kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

দুর্নীতিবিরোধী অভিযান

কাউন্সিলর রাজীব আটক

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কাউন্সিলর রাজীব আটক

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবকে আটক করেছে র‌্যাব। গতকাল শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর বারিধারা এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে তাঁকে আটক করা হয়।  র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, নানা দুর্নীতি অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগে গত কয়েক দিন ধরে ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবকে ধরার চেষ্টা করছিলেন তাঁরা। এরপর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হয়ে বারিধারার ওই বাসা থেকে আজ (শনিবার) রাতে তাঁকে আটক করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। গতকাল রাত সাড়ে ১০টার দিকে বারিধারার বাসাটি প্রথমে ঘিরে ফেলে র‌্যাব। এরপর বাসার ভেতরে তল্লাশি চালানো হয়। প্রায় আধঘণ্টা তল্লাশি শেষে রাজীবকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। বাসাটি রাজীবের এক বন্ধুর বলে র‌্যাব সূত্র জানিয়েছে।  সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, গত রাতে রাজীবকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর মোহাম্মাদপুরের মোহাম্মদীয়া হাউজিংয়ের বাসায় অভিযান চালানো হয়।

ছয় হাজার টাকার ভাড়া বাসা থেকে ছয় কোটি টাকার ডুপ্লেক্স : এর আগে রাজীবের দুর্নীতির নানান তথ্য উঠে এসেছিল কালের কণ্ঠ’র একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। তাঁর সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মোহাম্মদপুরের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রাজীব গত কয়েক বছরে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে। প্রায় ছয় বছর আগে মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির একটি বাড়ির নিচতলার গ্যারেজের পাশেই ছোট এক কক্ষে সস্ত্রীক ভাড়া থাকতেন তিনি। ভাড়া দিতেন মাসে ছয় হাজার টাকা। তখনো তিনি কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন না। এখনো করেন না। কিন্তু পরিবার নিয়ে থাকেন একই হাউজিং এলাকায় নিজের ডুপ্লেক্স বাড়িতে। আগে একটি মোটরসাইকেল নিয়ে রাজীব চলাফেরা করতেন। এখন কোটি টাকা দামের বিলাসবহুল গাড়িতে চড়েন। নতুন নতুন ব্র্যান্ডের গাড়ি কেনার নেশা রয়েছে তাঁর। যেখানেই যান, তাঁর গাড়িবহরের সামনে-পেছনে থাকে শতাধিক সহযোগীর একটি দল। এসব কারণে মোহাম্মদপুর এলাকায় এখন রাজীব যুবরাজ হিসেবেই পরিচিত।

২০১৪ সালে কাউন্সিলর হওয়ার পরই যুবলীগের এই নেতার অবস্থা বদলে যেতে থাকে।  জমি দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। রাজীবের সব অপকর্মের সঙ্গী যুবলীগ নেতা শাহ আলম জীবন, সিএনজি কামাল, আশিকুজ্জামান রনি, ফারুক, রাজীবের স্ত্রীর বড় ভাই ইমতিহান হোসেন ইমতিসহ অর্ধশত ক্যাডার।

জানা গেছে, কাউন্সিলর হওয়ার পর রাজীবের লোকজন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা পাইন আহমেদকে মারধর করে। ঘটনাটি প্রধানমন্ত্রী জানার পর মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয় তাঁকে।

কিন্তু পরে তাঁর বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। এমনকি তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, সদ্য বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমানের মাধ্যমে এক কোটি টাকা দিয়ে পদটি নিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকেই খুব বেশি দেখা যায়নি রাজীবকে। গ্রেপ্তারের ভয়ে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন।

সপ্তাহখানেক আগে কালের কণ্ঠ’র প্রতিনিধি মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটিতে গিয়ে কথা হয় খান শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে। তাঁর বাড়িতেই ভাড়া থাকতেন রাজীব। তিনি বলেন, ‘রাজীব আমার বাড়িতে বছর দুয়েক ছিলেন। এখন আমার গলির তিনটি গলির পরই নিজেই বিলাসবহুল বাড়ি করেছেন। এমন বাড়ি আমাদের হাউজিংয়ে আর নেই।’

মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির ১ নম্বর সড়কের ৩৩ নম্বর প্লটে রাজীবের ডুপ্লেক্স বাড়ি। জানা গেছে, পাঁচ কাঠা জমির ওপর বাড়িটি করতে খরচ হয়েছে ছয় কোটি টাকা। সেদিন রাজীবের বাড়ির সামনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে রিকশা নিয়ে অপেক্ষা করছেন চালক আয়নাল হোসেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জনতার কমিশনার রাজীব স্যারের কাছে আইছি, কিছু সাহায্যের জন্য। তিনি খুব দানশীল মানুষ।’ পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ষাটোর্ধ্ব সেকেন্দার আলী শেখ নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘রাজীবের কপালই কপাল। কয় বছর আগে কী ছিল, আর এখন কী হইছে। মনে হয় আলাদিনের চেরাগ পাইছে।’ রাজীবের বাড়ির জমি নিয়ে রয়েছে অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার কয়েকজন বাড়ির মালিক কালের কণ্ঠকে বলেন, রাজীব যেখানে বাড়িটি করেছেন, সেই জমির মালিক ছিলেন বারী চৌধুরী। এই জমির কিছু অংশে পানির পাম্প বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জমিটি কৌশলে নিজেই নিয়ে নেন কাউন্সিলর। তাঁরা বলছিলেন, গত চার বছরে রাজীব ৮-১০টি নামিদামি ব্র্যান্ডের গাড়ি কিনেছেন। মার্সিডিস, বিএমডাব্লিউ, ক্রাউন প্রাডো, ল্যান্ডক্রুজার ভি-৮, বিএমডাব্লিউ স্পোর্টস কারসহ নামিদামি সব ব্র্যান্ডের গাড়িই এসেছে রাজীবের হাতে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জানান, কাউন্সিলর রাজীবের বাবা তোতা মিয়া হাওলাদার মোহাম্মদপুরে মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটি ও চান মিয়া হাউজিং এলাকায় তিন সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন। সন্তানদের মধ্যে রাজীব মেজো। পেশায় রাজমিস্ত্রি বাবার সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি রাজীব মোহাম্মদীয়া সুপারমার্কেটে টং দোকানও করেছেন।

এই মার্কেটের কয়েকজন ব্যবসায়ী কালের কণ্ঠকে বলেন, অবৈধভাবে প্লট ও জমি দখল করে বিক্রি করে টাকা কামিয়েছেন রাজীব। এ ছাড়া দখলবাজি, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম করে বিত্তের মালিক হয়েছেন তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, মোহাম্মদপুর, বেড়িবাঁধ, বসিলা এলাকার পরিবহনে চাঁদাবাজি রাজীবের নিয়ন্ত্রণে। অটোরিকশা, লেগুনা, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও বাস থেকে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা চাঁদা তোলে তাঁর লোকজন। পাঁচ বছর ধরে এলাকার কোরবানির পশুর হাটের ইজারাও নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন রাজীব। ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা থেকে কাউন্সিলর হওয়া রাজীবের বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ, মোহাম্মদপুরের কাটাসুরের নামার বাজারের দখল এখন তাঁর হাতে। কাউন্সিলর হওয়ার পর সাবেক কাউন্সিলর ও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি বজলুর রহমানকে হটিয়ে বাজারের দায়িত্ব নেন তিনি। উন্নয়নের কথা বলে বাজার কমিটির সেক্রেটারি মিন্টু আলম খানের সহযোগিতায় ১৫৭টি দোকানের মালিকের কাছ থেকে প্রায় আড়াই কোটি টাকা নিয়েছেন রাজীব; কিন্তু কোনো কাজই করেননি।

জানা গেছে, রহিম ব্যাপারী ঘাট মসজিদের সামনে আব্দুল হক নামের এক ব্যক্তির ৩৫ কাঠার একটি প্লট যুবলীগের কার্যালয়ের নামে দখল করেছেন রাজীব। এর আগে ওই জমির পাশেই জাকির হোসেনের সাত-আট কাঠার একটি প্লট দখল করে রেখেছিলেন তিনি। পরে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে জমি উদ্ধার করেন জাকির।

মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশের ময়ূর ভিলার মালিক রফিক মিয়ার কয়েক কোটি টাকা দামের জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে রাজীব ও তাঁর লোকজনের বিরুদ্ধে। পাবলিক টয়লেট নির্মাণের মাধ্যমে জমিটি দখল করা হয়। সেখানে পাঁচটি দোকান তুলে ভাড়া দিয়ে টাকা নিচ্ছে তারা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা