্স মশা পাখি বা কোনো প্রাণীকে কামড়ালে জেই ভাইরাস সংক্রমিত হয়। সেই মশা মানুষকে কামড়ালে মানুষের মধ্যে তা ছড়ায়। কোনো মানুষ জেই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সাধারণত ৫-১৫ দিন পর অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ সময় জ্বর, প্রচণ্ড মাথা ব্যথা, বমি ভাব, ডায়রিয়া, দুর্বলতা, কাঁপুনি, খিঁচুনি হয়ে থাকে। এমনকি মূত্রাশয়ে সমস্যা, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা, কোনো অঙ্গ প্যারালাইজড হওয়ার ঘটনাও ঘটে। মানসিক রোগের লক্ষ্মণও দেখা দেয় অনেকের। এ ছাড়া ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে জাপানিজ এনসেফালাইটিস মারাত্মক হতে পারে, দীর্ঘমেয়াদি রোগের যেমন ঝুঁকি আছে, তেমনি মৃত্যুর ঘটনাও আছে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার কালের কণ্ঠকে বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপের সময় সিটি করপোরেশন বেশ তৎপর ছিল মশা নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু এখন তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়ে না। তবে সরকার এবং সিটি করপোরেশনের উচিত মশা নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয়ভাবে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া। নয়তো মশা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা