kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আজ

সড়কে মৃত্যু অর্ধেকে নামানোর লক্ষ্য অর্জন বহুদূরে

পার্থ সারথি দাস   

২২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সড়কে মৃত্যু অর্ধেকে নামানোর লক্ষ্য অর্জন বহুদূরে

প্রতিদিন সড়কে ঝরছে প্রাণ। অবস্থা এমন যে গত বছর এবং এ বছরেও ঢাকার সড়কে প্রাণহানিকে কেন্দ্র করে নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে নামতে হয়েছিল শিক্ষার্থীদের। সড়কে শৃঙ্খলা আনতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে গত বছরের আগস্টে ১৭ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র একটির ক্ষেত্রে—মাথায় হেলমেট পরায় অগ্রগতি দৃশ্যমান। সড়কে শৃঙ্খলা আনতে জাতীয় কমিটি সর্বশেষ ১১১টি সুপারিশ প্রণয়ন করেছে। তবু জাতিসংঘ ঘোষিত ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দুর্ঘটনায় মৃত্যু অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জন থেকে বহুদূরে আছে বাংলাদেশ। কারণ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার কাজের জবাবদিহি নেই। আর দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পরিসংখ্যান লুকিয়ে অর্জন দেখানো হচ্ছে। বাস্তব অবস্থার চেয়ে পুলিশের পরিসংখ্যানে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির হার অন্তত ৫ শতাংশ কম। কোথাও আবার ২০০ শতাংশ তথ্য কম দিচ্ছে পুলিশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্ঘটনার কারণ সৃষ্টি হচ্ছে অথচ পুলিশ মাঠে না গিয়ে কম পরিসংখ্যান দিয়ে সরকারের সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাইছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশরা এসে দেখিয়ে গেছে, ৬৭টি পয়েন্টের একটি ফরম কিভাবে পুলিশকে পূরণ করতে হবে। ওই সময় বঙ্গবন্ধু সেতুতে সেতু বিভাগ দুর্ঘটনার যে তথ্য দিত, পুলিশ দিত তার ২০ শতাংশ কম দুর্ঘটনার তথ্য। এখন মাঠে না গিয়েও পুলিশ অফিসে বসে ওই ফরম পূরণ করছে। সঠিক তথ্য যেখানে নেই, সেখানে সরকার লক্ষ্য ঠিক করবে কিভাবে আর অর্জনই বা নির্ণয় করবে কিভাবে? প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনার প্রকৃত লক্ষ্য অর্জন হয়নি বাংলাদেশের। বরং প্রকৃত অবস্থা লুকিয়ে বেসরকারি গবেষণা ও পর্যবেক্ষণকে অস্বীকার করে ভয়াবহতাকে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে। সরকার বিভিন্ন মহাসড়ক চার লেন করছে, চালকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তবে ২২টি জাতীয় মহাসড়কে হালকা যান চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি সর্বত্র। 

জানা গেছে, গত চার বছরে সারা দেশে ২৯ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে সড়কে, যদিও সরকারি হিসাবে এই প্রাণহানি আরো কম বলা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থারগুলোর গবেষণা, পর্যবেক্ষণে বের হয়েছে ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার কারণ অতি গতি। কারণ সন্ধান করে বের করা হলেও প্রতিকারে অগ্রগতি আছে শুধু কাগজপত্রে। এ অবস্থায় আজ তৃতীয়বারের মতো দেশে উদ্‌যাপন করা হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস।

চার বছরে নিহত ২৯ হাজার ৩১৫ জন : সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সূত্র ধরে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত চার বছরে ২১ হাজার ৩৮৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯ হাজার ৩১৫ জন নিহত হয়েছে বলে তথ্য দিয়েছে। এ চার বছরে আহত হয় ৬৯ হাজার ৪২৮ জন। সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, সংঘটিত দুর্ঘটনার মাত্র ৩৭ শতাংশ তথ্য গণমাধ্যমে আসে। মামলা না হওয়াই তার বড় কারণ।

তবে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই) শুধু মামলা হয়েছে এমন দুর্ঘটনা ও নিহতের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা প্রতিবেদনে বলছে, ১৯৯৮ থেকে ২০১৮ সাল এই ২২ বছরে দেশে ৬২ হাজার ৬৪১টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। প্রাণহানি ঘটেছে ৫৭ হাজার ৩৪৪ জনের। এআরআইয়ের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ বলেন, ‘বিভিন্ন থানা থেকে মামলার ভিত্তিতে এ পরিসংখ্যান আমরা সংরক্ষণ করে বিশ্লেষণ করে থাকি। বহু শতাংশ দুর্ঘটনার তথ্য হারিয়ে যায় মামলা না হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, থানা ও বিআরটিএর অবহেলায়।’ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কমপক্ষে ৭০ শতাংশ দুর্ঘটনার তথ্যই কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

গত ১২ জুন জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জাতীয় সংসদে একজন সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে জানান, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে গত এপ্রিল পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫ হাজার ৫২৬ জন নিহত এবং ১৯ হাজার ৭৬৩ জন আহত হয়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, চার বছরে ৩১ হাজার ৯৪টি গাড়ি সড়কে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে ২১.৩৩ শতাংশ বাস, ২১.১৮ শতাংশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান, ৬.৮৭ শতাংশ কার-জিপ-মাইক্রোবাস, ১৪.২৫ শতাংশ অটোরিকশা, ১৮.৩৩ শতাংশ মোটরসাইকেল, ৯.১৮ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং ৮.৮৩ শতাংশ নছিমন, করিমন ও ট্রাক্টর দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিল। সমিতির তথ্যানুসারে, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে গত বছরের জুন পর্যন্ত সাড়ে তিন বছরে ১৮ হাজার ৭৩২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। ওই সময়ে সংঘটিত দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেলের সংশ্লিষ্টতা ছিল ৩৪ শতাংশ। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানে দুর্ঘটনা ঘটে ২৭ শতাংশ এবং বাসে ২৫ শতাংশ।

তবে গণপরিবহনের সংকট পুঁজি করে ঢাকায় অ্যাপসভিত্তিক পরিবহন সেবা চালুর পর ২০১৬ সাল থেকে মোটরসাইকেলের ব্যবহার বেড়েছে। বিআরটিএর গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ঢাকায় নিবন্ধিত বিভিন্ন ধরনের গাড়ির ৪৭ শতাংশই মোটরসাইকেল। ঢাকায় ২০১৬ সালে নিবন্ধিত হয় ৫৩ হাজার ৭৩৮টি মোটরসাইকেল। ২০১৭ সালে তা বেড়ে হয় ৭৫ হাজার ২৫১ এবং ২০১৮ সালে তা আরো বেড়ে হয় এক লাখ চার হাজার ৫৪টি। ঢাকার সড়কে প্রাণহানি বাড়ছে ছোট এই বাহনের বেপরোয়া চলাচলে উল্লেখ করে বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, তরুণরা বেশি আসক্ত হচ্ছে এতে। জীবিকার প্রয়োজন ও নেশার কারণে এই বাহনের ব্যবহারে ঢাকায় বিশৃঙ্খলায় প্রাণহানি বাড়ছে। বিআরটিএতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকায় নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের প্রায় ৫৫ শতাংশ চালকের বৈধ লাইসেন্স নেই।

বছরে ক্ষতি ৪০ হাজার কোটি টাকা : এআরআই সূত্র জানায়, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৫৪ শতাংশ ব্যক্তির বয়স ১৬ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। ১৮.৫০ শতাংশ শিশু। বছরে জিডিপির ২ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতি হয়। 

বেপরোয়া গতি ও ওভারটেকিং অন্যতম কারণ : যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে বেপরোয়া গতি ও বিপজ্জনক ওভারটেকিংয়ে দুর্ঘটনা ও  হতাহত বেড়েছে। এআরআইয়ের তথ্যানুসারে, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতি গতির ফলে। চালকদের বেপরোয়া মনোভাবে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও বেপরোয়া গতির কারণে ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে। ১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সালের সড়ক দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এ প্রবণতা এখনো অব্যাহত আছে জানিয়ে বিআরটিএর পরিচালক (প্রকৌশল) লোকমান হোসেন মোল্লা বলেন, গাড়িতে গতি সীমিত রাখতে গভর্নর সিল সংযোজন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চালক তৈরি করতে প্রশিক্ষকও তৈরি করা হচ্ছে।

দ্বিগুণ ঝুঁকিতে ঢাকা : অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের সব মহানগরীতে যত দুর্ঘটনা ঘটে তার দ্বিগুণের বেশি ঘটে ঢাকা মহানগরীতে। মহানগরীর ৫১টি স্থান বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। দুর্ঘটনার ৪৭ শতাংশের শিকার হয় পথচারীরাই। 

লক্ষ্য অর্জন থেকে বহুদূরে : ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এক দশকে বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ৫০ শতাংশ, অর্ধেক কমিয়ে আনতে জাতিসংঘের ঘোষণায় বাংলাদেশও স্বাক্ষর করেছে। তবে এই লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না। লক্ষ্য অর্জনে সড়ক নিরাপত্তায় পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়, সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা, সড়ক নিরাপত্তা প্রকৌশল পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, সড়ক ও পরিবহন আইন আধুনিকায়ন, ট্রাফিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, চালক প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষা কেন্দ্র বাড়ানো, যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পাঠ্যপুস্তকে সড়ক নিরাপত্তা বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা, জনগণের কাছে প্রচারণা জোরদার করা এবং সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের জন্য মহাসড়কের পাশে জরুরি চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে সড়ক পরিবহন আইন অনুমোদিত হলেও বিধিমালার অজুহাতে বাস্তবায়ন করা হয়নি। চালক প্রশিক্ষণ বাড়ানো হয়েছে। পাঠ্যপুস্তকে সড়ক নিরাপত্তা যোগ করার কাজ কিছুটা এগিয়েছে। তথ্যভাণ্ডার এখনো গড়ে ওঠেনি। তবে জনসচেতনতার জন্য পোস্টার বিতরণ করা হচ্ছে বিভিন্ন দিবসে।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে বাঁক সোজা করায় দুর্ঘটনার হার কমেছে। ট্রাফিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ৪৪টি, ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষা কেন্দ্র বাড়াতে ২৭টি, সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের জন্য জরুরি চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপনে চিহ্নিত ২১টি কর্মসূচির বেশির ভাগই বাস্তবায়িত হয়নি। বিআরটিএর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চেষ্টা করেও দুর্ঘটনায় প্রাণহানির হার অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জন করতে পারিনি আমরা। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে তা অর্জন সম্ভব হবে।’  

কর্মসূচি দেশজুড়ে : ‘জীবনের আগে জীবিকা নয়, সড়ক দুর্ঘটনা আর নয়’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ মঙ্গলবার দেশব্যাপী উদ্‌যাপন করা হবে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন। ক্রোড়পত্র প্রকাশ, আলোচনাসভা, শোভাযাত্রা ও সড়ক সচেতনতা কর্মসূচি পালন করা হবে রাজধানীসহ দেশজুড়ে। সকাল সাড়ে ৭টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা থেকে শোভাযাত্রা বের হবে। সকাল ১০টায় ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনাসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বিকেল ৪টায় রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনালসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সড়ক নিরাপত্তার ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হবে। বিতরণ করা হবে লিফলেট, পোস্টার ও স্টিকার।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা