kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

‘জাহালমের প্রতিচ্ছবি’ বাবলু শেখের মুক্তি

নাটোর প্রতিনিধি   

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘জাহালমের প্রতিচ্ছবি’ বাবলু শেখের মুক্তি

শ্রী বাবুর বদলে গ্রেপ্তার করা হয় বাবলু শেখকে। ১৭ বছর ধরে আইনি মারপ্যাঁচে ঘুরেছেন আদালতে, কারাভোগও করেছেন। অবশেষে গতকাল মুক্তি মিলল তাঁর। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রায় দুই মাস কারাভোগ করেছেন। আর ১৭ বছর ধরে আদালতে ঘুরেছেন। মামলায় অভিযুক্ত না হয়েও পুলিশ আর আইনজীবীর ভুলে আসামি হয়ে এমন হয়রানির শিকার হন নাটোরের সিংড়া উপজেলার আচলকোট গ্রামের বাবলু শেখ (৫৫)। গতকাল বৃহস্পতিবার নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ সাইফুর রহমান সিদ্দিক তাঁকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে রায় ঘোষণা করেছেন।

একই সঙ্গে আদালত দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। এ ব্যাপারে রায়ের কপি পুলিশ সুপার, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি ও পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রায় কার্যকর করে তা আদালতকে জানাতে বলা হয়েছে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাবলু শেখ ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন বলেও রায়ে বলা হয়েছে।  রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বাবলু শেখের ঘটনাকে বহুল আলোচিত জজ মিয়া ও জাহালমের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় বিচারক প্রকাশ্য আদালতে রায় পড়ে শোনান। এ সময় আদালতে ভুক্তভোগী বাবলু শেখ, তাঁর স্ত্রী-সন্তানরা ছাড়াও আত্মীয়স্বজন ও গণমাধ্যমের কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

বিচারক রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, বাবলু শেখ বহুল আলোচিত ‘জজ মিয়া’ ও ‘জাহালম’-এর প্রতিচ্ছবি। বাবলু শেখ বংশপরম্পরায় মুসলিম পরিবারের সদস্য। কিন্তু সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা তাঁকে শ্রী বাবু হিসেবে গ্রেপ্তার করে দায়িত্বে চরম অবহেলা করেছেন। নাটোর সদর থানার তৎকালীন ওসি আসামি পরীক্ষা না করে তাঁকে মামলায় চালান করেছেন। এর দায় কোনোভাবেই তিনি এড়াতে পারেন না।

বিচারক বলেন, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মোমিনুল ইসলাম ও এসআই হেলেনা পারভীন সঠিকভাবে তদন্ত না করে অভিযোগপত্র দিয়েছেন।

বিচারক সাইফুর রহমান সিদ্দিক বলেন, বাবলু শেখ যে শ্রী বাবু নন এ বিষয়টি বারবার বিচারিক আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি একজন মুসলমান ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও আদালত আসামি সঠিকভাবে পরীক্ষা না করে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ ছাড়া থানা পুলিশ বাবলু শেখকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করে এবং মামলায় চালান করে যে ভুল করেছেন বিচারিক আদালত তা আমলে নেননি। নিযুক্ত আইনজীবীরাও ভুল নামেই বাবলু শেখের জামিন করেছেন। শুনানির সময় আইনজীবীদের পক্ষ থেকে তথ্য-প্রমাণ দাখিল করার কথা বলা হলেও সে বিষয়ে কাগজপত্র নথিতে পাওয়া যায়নি। ভুল আসামির সাজা ভোগের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আইনজীবীকে প্রথমেই দেখা উচিত ছিল। কিন্তু তিনিও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেননি।

আইনজীবীদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনে সতর্ক থাকার জন্য রায়ের কপি বার কাউন্সিলের সভাপতি-সেক্রেটারি বরাবর পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।

রায়ে বলা হয়, আদালত একটি আদেশে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি তদন্ত করে দুই দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বললেও উপপরিদর্শক (এসআই) হেলেনা পারভীন তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আদালতে জমা দেননি। আদালতও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। বিচার চলাকালে আসামিকে পরীক্ষা না করে তড়িঘড়ি করে রায় দেওয়ার সমালোচনা করেন এই বিচারক।

তবে বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ সাইফুর রহমান সিদ্দিক। ওই রায় অনুযায়ী আসামি শ্রী বাবুর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারির আদেশ দেওয়া হয়।

রায়ের পর বাবলু শেখ সাংবাদিকদের বলেন, দীর্ঘদিন পরে হলেও তিনি ন্যায়বিচার পেয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন এ মামলা চালাতে গিয়ে তাঁর পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে।

উল্লেখ্য, বাবলু শেখকে নিয়ে গত ১৫ সেপ্টেম্বর কালের কণ্ঠ’র প্রথম পৃষ্ঠায় ‘ভুল আসামির কারাভোগ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

মামলার নথি ও আইনজীবী সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সালের ১৫ এপ্রিল নাটোর সদর উপজেলার গাঙ্গইল গ্রামে একটি মারামারির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার তিন দিন পর কাজী আবদুল মালেক বাদী হয়ে শ্রী বাবুসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে নাটোর সদর থানায় মামলা করেন। সিংড়া উপজেলার আচল কোট গ্রামের শ্রীদেব দাসের ছেলে শ্রী বাবুকে ৩ নম্বর আসামি করা হয়। এরপর ১৫ মে এসআই মোমিনুল ইসলাম শ্রী বাবুকে অভিযুক্ত করে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দেন। ২৮ ডিসেম্বর আবার শ্রী বাবুকে অভিযুক্ত করে এসআই হেলেনা পারভীন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। কিন্তু ২০০২ সালের ৭ নভেম্বর আচলকোট গ্রামের ইয়াকুব আলীর ছেলে বাবলু শেখকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। এই ভুলের বিষয়টি আদালতকে অবহিত না করে ছয় দিন পর আসামির আইনজীবী শ্রী বাবু পরিচয়েই বাবলু শেখের জামিন করান। শ্রী বাবু পরিচয়েই বাবলু শেখের বিরুদ্ধে আদালত অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ ও আসামি পরীক্ষা করেন। ২০১৬ সালের ২৩ জুন মুখ্য বিচার বিভাগীয় হাকিম মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী আসামি শ্রী বাবুকে দুই বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো তিন মাসের কারাদণ্ড দেন। ওই দিন কাঠগড়া থেকে বাবলু শেখকে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে তিনি নাটোর জেলা ও দায়রা আদালতে আপিল করেন। আদালত ওই বছরের ১৬ আগস্ট তাঁকে জামিন দেন। আপিল মামলাটি বিচারের জন্য পাঠানো হয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে। শুনানি শেষে গতকাল বিচারক সাইফুর রহমান সিদ্দিক রায় ঘোষণা করেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা