kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বাংলাদেশের ফুটবল অনুরাগে মুগ্ধ ফিফা সভাপতি

সনৎ বাবলা   

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাংলাদেশের ফুটবল অনুরাগে মুগ্ধ ফিফা সভাপতি

তিনি হুট করে এসেছেন। এসেই যেন নতুন এক ফুটবলের দেশ আবিষ্কার করেছেন। যে দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ বুঁদ হয়ে আছে ফুটবলের নেশায়! সবার মুখে মুখে ফিরছে ভারতের বিপক্ষে ড্র ম্যাচের কথা। তারপর জেনেছেন, শুনেছেন অনেক। সুবাদে ফিরে যাওয়ার সময় ফিফা সভাপতি বেশ সন্তুষ্টচিত্তে কথা দিয়ে গেছেন, ‘আমি ফিরে যাচ্ছি অনেক অনুপ্রাণিত হয়ে। বিশ্ব ফুটবল গভর্নিং বডির একজন হয়ে আমি শুধু বলতে পারি এত উন্মাদনা দেখে যাওয়ার ফলাফল আপনারা অচিরেই দেখতে পাবেন।’

আশায় বুক বাঁধার মতো প্রতিশ্রুতি। কাজী সালাউদ্দিনসহ তার কমিটি বেজায় খুশি, ফিফা নিশ্চয়ই বিশেষ মনোযোগী হবে এ দেশের ফুটবল উন্নয়নে। গতকাল ভোর ৫টায় ঢাকায় পা রেখে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো প্রথম যান গণভবনে। দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সভা করে জার্সি উপহার দেন। দ্বিপক্ষীয় আলাপেও ইনফান্তিনো জেনেছেন ফুটবলের উন্নয়নে ভীষণ আগ্রহী প্রধানমন্ত্রী। তিনিও আক্ষেপ করেছেন ভারতের বিপক্ষে জয়ের স্বপ্ন দেখানো ম্যাচটি শেষ মুহূর্তে ড্র হওয়ায়! গত ১৫ অক্টোবর কলকাতার যুব ভারতী স্টেডিয়ামে ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচটাই যেন ইনফান্তিনোর ফুটবল আলোচনার বড় সূত্রধর হয়ে গেল, ‘প্রথানমন্ত্রীর সঙ্গে এক ঘণ্টার বেশি সময় ফুটবল নিয়ে কথা হয়েছে, যা আমার ধারণাই বদলে দিয়েছে। ফুটবল নিয়ে এ দেশের ১৭০ মিলিয়ন মানুষ গর্ব করতে পারে, কারণ তারা বিশ্ব ফুটবলে ধীরে ধীরে ভালো একটা পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। দুই দিন আগে ভারতের সঙ্গে জিততে জিততে ড্র করেছে তারা। বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, ফুটবলে তারা এগিয়ে যাচ্ছে।’ ভারত ম্যাচের ডামাডোলের মধ্যেই বিশ্ব ফুটবলের প্রধান হাজির হয়েছেন এ দেশে। সুবাদে এখানকার ফুটবলের আবেগটা দেখেছেন তিনি নিজের চোখে।

তাঁর প্রথম বিস্ময়ের শুরু ওই প্রধানমন্ত্রীর সভায়। এরপর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে গিয়ে ইনফান্তিনো কথা বলেছেন দেশের ফুটবল কর্তাদের সঙ্গে। বাফুফের কৃত্রিম মাঠে উপভোগ করেছেন বাচ্চাদের সঙ্গ। এরপর ঢাকার ট্রাফিক জ্যামও নাকি উপভোগ করেছেন বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের সঙ্গে ফুটবল আলোচনায়! তাই বিকেলের সংবাদ সম্মেলনে তিনি অন্য এক ফিফা সভাপতি, এখানকার ফুটবলকে সবিস্তারে জানা-বোঝা এক ফুটবল সংগঠক। তবে সকালে বিমানবন্দরে নামার সময় তাঁর মনে ছিল অনেক দোলাচল, “সত্যি বললে আমি এতটা ভাবিনি। এখানে আসার আগে ভেবেছিলাম আমি এমন একটি দেশে যাচ্ছি যেখানে ফুটবল নিয়ে মানুষের তেমন উন্মাদনা নেই। কারণ অন্য একটি খেলা এ দেশে খুব জনপ্রিয়। আমি খেলাটির নাম বলতে চাই না। ভেবেছিলাম সেই খেলাটাই এ দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কিন্তু এখানে আসার পর আমার ভুল ভেঙে গেছে। আমার কাছে মনে হয়েছে এ দেশের মানুষ কেবল ফুটবল খেলে না, ফুটবলের সঙ্গেই বসবাস করে। এটা নতুন ফিফার নতুন স্লোগানও... ‘ফুটবলের সঙ্গে মিশে যাওয়া’।”

বদলে যাওয়া ধারণা নিয়ে বিকেল ৩টায় সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয়েছেন ফিফা সভাপতি। তাঁর শরীরী ভাষায় স্পষ্ট যে, ঢাকায় দশ ঘণ্টা সময় তিনি কাটিয়েছেন দারুণ ফুটবল আবহে। তাই ফুটবল নিয়ে কথা বলেছেন প্রাণ খুলে। আর আশ্বাসে হাসি ফুটিয়েছেন সবার মুখে, ‘বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল উন্নয়নে আমাদের পূর্ণাঙ্গ এক পরিকল্পনা আছে। দীর্ঘ আলোচনা করে যা বুঝেছি এখানে কেবল পেশাদার ফুটবল নয়, বয়সভিত্তিক পর্যায়েও অনেক কাজ হচ্ছে। আমাদের একটা সাধারণ চিন্তা হচ্ছে ফুটবল চর্চা বাড়ানো। বেশি বেশি টুর্নামেন্ট আয়োজন করা। বেশি বেশি বিনিয়োগ করা। ফিফাও এখানে আরো বেশি বিনিয়োগ করতে চায়। পাশাপাশি আমি বিশ্বাস করি, সরকারও ফুটবলে বিনিয়োগ বাড়াবে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি তিনি নিজেও ফুটবলকে এগিয়ে নিতে চান। তিনিও চান আরো বিনিয়োগ করে বাচ্চাদের আরো বেশি খেলাধুলার সুযোগ করে দিতে। তা ছাড়া এই অঞ্চলে নতুন নতুন আসর আয়োজন নিয়ে আমরা কাজ করছি।’ এই অঞ্চলের ফুটবল নিয়ে ফিফার যে নতুন ভাবনা আছে, সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন ফিফা সভাপতি।

তিনিও জানেন এই অঞ্চলে ক্রিকেট আধিপত্যের কথা। তাঁর তোপের মুখে দাঁড়িয়ে এখন ফুটবল। বিশ্ব ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান অবশ্য ব্যাপারটাকে এভাবে দেখেন না। ফুটবলের শক্তি এত ঠুনকো মনে করেন না, ‘ফুটবল মানে বিশ্ব, ফুটবল হচ্ছে হৃদস্পন্দন। হয়তো এটা ঠিক, ক্রিকেটে কিছু সফলতা এসেছে এ দেশে। যেখানে ২১১টি দেশ ফুটবল খেলে, সেখানে আমি ঠিক জানি না কটি দেশ ক্রিকেট খেলে। যখন অল্প কটি দেশের মধ্যে খেলা হবে তখন শীর্ষে চলে যাওয়াটা সহজ হয়। কিন্তু যখন ২১১টি দেশ ফুটবল খেলে তখন প্রতিদ্বন্দ্বিতাও থাকে অনেক। আমি মনে করি প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকলে উন্নতিও সম্ভব নয়। এ দেশে হয়তো ফুটবলের প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিকেট। এটাকে ইতিবাচক হিসেবে নিতে হবে। ফুটবলের জনপ্রিয়তায় হয়তো খানিকটা ভাটা পড়েছিল আগে, তবে সেটা এখন আবার ফিরে আসছে। ২১১টি দলের মধ্যে মাত্র একটি দল কিন্তু বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। তাহলে বাকি দল কী বাজে!’ আসলে ফুটবলের সঙ্গে কিছুর তুলনা চলে না। এই খেলার জনপ্রিয়তাও কখনো কমে না। দেশের ফুটবলের মান নেমে গেলে চারদিকে কথা হয়, সমালোচনা হয়। এটি মোটেও খেলার জন্য নেতিবাচক নয়, বরং নতুন করে তৈরি হওয়ার তাগাদা। নইলে ভারত-বাংলাদেশের ড্র ম্যাচ নিয়ে দেশজুড়ে আফসোস হবে কেন!

ফুটবলময় এমন আবহ দেখেছেন বলেই ফিফা সভাপতি আপ্লুত। ছেড়ে যাওয়ার সময় বলে গেছেন, ‘আমার একটি চোখ কাঁদবে, কারণ আমাকে চলে যেতে হচ্ছে। আরেকটা চোখ হাসবে, কারণ আমি অনেক সম্ভাবনা দেখে গেলাম এখানে। এ সবই এখানে কাজ করার ক্ষেত্রে আমাকে অনুপ্রেরণা জোগাবে।’ প্রথম সফরেই ইনফান্তিনোর হৃদয় ছুঁয়ে গেছে এ দেশ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা